মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেছেন, ‘নারীর সম্পত্তিতে অধিকার শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, মৌলিক মানবাধিকার। বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতা দুই-ই অপরিহার্য।’
সম্প্রতি রাজধানীর লালমাটিয়াস্থ এডিএসসি’র কনফারেন্স হলে নারীর ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইন ও এএলআরডি-র আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির এ কথা বলেন।
এতে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক, সদস্য ফেরদৌসি আরা, নিরূপা দেওয়ান, মাহিন সুলতানাসহ অন্যান্যরা অংশ নেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠনসহ সামাজিক সংগঠন এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন কর্মীরাও অংশ নেন।
সভায় নারী নেত্রী এবং স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইনের বাংলাদেশের ফোকাল পারসন রওশন জাহান মনি স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বলেন- এটি একটি বৈশ্বিক ক্যাম্পেইন। এটি জেনারেশন ইক্যুয়িটি-এর অধীনে সিডও সনদ এবং বেইজিং প্লাস ৩০ এর প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করে। বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশের কান্ট্রি কোয়ালিশনও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিয়ে কাজ করছে। এই ক্যাম্পেইনের মূল স্লোগান হলো ‘নারীর ভূমি অধিকারে দাঁড়াই একসঙ্গে’।
এতে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উত্থাপিত ভূমি ও সম্পদ-সম্পর্কিত সুপারিশের আলোকে একটি পর্যালোচনা তুলে ধরেন এএলআরডি-র কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম।
আলোচনা সভায় বক্তারা যে সুপারিশ করেন। তা হলো-
- নারীকে ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার সামাজিক রীতিনীতি ও আইনি জটিলতা দূর করতে আইনি সংস্কার, জনসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
- রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
- নারীর সার্বিক অধিকার এবং ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হলে নারীর ভিন্নরূপ অবস্থান, জাতিসত্তার পরিচয়, শ্রেণীগত পরিচয় সমস্ত বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত নিয়ম বিবেচনায় আলাদা অনুচ্ছেদ যুক্ত করতে হবে।
- ডিজিটাল প্লাটফর্মে ক্যাম্পেইন চালিয়ে যেতে হবে। তা শুধু ভূমি ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নয়, অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
- উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
- কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি নাগরিক প্লাটফর্ম গঠন করা যেতে পারে।
- কমিশনের প্রতিবেদনে যৌথ খতিয়ান, জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর ছাড়, এবং নারীবান্ধব ভূমি প্রশাসনের সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি।
- বন্দোবস্তকৃত খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা এবং বিধবা নারীর খাসজমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সক্ষম পুত্র সন্তানের শর্ত বাতিলের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা জারি করতে পারেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ শতাংশ ঋণ নারীদের দেয়ার বিষয়টি অর্থাৎ কোন ধরনের নারীরা পাবেন তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
সভায় মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, ‘নারীর সম্পত্তিতে অধিকার শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতা দুই-ই অপরিহার্য।’ যেসব নারীরা কৃষি জমিতে কাজ করছে, বনজ সম্পদ রক্ষা করছে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের আলোচনা করতে হবে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে ১৯৮৭ সালে খাসজমি বন্দোবস্তের নীতিমালার নারীর ক্ষেত্রে সক্ষম পুত্রসন্তানের শর্ত তুলে দেয়ার বিষয়টি কোনো সরকারই গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি মনে করেন, দাবিগুলো সরকারের কাছে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করে বলেন, গত বছর এই জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য অবসানের একটি জোরালো স্লোগান ছিল। আর এই বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু গত ১ বছরের অভিজ্ঞতায় অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ভঙ্গ ও ম্লান হয়েছে। তবে এ সময় অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠনকে তিনি সাধুবাদ জানান। পাশাপাশি নারী সংস্কার বিষয়ক কমিশন সবার শেষে গঠন করা, বারংবার নাগরিকের পক্ষ থেকে দাবি থাকা সত্ত্বেও আজও ভূমি ও কৃষি সংস্কারের কমিশন গঠন না করা এবং কমিশনগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্বে প্রচণ্ড বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটা গোষ্ঠী প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, এই কমিশন বাতিলের দাবি তুলেছে এবং তা বাস্তবায়ন না করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সরকার তার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি।
নারী সংস্কার কমিশনের সদস্য ফেরদৌসি আরা বলেন, আমরা উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করার কথা বলছি। কিন্তু তা কমিশনের প্রতিবেদনে আসেনি। আইন পরিবর্তন যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। তাই তিনি বিদ্যমান আইনে নারী উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন। নারীদের ভূমিতে প্রবেশাধিকারের কোনো ডাটাবেইজ নেই, ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ি ব্যাংকের ১৫% ঋণ নারীদের দিতে হবে। কিন্তু কোন ধরনের নারী এই ঋণ গ্রহণ করতে পারবে তা নির্দিস্ট করতে হবে। কারণ তণমূলের নারীরা এই ঋণসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নিরুপা দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে প্রথাগত নিয়মের কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা ভূমির অধিকার পান না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বন্দোবস্ত দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যার ফলে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমাকে জমি প্রদানের রাষ্ট্রীয় ঘোষণা থাকা স্বত্ত্বেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এই বিষয়টি সুনির্দিষ্ট ইস্যু হিসেবে জোরালোভাবে উল্লেখ করা যায়নি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সদস্য এবং স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড কান্ট্রি কোয়ালিশনের এক্সপার্ট গ্রুপ সদস্য ড. আইনুন নাহার নারী সংস্কার বিষয়ক কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই প্রতিবেদন অন্তর্ভূক্তিমূলক হয়েছে এবং এই প্রতিবেদনে বৈচিত্র্যতাকে তুলে ধরা হয়েছে। ভূমি-জলা-জঙ্গলে নারীর প্রবেশাধিকার বিষয়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা প্রশংসার দাবিদার। তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের ক্ষু্দ্র নৃগোষ্ঠীদের ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। তবে নারীর সার্বিক অধিকার ও ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হলে নারীর ভিন্নরূপ অবস্থান, জাতিসত্তার পরিচয়, শ্রেণীগত পরিচয় সমস্ত বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে।
ফৌজিয়া খন্দকার ইভা বলেন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনে আমরা যে সুপারিশগুলো করেছি তা বাস্তবায়নের কৌশলগত দিক নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এ সুপারিশগুলোর মধ্যে কিছু সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে, আবার কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি সময় প্রয়োজন হবে।
অন্য এক সদস্য মাহিন সুলতানা বলেন, নারী সংস্কার বিষয়ক কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে স্কুল-কলেজে পাঠানো, ছাপানো, চারটি মন্ত্রণালয়ের (স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, শ্রম, মহিলা ও শিশু) সঙ্গে পরামর্শ করা, ঐকমত্য কমিশনে উপস্থাপনে আশ্বাস দেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল যে নারী বিষয়ক কমিশন ঐকমত্য কমিশনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না। নারীদের বিষয়গুলো কোনোভাবেই নাকি রাজনৈতিক নয়। তিনি আরো বলেন, সব বিষয় হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারবে না। কিন্তু কিছু বিষয় যেমন খাসজমি বন্দোবস্তে বিধবা মায়ের সক্ষম পুত্র সন্তান থাকার বিধানটি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাতিল করতে পারত। সতরাং আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ বিষয়ে আমরা চাপ প্রয়োগ করতে পারি।










