দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীও এখন কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে। বর্তমানে আরো কয়েক দফা পণ্যের দাম বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রা দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার ভোগ্যপণ্যের দাম নির্ধারণের পাশাপাশি সাতটি পণ্যের শুল্ককর হ্রাস ও কিছু পণ্যের আমদানির অনুমতি দিয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ট্রাকসেলের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য বিক্রির উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। তদারকি সংস্থাগুলোও বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু সরকারের এসব পদক্ষেপের বাস্তব কোনো প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না। মানুষও এর সুফল পাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সরবরাহ চেইনে ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। বাণিজ্য উপদেষ্টাও বলেছেন, ‘‌ঘাটতি নয়, সরবরাহ চেইনের কৃত্রিম সংকটই ভোগ্যপণ্যে অস্থিরতায় দায়ী।’ দেশে প্রধান ভোগ্যপণ্যের অন্যতম চাল, ডাল, চিনি ও তেল। খাদ্যশস্য হিসেবে চাল ছাড়া সিংহভাগ ভোগ্যপণ্যই আমদানিনির্ভর। তবে আমদানির পর সরবরাহের পদ্ধতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া লেনদেনের ধরন সারা বছরই অস্থিতিশীল রাখছে বাজারকে। পণ্য সরবরাহের শতবর্ষী পদ্ধতি ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বাতিল করে এসও (সাপ্লাই অর্ডার) চালু হলেও মেয়াদহীন সরবরাহ পদ্ধতি সারা বছরই অস্থিতিশীল করছে পণ্যের দামকে। বাজারে পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনতে আমদানির পর যথাসময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সরকারকে সরবরাহ চেইনের কৃত্রিম সংকট নিরসনে জোর দিতে হবে। এ সংকট নিরসনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে পণ্য সরবরাহের শতবর্ষী পদ্ধতি ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বাতিল করে ২০১১ সালে এসও (সাপ্লাই অর্ডার) চালু করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন পদ্ধতি চালু করলেও পণ্য লেনদেন হচ্ছে আগের নিয়মেই। এসও পদ্ধতিতে আমদানিকারক সারা দেশে জেলা, উপজেলা এমনকি থানা পর্যায়ে জনসংখ্যা বা চাহিদা অনুপাতে ডিলার নিয়োগ দেবেন। পণ্য আমদানির আগে বা পরে আনুপাতিক হারে এসব ডিলারের চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ দিতে হবে। এমনকি নির্ধারিত সময় পরপর ডিলারদের তালিকা নিজ নিজ জেলা প্রশাসনের বাণিজ্য শাখার মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এসও পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সরকারও নতুন পদ্ধতি কার্যকরের বিষয়ে উদাসীন। দেশের প্রধান কয়েকটি পাইকারি বাজার, যেমন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, ঢাকার মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারের মাধ্যমে এসও নিয়ন্ত্রণ হতে থাকে। মূলত এসও বিক্রির পর পণ্য উত্তোলনের নির্ধারিত তারিখ লেখা থাকলেও সেটি কোনো পক্ষই প্রতিপালন না করায় দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামা, দেশের প্রাকৃতিক বা নানা সংকট, বাড়তি চাহিদা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সরবরাহ কম থাকায় বাজার অস্থিতিশীলতায় তা ভূমিকা রাখছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরবরাহ আদেশে পণ্য উত্তোলনের যে সময় বেঁধে দেয়া হয় সেটি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সরবরাহ সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের পর পণ্য সরবরাহে সরকারকে কড়াকড়ি আরোপসহ নিয়মিত তদারকি বাড়াতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ে যে অস্থিতিশীলতা রয়েছে তা দূর করা কঠিন কাজ হবে না।

বাজারদর স্থিতিশীল রাখার একটি অন্যতম উপায় হচ্ছে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা। দেশে প্রায়ই দেখা যায় খাদ্য উৎপাদনের প্রকৃত ও একক তথ্য পাওয়া যায় না। আবার আমদানি ও রফতানিসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যেও বিস্তর ফারাক পাওয়া যায়। এতে চাহিদা ও জোগানের ক্ষেত্রে সঠিক নীতি গ্রহণে যেমন সমস্যা দেখা দেয়, তেমনি অসাধু ও অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে সক্ষম হয়। ফলে সরবরাহজনিত সংকটের মুখে পড়ে বাজারে হঠাৎ দাম বেড়ে যায় সব পণ্যের, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের। যার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি চড়াও হচ্ছে দিন দিন। আর ভোগান্তিতে পড়ছে ভোক্তারা, বাড়ছে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা। বিবিএসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২১ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছে, যার মধ্যে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনমতে, খাদ্যের বাড়তি দাম বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ পরিবারের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের এমন অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ও বাজারদর সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা অতি আবশ্যক। কেননা বাজার ব্যবস্থাপনার অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি। অন্য সব ঠিক থেকে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কমে গেলে মূল্যস্তর স্ফীত হতে থাকে।

বর্তমানে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে তা কমাতে হলে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সরবরাহ চেইনে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণ করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। কোনো দালাল, ফড়িয়া বা মধ্যবর্তী গোষ্ঠী যেন অতিমুনাফা অর্জনে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করতে পারে এবং দাম বাড়িয়ে দিতে না পারে সেজন্য নিয়মিত তদারকি করতে হবে। সরকারের এ বিষয়ে তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারিভাবে কৃষিদ্রব্যের গুদামজাত যত বেশি করা যাবে, অবৈধ মজুদকারীর দৌরাত্ম্য তত কমানো সম্ভব হবে। আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে কারসাজি করতে না পারে সে বিষয়ে সরকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। গুটিকয়েক কোম্পানির আমদানিতে একচেটিয়া প্রভাব কমাতে আরো আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি বাজারে পণ্যের চাহিদা ও জোগান স্বাভাবিক রাখতে সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার বিকল্প নেই।