সম্মানিত রাষ্ট্রপ্রধানরা, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, গবেষক ও বন্ধুরা।
মনোরম এই দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সভায় আপনাদের সঙ্গে উপস্থিত হতে পেরে আমি আন্তরিকভাবে আনন্দিত। এবারের সভার প্রতিপাদ্য ‘সংলাপের চেতনা’ আজকের বিশ্ব বাস্তবতায় কেবল একটি ধারণা নয়, বরং প্রয়োজনও বটে। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বিশ্ব যেকোনো সময়ের তুলনায় সংলাপের অভাব বেশি অনুভব করছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিভাজন ও সংঘাতের আবহে একে অন্যের কথা শোনা, বোঝা এবং বিশ্বাস পুনর্গঠন করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে জরুরি কাজ।
দাভোস বরাবরই এমন এক মঞ্চ, যেখানে বিশ্ব নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। এখানেই আমরা প্রশ্ন করেছি, বিশ্ব কোথায় যাচ্ছে এবং আমরা কীভাবে সেখানে পৌঁছাব। ২০১৭ সালে এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তীব্র বিশ্বায়নবিরোধী আবহের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছিল—বিশ্বে কী ভুল হচ্ছে এবং আমাদের করণীয় কী। সেদিন স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক অর্থনীতির বিশাল সাগরের পানি আবার আলাদা হ্রদ ও খালে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। ইতিহাসের ধারা এমন কোনো পশ্চাৎপসরণকে সমর্থন করে না। সেই উপলব্ধি তখন যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজও তেমনি প্রাসঙ্গিক।
পরবর্তী বছরগুলোয় আমরা একই উপলব্ধির আরো গভীর প্রকাশ দেখেছি। ২০২১ সালে বহুপক্ষীয়তার মশাল হাতে নিয়ে মানবজাতির অগ্রযাত্রার কথা বলা হয়েছিল। কভিড-পরবর্তী বিশ্বে আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল—বিশ্বের দেশগুলো আলাদা নৌকায় নয়, বরং এক বিশাল জাহাজে অবস্থান করছে, যার ভাগ্য নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর। এ উপলব্ধিগুলো কোনো কাব্যিক বক্তব্য নয়; এগুলো বৈশ্বিক বাস্তবতার সারসংক্ষেপ।
বন্ধুগণ, আজ আমরা এমন এক বিশ্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে এক শতাব্দীতে একবার ঘটে এমন রূপান্তর দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। একতরফা নীতি, সুরক্ষাবাদ, আঞ্চলিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক আর বাণিজ্যযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এর প্রভাব শুধু কিছু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি বহুপক্ষীয়তা ও মুক্ত বাণিজ্যের ভিত্তিকে দুর্বল করছে। এ বাস্তবতায় আমি কয়েকটি পর্যবেক্ষণ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত, আমাদের অবশ্যই এমন এক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে, যা সবার জন্য উপকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না। কয়েকটি দেশ যেন তাদের শক্তির ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা ভোগ না করে—এটাই বহুপক্ষীয়তার মূল কথা। বিশ্ব কোনোভাবেই আবার ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যেতে পারে না, যেখানে শক্তিই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাই একমাত্র পথ, যা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও যৌথ অগ্রগতিকে সম্ভব করে।
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজন, পারস্পরিক সহযোগিতা, শক্তির পরিপূরক ব্যবহার এবং জয়ের সুযোগ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। এ প্রক্রিয়া বহু দেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে—চীন তার একটি উদাহরণ। এর বিপরীতে শুল্ক আর বাণিজ্যযুদ্ধের ফল আমরা স্পষ্টভাবে দেখছি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং বৈশ্বিক সম্পদের বণ্টন বিকৃত হয়। তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—বিশ্ব বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এখন নিয়মভিত্তিক কাঠামোর বাইরে চলে যাচ্ছে, আর অর্থনৈতিক খণ্ডিতকরণ বৈশ্বিক উৎপাদনকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ অবস্থায় কোনো দেশই লাভবান হতে পারে না।
অবশ্যই অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন নিখুঁত নয়। এটি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, কিছু দেশে সামাজিক চাপ বাড়িয়েছে। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান বিশ্বায়নকে বাতিল করা নয়। সমাধান হলো সংলাপের মাধ্যমে ত্রুটি চিহ্নিত করা, সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্বায়নকে আরো ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলা। আত্মবিচ্ছিন্নতা কোনো টেকসই পথ নয়।
চীন এমন এক বিশ্বায়নের পক্ষে, যা সর্বজনীনভাবে উপকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আমরা দেয়াল তুলতে চাই না; আমরা সেতু নির্মাণে বিশ্বাস করি। আমরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উদারীকরণ ও সহজীকরণে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং উন্নয়নের সুযোগ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের বহুপক্ষীয়তাকে রক্ষা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরো ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক করতে হবে। আজ বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। কিছু দেশের একতরফা পদক্ষেপ এবং নিয়মবহির্ভূত চুক্তি আন্তর্জাতিক নিয়মের মৌলিক নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বহুপক্ষীয়তা মানে দুর্বলদের দয়া নয়; এটি একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হলে বিশ্ব আবার শক্তির আইনের দিকে ফিরে যাবে—যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম তৈরি করবে। এটি মানবজাতির জন্য কোনো ভালো ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে না।
চীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমরা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সমর্থন করি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে আরো কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পক্ষে অবস্থান নিই, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোও তাদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও সুযোগ পায়।
তৃতীয়ত, আজ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর, বৈষম্য বাড়ছে এবং টেকসই উন্নয়ন গুরুতর ঝুঁকির মুখে। বহু উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্জন নাও হতে পারে। এ বাস্তবতায় উন্নয়নকে কখনই শূন্যসম খেলা হিসেবে দেখা উচিত নয়। আমার জেতা মানেই তোমার হার—এ মানসিকতা সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা সবাই মিলে কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির সুবিধাদি বাড়াতে পারি। একে অন্যকে দোষারোপ করার চেয়ে একসঙ্গে সমাধান খোঁজাই বেশি কার্যকর। চীন বিশ্বাস করে নিজের উন্নয়নের মাধ্যমে অংশীদারদের সঙ্গে সমৃদ্ধি ভাগ করে নেয়াই টেকসই পথ।
আমরা কখনই বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে লক্ষ্য হিসেবে দেখিনি। আমরা শুধু উৎপাদনকারী হতে চাই না; আমরা বিশ্ববাজারও হতে চাই। কিন্তু অনেক সময় বাণিজ্য প্রশ্নকে নিরাপত্তা প্রশ্নে রূপান্তর করা হয়, যা সহযোগিতার পথ সংকুচিত করে। সেবা খাতে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও চীন কখনো এটিকে অন্যায় হিসেবে দেখেনি।
চতুর্থত, পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সংলাপের ভিত্তিতে মতপার্থক্য পরিচালনা করতে হবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে টানাপড়েন হয়েছে—এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—সহযোগিতায় উভয় পক্ষ লাভবান হয়, আর সংঘাতে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির কারণে মতভেদ স্বাভাবিক। অনেক সময় এগুলো ভুল বোঝাবুঝির ফল। মূল বিষয় হলো আমরা কীভাবে সেগুলো মোকাবেলা করি। সমতা, সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থাই একমাত্র কার্যকর পথ।
বন্ধুগণ, কয়েক বছরে চীনের অর্থনীতি স্থিতিশীল অগ্রগতি অর্জন করেছে। সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ গভীর হয়েছে, ভোক্তা বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে, নতুন উৎপাদনক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং সবুজ রূপান্তর জোরদার হয়েছে। এ উন্নয়ন কোনো অনুদান বা ভর্তুকির ফল নয়; এটি সংস্কার, উদ্ভাবন ও পরিশ্রমের ফল।
আমরা জানি চ্যালেঞ্জ আছে। পুরনোও আছে, নতুনও আছে। কিন্তু এগুলো আমাদের উন্নয়ন ও রূপান্তরের স্বাভাবিক অংশ। ভবিষ্যতের জন্য আমরা স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেছি—উচ্চমানের উন্নয়ন, উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এখনো বিপুল সম্ভাবনায় ভরপুর। মধ্যবিত্ত শ্রেণী দ্রুত বাড়ছে, ভোগের ধরন বদলাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বয়স্কসেবায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমরা নতুন ভোগক্ষমতা তৈরি করতে চাই। বিশ্বের ব্যবসায়ীর আমি আহ্বান জানাই—এ সুযোগ কাজে লাগান।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আমাদের ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তি যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও আনছে। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশ একা এগোতে পারে না। উদ্ভাবনের সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছে—এ লক্ষ্যেই আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
সবশেষে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি। সবুজ ও নিম্ন কার্বন রূপান্তর কোনো বিকল্প নয়; এটি মানবজাতির টিকে থাকার শর্ত। আমরা আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করছি এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে চাই।
বন্ধুগণ, দাভোসের প্রজ্ঞা সংলাপে, আর বিশ্বের ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় বিভাজন নয়, সংহতিই আমাদের পথ দেখাবে। আসুন, আমরা একসঙ্গে সেই পথেই এগোই—মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে।
ধন্যবাদ।
হান ঝেং: চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট
[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বক্তব্যের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত রূপ]










