ঢাকায় মশা মানেই শুধু বিরক্তি নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিল্যান্স তথ্য আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে: রাজধানীতে কিউলেক্স মশা এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, আর এডিস মশা আপাতত কমে থাকলেও তা কোনোভাবেই স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। ইতিহাস শিখিয়েছে, এডিস কখনো ঘোষণা দিয়ে ফিরে আসে না, সে আসে আমাদের অসতর্কতার সুযোগে। 

ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষ সপ্তাহের তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকা— সব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

কিউলেক্স মশা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের নগর স্বাস্থ্য আলোচনায় প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে। সাধারণভাবে একটি ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত যে কিউলেক্স মশা তেমন কোনো মারাত্মক রোগ ছড়ায় না। ফলে এর বিস্তারকে আমরা স্বাভাবিক বিরক্তি হিসেবেই মেনে নিয়েছি। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিউলেক্স মশাই ফাইলেরিয়া রোগের প্রধান বাহক এবং এ রোগের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ। শুধু রোগ ছড়ানোর বিষয়টি নয়, কিউলেক্সের অতিরিক্ত আধিক্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে কার্যত অসহনীয় করে তোলে। রাতে ঘুম ভেঙে যায়, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগে, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও রোগীরা এ মশার কামড়ে বাড়তি কষ্টের শিকার হয়। নগরবাসীর মানসিক চাপ ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের পেছনেও কিউলেক্সের ভূমিকা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি শুধু ডেঙ্গু মৌসুম এলেই মশা নিয়ে ভাবব? বছরের বাকি সময় নগরের নালা-নর্দমা, জলাবদ্ধ বেজমেন্ট ও আবর্জনায় ভরা পরিবেশে কিউলেক্স যেভাবে নির্বিঘ্নে বাড়তে থাকে, তা নিয়েও ভাবার প্রয়োজন আছে?

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব কমে আসার তথ্য অনেকের মধ্যেই স্বস্তি তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিল্যান্স তথ্য অনুযায়ী এডিস মশার ঘনত্ব এবং ব্রেটো ইনডেক্স কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ, জনসচেতনতা, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না থাকা এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফ্যাক্টরগুলো একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু এডিস মশার ঘনত্ব কমার এ স্বস্তিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা। মনে রাখতে হবে, এডিস মশার এ কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরনো বাড়ির নিচতলা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এ মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে দায় কার হবে—এ প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক চ্যালেঞ্জ হলো নগর অবকাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব। রাজধানী ও অন্যান্য শহরের বহু ড্রেন মাসের পর মাস পরিষ্কার না হওয়ায় সেখানে পানি ও জৈব বর্জ্য জমে থাকে, যা কিউলেক্স মশার জন্য আদর্শ প্রজনন পরিবেশ তৈরি করে। সাময়িকভাবে ড্রেন পরিষ্কার করা বা কীটনাশক ছিটানো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন, পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। নগর ব্যবস্থাপনায় যদি পানি নিষ্কাশনের এ মৌলিক সমস্যার সমাধান না হয়, তবে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে সব প্রচেষ্টাই বারবার ব্যর্থ হবে।

একইভাবে বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় পানি জমে থাকা কিউলেক্স মশার বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়লেও এসব স্থাপনায় পানি নিষ্কাশনের বাধ্যতামূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। বৃষ্টির পানি বা ভূগর্ভস্থ পানি জমে থেকে দীর্ঘদিন স্থির অবস্থায় থাকলে তা কিউলেক্স মশার জন্য নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই নতুন ও পুরনো সব ভবনের ক্ষেত্রেই বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় পানি জমতে না দেয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন। এটি শুধু কারিগরি সমস্যা নয়, বরং একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত, যেখানে নিয়ম ভঙ্গের জন্য স্পষ্ট জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

নগরের লেক, খাল ও অন্যান্য জলাশয় কিউলেক্স মশা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে যখন এসব জলাশয় অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং সেখানে আবর্জনা ও জৈব বর্জ্য জমে যায়। এসব স্থানে নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরও নয়। বরং প্রয়োজন নিয়মিত পরিষ্কার কার্যক্রম এবং পরিবেশসম্মত লার্ভা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যাতে জলজ প্রাণী ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিউলেক্স নিয়ন্ত্রণকে যদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত না করা যায়, তবে এ সমস্যা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে গেলেও পুরোপুরি নির্মূল হবে না।

এছাড়া নগরের বস্তি ও জলাবদ্ধ এলাকাগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। এসব এলাকায় ঘনবসতি, অপরিকল্পিত পানি ব্যবহার এবং দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে কিউলেক্স মশার প্রজনন অত্যন্ত দ্রুত ঘটে। এসব অঞ্চলকে ‘হাই-রিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ না করলে সামগ্রিক নগর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কখনই সফল হবে না। এখানে প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি, নিয়মিত লার্ভা উৎস ধ্বংস এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে টেকসই উদ্যোগ।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের ধরন কিছুটা ভিন্ন হলেও গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। এডিস মূলত মানুষের বসতঘন পরিবেশে জন্মায়, ফলে প্রতিটি বাড়ি ও নির্মাণস্থলই সম্ভাব্য ঝুঁকির জায়গা। তাই এডিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণা যথেষ্ট নয়; যেখানে নিয়ম ভঙ্গ হবে, সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকলে বা বাড়ির আশপাশে অনিয়ন্ত্রিত পানিধারক থাকলে তার দায় নির্ধারণ করা না গেলে এডিস নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এডিসের স্থায়ী প্রজননস্থলগুলোতে ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটরের ব্যবহার একটি কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এসব স্থানে বারবার লার্ভা ধ্বংসের পরিবর্তে যদি লার্ভার বিকাশ প্রক্রিয়াই ব্যাহত করা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে এ ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক স্থান নির্বাচন, মাত্রা নির্ধারণ এবং নিয়মিত মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নচেৎ প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এডিস নিয়ন্ত্রণকে কেবল ডেঙ্গু মৌসুমে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বছরের বাকি সময় নজরদারি শিথিল হলে বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এডিস দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সারা বছর নিয়মিত নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। এডিস নিয়ন্ত্রণ যদি মৌসুমি আতঙ্কের বাইরে এনে একটি ধারাবাহিক নগর স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে রূপান্তর করা যায়, তবেই ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।

সবশেষে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতেই হয়, নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। প্রশাসন তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না, কিন্তু নাগরিক উদাসীনতাও সমান দায়ী। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত পাত্র, খোলা ট্যাংক—এসব ছোট অবহেলাই বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদন মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুযোগের সতর্কবার্তা। কিউলেক্সের উত্থান আর এডিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, দুটিই জানিয়ে দিচ্ছে, ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয়, এটি একটি মশা নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক কাঠামোগত সংকট। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যকে উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য দিয়ে। 

প্রশ্ন একটাই, ২০২৬ সালে আমরা কি আবারো আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়ায় ফিরব, নাকি এবার আগেভাগেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেব? আমার অবস্থান থেকে বলব: সময় এখনই। প্রস্তুতি আজ না নিলে কাল খুব দেরি হয়ে যাবে।

ড. কবিরুল বাশার: কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়