বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশ্বব্যাপী র্যাংকিং বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বিতর্ক লক্ষ করছি। এটি সত্যিই একটি ভালো লক্ষণ, কারণ আমরা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) এবং কিউএস র্যাংকিং সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন বিভাগে স্কোর বাড়ানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং বৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশল পর্যালোচনা করার সময় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুসরণ করেছি, যেখানে আমি একজন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। আমি আরো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি কীভাবে এশিয়ার বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বব্যাপী র্যাংকিং সূচক অনুসারে শীর্ষ ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার জন্য একটি সুস্থ প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কৌশলগত পরিকল্পনার উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। এজন্য প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী প্রায়োগিক রূপরেখা। নিম্নে উল্লেখিত ছোট আকারের রূপরেখাটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন করছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রূপরেখাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান একাডেমিক নেতৃত্বের কাছে সহজেই বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
প্রাথমিকভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে কমপক্ষে পাঁচ বিদেশী শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ করে দিতে হবে, যার ভর্তি প্রক্রিয়া হবে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে। আবেদন প্রক্রিয়া থেকে ভর্তি পর্যন্ত সবকিছু হবে অনলাইনে সহজলভ্য। ভর্তি প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাবলি উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য ভর্তির আগ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়া, ইস্ট এশিয়া, ফারইস্ট এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করা ও ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার প্রয়োজন রাখে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) নেতৃত্বাধীন কমিটি বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাই কমিশনের মাধ্যমে প্রয়োজনসাপেক্ষে অ্যাডমিশন ফেয়ার আয়োজন করবে। বিষয়টির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলাদা অফিস খোলা যেতে পারে। অফিসটি ‘ইন্টারন্যাশনাল অফিস ফর একাডেমিক অ্যাফেয়ার্স’ নামে নামকরণ করা যেতে পারে। এ অফিসটি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে অনলাইনে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং ভর্তির জন্য শিক্ষার্থী মনোনীত করবে। এছাড়া বিদেশী শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য প্রতিটি হলে চাহিদা অনুযায়ী ইন্টারন্যাশনাল ব্লকের (ডেজিগনেটেড রুম) ব্যবস্থা থাকতে পারে। অথবা এ লক্ষ্যে একটি আবাসিক হলকে পুরোপুরি বিশেষায়িত মর্যাদায় রূপান্তর করা যেতে পারে।
মাস্টার্স লেভেল থেকে গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য ফান্ডিং প্রয়োজন। এজন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব ফান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ডেভলপ করতে হবে এবং নিজস্ব রিজার্ভ উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন মডেল অনুসরণ করতে হবে। ইপিজেডসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফান্ডিংয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা বিশেষ কোনো দিনে তাদেরকে সম্মানিত করা ও প্রয়োজনে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, তারা আগ্রহের সঙ্গে ফান্ডিংয়ে রাজি হবেন। এভাবে অন্তত ১০-২০টি কোম্পানির সঙ্গে কোলাবোরেশন করতে পারলে গবেষণার পর্যাপ্ত ফান্ডিং ম্যানেজ হবে। এ অর্থ মাস্টার্সের থিসিস, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকদের জন্য বরাদ্দ করতে হবে। গবেষকের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়কের জন্য ও সম্মানীর ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে গবেষণা মানসম্মত হবে।
রিসার্চ গ্রান্টস বরাদ্দ মেধার ভিত্তিতে নিশ্চিতকরণের জন্য ট্রেজারারের নেতৃত্বে সব অনুষদের ডিন ও ইনস্টিটিউটের পরিচালককে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। এছাড়া প্রতিটি অনুষদে ডিনকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। তারা গবেষক ও তত্ত্বাবধায়কদের তালিকা তৈরি করবেন এবং গবেষণার জন্য তাগাদা দেবেন। বছর শেষে অনুষদভিত্তিক একটি করে সম্পাদিত বই প্রকাশ করতে হবে। এতে আন্ডারগ্র্যাড রিসার্চ এনভায়রমেন্ট ও কম্পিটিশন তৈরি হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অনুষদের সেরা গবেষণাপত্র নিয়ে বই প্রকাশের জন্য নিজস্ব প্রকাশনী থাকা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেমন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি প্রেস। ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রাপ্ত ফান্ডিংয়ের একটি অংশ প্রকাশনীর জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। প্রেসের কাঠামোগত দিক, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও মানোন্নয়নসহ সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য একজন স্বনামধন্য অধ্যাপকের নেতৃত্বে তিন-পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে বছরে অন্তত এক-তিন মাসের জন্য কমপক্ষে একজন করে আন্তর্জাতিক মানের স্কলারকে ভিজিটিং প্রফেসর বা ভিজিটিং সায়েন্টিস্ট বা ভিজিটিং স্কলার হিসেবে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেহেতু প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের সম্মানিত শিক্ষকরা কম-বেশি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়/গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন/আছেন, তারা সহজেই সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ইনস্টিটিউটকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারবেন। তাদের প্রোফাইল ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হবে। ফেলোশিপের অংশ হিসেবে তাদের জমাদানকৃত ওয়ার্কিং পেপারটি স্ব-স্ব বিভাগের ওয়েবসাইটে আপলোড করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে মানসম্মত সচল ওয়েবসাইট জরুরি। আমন্ত্রিত ভিজিটিং প্রফেসর/স্কলার/সায়েন্টিস্টদের নবনির্মিত গেস্ট হাউজে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফান্ডের একটি অংশ এবং স্ব-স্ব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রাপ্ত বহিঃস্থ ফান্ডের একটি অংশ থেকে এসব স্কলারের ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। বিভাগ ও ইনস্টিটিউট তাদের স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাইদের সহযোগিতায় বহিঃস্থ ফান্ড সহজেই ম্যানেজ করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট বছরে অন্তত একটি করে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স আয়োজন করবে। এ কনফারেন্সের আউটকাম হিসেবে একটি বই প্রকাশ করবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং বাড়বে বহুগুণে। এক্ষেত্রে স্ব-স্ব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটকে উদ্যোগী হয়ে ফান্ডিং ম্যানেজ করতে হবে। বিভাগ ও ইনস্টিটিউট তাদের স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাইদের সহযোগিতায় কনফারেন্স ও পাবলিকেশনের জন্য ফান্ড ম্যানেজ করবে।
বাংলাদেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লিখিত মডেল বাস্তবায়ন করা বর্তমানে সময়ের দাবি। পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই মডেল বাস্তবায়নের পথে কম-বেশি এগিয়ে গেছে। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। এমনকি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনের একার পক্ষে তা বাস্তবায়ন করাও কষ্টসাধ্য। এজন্য শিক্ষাদান এবং গবেষণায় উৎকর্ষ আনার জন্য আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার প্রসারে শিল্প ও করপোরেট খাতকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। আমি বিশ্বাস করি, পাবলিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শিক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অপরিহার্য। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষকদের গবেষণাধর্মী প্রতিটি কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। দেশ-বিদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষা সেমিনার আয়োজন করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরাও গবেষণার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে, যা এই মডেল বাস্তবায়নের পথকে সুগম করবে। সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যায়গুলোর উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ আসবে এবং এর মাধ্যমে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল র্যাংকিং বাড়বে বহুগুণে।
ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিজিটিং প্রফেসর, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড










