বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাড়ে ৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা রফতানির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে পণ্য খাতে ৫৫ বিলিয়ন ও সেবা খাতে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পণ্য রফতানিতে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে সেবা রফতানিতে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বর্তমানে রফতানি খাতে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা অব্যাহত রাখতে পারলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যেতে পারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) মোট ৪৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। যদিও এ অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সুতরাং রফতানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়ে গেছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রফতানি নিশ্চিত করা যাবে না। অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রতিও জোর দিয়েছেন রফতানি খাতের প্রতিনিধিরা।

বর্তমানে রফতানি খাতে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ধারিত উচ্চশুল্ক। দেশের রফতানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর দেশটিতে পোশাক রফতানিতে মোট শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে জানানো হয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে শুল্কহার কমানো না গেলে এর ভার বহনের বোঝা অবধারিতভাবেই পোশাক রফতানিকারকদের ওপর এসে পড়বে। এ পরিস্থিতি রফতানি খাতের আরেকটি গুরুতর সমস্যাকে নির্দেশ করে। সেটি হলো, রফতানি বাজার বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। কেবল পোশাক নয়, সব ধরনের পণ্য রফতানিতেই অনেকটা ‘একক গন্তব্য’-নির্ভরতা রয়েছে, যা রফতানি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি। গন্তব্যের মতো রফতানি পণ্যেও খুব বেশি বৈচিত্র্য আনা যায়নি। ফলে পোশাক রফতানির ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

এর বাইরে দেশে জ্বালানি সংকট, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাও রফতানি খাতের জন্য বর্তমানে বড় হুমকি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে ২৮৩-২৮৪ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি খাতের এ সংকট দীর্ঘদিনের। এতে শিল্প ও আবাসন খাতের নানা কার্যক্রম প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করেও মোট চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এ ধারা অব্যাহত ও দীর্ঘ হলে জ্বালানিনির্ভর রফতানি খাতগুলোর ওপর সামনে আরো বিরূপ প্রভাব পড়বে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হলে রফতানি কমে আসবে। এরই মধ্যে অনেক কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ আছে, অনেক কারখানায় সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের মধ্যে নীতি ধারাবাহিকতা নিয়ে অনাস্থা রয়েছে। যদিও সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে আশা করা যায় কিছুটা হলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি কাজ করবে।

রফতানি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা জরুরি হলো অর্থনৈতিক খাত স্থিতিশীল রাখা। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা না গেলে সেটি কখনই ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হবে না। দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে অন্যতম বাধা ব্যবসায় ব্যয় (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস)। টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায় ব্যয় অতীতের চেয়ে বেড়েছে। তার ওপর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। এতে বর্তমানে ব্যাংক ঋণের ‍সুদহার প্রায় ১২-১৫ শতাংশে ঠেকেছে। বাড়তি সুদহার ও আগে থেকে বিদ্যমান নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ উভয়ই কমেছে। ২০২৪ সালের মে থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। নিকট অতীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এতটা ভাটা দেখা যায়নি। অথচ এ খাতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৯০ ভাগ পরিচালিত হয়।

রফতানির কাঙ্ক্ষিত মাত্রা পূরণ করতে হলে উল্লিখিত সব সমস্যার সমাধান জরুরি। আবার বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পণ্য বৈচিত্র্য, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ অপরিহার্য। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর প্রেফারেনশিয়াল মার্কেট অ্যাকসেস ধীরে ধীরে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, যা এফটিএর মাধ্যমে পুষিয়ে নিতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে দরকষাকষির সক্ষমতা থাকাটাও জরুরি। অন্যদিকে কৃষিপণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত পণ্য কিংবা লেদার খাতের জন্য যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আধুনিক ল্যাব, কুলিং সিস্টেম, পরিবহন সুবিধা ও নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হবে।

লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণার পর খাতভিত্তিক সমস্যা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আলোচনার কথা জানিয়েছে। আলোচনার পর প্রস্তাবিত সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক গতি বাড়ানোর দরকার হবে। কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দেশে নীতি বাস্তবায়নে দুর্বলতার বড় কারণ সরকারের পূর্ণ মনোযোগের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তাই এগুলোও কাটিয়ে উঠতে হবে। বাংলাদেশের রফতানি খাত বেশ সম্ভাবনাময়। সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রফতানি করা সম্ভব।