রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণে রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকার নগদ প্রণোদনা দেয়। সাধারণত এ প্রণোদনা পেতে হলে রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসন হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হয়। আবেদন পাওয়ার পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ নিরীক্ষা শেষে দেয়া সনদের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক রফতানিকারককে নগদ সহায়তার অর্থ বিতরণ করে। মূলত রফতানিকারকদের উদ্বুদ্ধ করতে রফতানি প্রণোদনা দেয়া হয়। কিন্তু এ প্রণোদনার অর্থ বিতরণে বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়ম ঘটেছে।

সেসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গত বছর রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা কার্যক্রমের ওপর মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা নগদ প্রণোদনা কার্যক্রম যাচাই করে সংস্থাটি। এতে নিরীক্ষার ভিত্তিতে বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান না হওয়া সত্ত্বেও নগদ প্রণোদনা গ্রহণ, আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রণোদনা নেয়া, এলসির মাধ্যমে আমদানি করা সুতার মূল্য বাদ না দিয়ে নগদ সহায়তা গ্রহণ, ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে কেনা সুতা রফতানি হওয়া তৈরি পোশাকে ব্যবহার না করে প্রণোদনা নেয়া, ইএক্সপি ইস্যু, পণ্য জাহাজীকরণ ও রফতানি মূল্য প্রত্যাবাসনের আগেই আবেদনের বিপরীতে নগদ সহায়তা প্রদান ইত্যাদি। এছাড়া নিরীক্ষকের জাল সনদের মতো গুরুতর অপরাধের মাধ্যমেও প্রণোদনার অর্থ তছরুপের নজির রয়েছে। দুঃখজনকভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোও প্রণোদনার অর্থ বিতরণ করেছে। এদিকে সম্প্রতি পণ্য রফতানি না করেও নগদ প্রণোদনা নেয়ার প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এমনকি এনবিআরের সন্দেহ যে এটি কালো টাকা সাদা করার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানের ৭৩টি বিল অব এক্সপোর্ট যাচাই করতে গিয়ে এনবিআরের সন্দেহটি আরো দৃঢ় হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা যায়। এসব বিলে আলু রফতানির ঘোষণা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটি তা রফতানি করেনি। যদিও এ রফতানির বিপরীতে ব্যাংক থেকে নগদ প্রণোদনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াও ছিল ভুয়া।

এমন নানা আর্থিক অপরাধের কারণে দেশ বর্তমানে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। ব্যাংক খাত লুট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চালান জালিয়াতি, অর্থ পাচার প্রভৃতি আমাদের আর্থিক খাতকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। এ বাস্তবতায় রফতানি না করেই নিজের অবৈধ টাকাকে প্রত্যাবাসন হিসেবে দেখিয়ে বৈধ করার প্রবণতা বন্ধ করা অতীব জরুরি। এ ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধপ্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে আমরা সংকটের বৃত্তেই আটকে থাকব।

প্রণোদনা পেতে যারা অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে আর সব জেনেও যারা এ অর্থ বিতরণ করেছে, উভয় পক্ষকেই চিহ্নিত করে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি বিতরণের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। নগদ প্রণোদনা যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কিনা সেটিও তদারকির মধ্যে রাখতে হবে।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক রফতানি বাণিজ্য। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস এটি। রিজার্ভ বৃদ্ধিতে রফতানি আয়ের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে অর্থ পাচারের অন্যতম মাধ্যমও এটি তথা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। দেশে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয় আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যে ‘মিস ইনভয়েসিং’ বা চালান জালিয়াতির মাধ্যমে। কর ফাঁকি দিতে, কোম্পানির মুনাফা লুকাতে এবং অন্যান্য কারণে পণ্য আমদানি ও রফতানিতে অনেক সময় পণ্যের প্রকৃত মূল্য দেখানো হয় না। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পণ্য সরবরাহকারী কিংবা ব্যাংক বা শুল্ক কর্মকর্তাদেরও যোগসাজশ অবশ্যই থাকে। এতে পরিসংখ্যানেও গরমিল হয়। আবার ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রাক্কলন বলছে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং বা কম মূল্য দেখানো এবং ওভার ইনভয়েসিং বা বেশি মূল্য দেখানোর কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের পরিসংখ্যানের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। এনবিআরের সন্দেহ যদি সত্যি হয় তাহলে রফতানির পরিসংখ্যানের বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছাবে। কেননা বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে রফতানির তথ্য জালিয়াতি বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। রফতানি আয়ের পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (বিওপি), চলতি হিসাব, জিডিপিসহ নানা খাতে তা প্রভাব ফেলে।

আবার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথভাবে অনুসন্ধান চালালে অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে জানা যাবে। তাছাড়া আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে এ ধরনের কার্যক্রম কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা করা সম্ভব না। তাই দেশের বাণিজ্য খাতে এ কাজে কোনো চক্র সক্রিয় আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর সঙ্গে রফতানি পণ্য পরিবহন থেকে ব্যাংক পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়ায় নানা ধাপের অনেকেই জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রকৃত বিষয়টি উন্মোচন করতে হলে সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও তদন্ত আবশ্যক।

রফতানি বাণিজ্যসংক্রান্ত সব অনিয়ম সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও পেশাদারত্বের ঘাটতিকেই নির্দেশ করে। শিপিং কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যদি অ্যাসাইকুডার সঙ্গে সংযুক্ত থাকত তাহলে এমনটি ঘটার সুযোগ কম ছিল। অ্যাসাইকুডা পণ্য জাহাজীকরণের প্রকৃত তথ্য যাচাই করতে পারত। আবার শিপিং কোম্পানির বিল অব লেডিং (বিএল) ছাড়া ব্যাংক প্রণোদনা দেয়ার কথা নয়। যদি বিএল ছাড়া ব্যাংক প্রণোদনা দিয়ে থাকে তাহলে এতে ব্যাংকের দায় রয়েছে। আর যদি বিএলের মাধ্যমে প্রণোদনা দেয়া হয়, তাহলে শিপিং কোম্পানি ভুয়া কাগজপত্র দিয়েছে।

এমনিতেই অনেকেই মনে করেন টেকসই রফতানি খাত গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে রফতানি প্রণোদনা। তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্য রফতানি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও বিশেষ সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বরং সরকারের আর্থিক সহায়তার ওপর খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অতিনির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে রফতানি খাতের সম্প্রসারণ, বহুমুখীকরণ ও গুণগত মানোন্নয়নে উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও ঝুঁকি মোকাবেলার নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। এর পরও টানা কয়েক বছর ধরে দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে, সেগুলো প্রশমনের ব্যবস্থাস্বরূপ এ প্রণোদনা ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবে কাজ করেছে। সেখানে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কেউ প্রণোদনা হাতিয়ে নেবে, আবার কেউ কালো টাকা সাদা করবে তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এর জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। রফতানি ও রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর ভবিষ্যতে প্রণোদনা দেয়া থেকে সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসতে পারে, সেটি নিয়েও ভাবা উচিত। নগদ প্রণোদনা দিয়ে রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।