দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোর একটি মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহৎ শ্রমবাজার হিসেবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের পরই এর অবস্থান। এ পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ কর্মী গিয়েছেন। জানা যায়, আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি নিয়োগের চুক্তি হয় ১৯৯২ সালে। কিন্তু চুক্তির পর থেকেই নানা সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ৩১ মে দেশটি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে। এর কারণ হলো অনিয়ম ও সিন্ডিকেট।

তবে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির দুর্নীতির অভিযোগে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ ও আলোচনার পর ২০২২ সালের আগস্টে পুনরায় শ্রমবাজার খুলে দেয়া হয়েছিল। সে সময় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়টি সব এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে দাবি বাস্তবে রূপ নেয়নি। যদিও পর্যায়ক্রমে এজেন্সির সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ এজেন্সির ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়। এ ১০০ এজেন্সির বিরুদ্ধে চক্র করে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই পুনরায় গত বছর দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। চক্র তৈরি করে কর্মী পাঠানোর অনিয়মের অভিযোগে ২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, যা ২০১৬ সালের শেষে উন্মুক্ত করা হয়েছিল।

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের প্রতারণার কথা কমবেশি সবার জানা। বিশেষ করে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রায়ই ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি তথ্য-প্রমাণসহ নাম ধরেই সেসব খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নিতে কখনই দেখা যায় না। আরো উদ্বেগজনক হলো, এসব চক্রের দুর্নীতি উন্মোচন ও জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য সুষ্ঠু তদন্তও নিশ্চিত করা যায়নি। যার নজির আরো একবার মিলল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংস্থাটি মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে করা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত করেও সিআইডির চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ পায়নি। বরং সংস্থাটি আদালতে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেয়ার আবেদন জানিয়েছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা তো দূরের কথা, এ দেশে তাদের বিরুদ্ধে চলা তদন্ত নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায় অনেক।

বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় যখন আদালত নিজেই ওই প্রতিবেদনকে পক্ষপাতমূলক হিসেবে উল্লেখ করেন। এরই মধ্যে মামলাটি তদন্তের ভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে ন্যস্ত করেছেন আদালত। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি রোধে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হওয়াটা জরুরি। সেই সঙ্গে অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এভাবে বারবার এসব সিন্ডিকেট ও দালাল চক্র পার পেয়ে গেলে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে থাকবে। জালিয়াতি চক্রের অভিযোগ বা অন্য যেকোনো কারণে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার বন্ধের খবর অত্যন্ত হতাশাজনক একটি বিষয়, বিশেষ করে যারা সে দেশে কাজ করতে আগ্রহী তাদের জন্য। দেশের অর্থনীতির জন্যও এটি বড় ধরনের সংকট। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের দেশে জনশক্তি রফতানি বড় সমাধান হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একের পর এক শ্রমবাজার বন্ধ হতে দেখা গেছে। জনশক্তি রফতানি খাত পরিচালনায় নীতি-কৌশলে ঘাটতি থাকায় শ্রমবাজার ধরে রাখতে পারছে না দেশ, এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি কোনো সরকারের আমলেই অভিবাসনের নামে মানব পাচারকারী, অর্থ আত্মসাৎকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই শুরুটা হতে পারে ওই মামলার পুনরায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার মাধ্যমে। সেই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনার মুখে সিআইডি অভিযুক্ত আসামির বিরুদ্ধে পুনরায় মামলা করেছে। এ মামলার সুষ্ঠু তদন্তের বিষয়ে সরকারকে নজর রাখতে হবে। আর এ মামলার তদন্তে ডিবি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে—এটাই প্রত্যাশা।

তবে পাশাপাশি আরেকটি কাজও জরুরি। এ মামলার তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি হয়েছে কিনা তা ভালোভাবে অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এছাড়া সংস্থাটির দক্ষতার অভাব আছে কিনা সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দীর্ঘ তদন্তের পর মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি সিন্ডিকেটে জড়িতদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেও দায়মুক্তির আবেদন জানানো বা প্রমাণ না পাওয়া সংস্থা ও এর কর্মকর্তাদের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

চিহ্নিত মানব পাচারকারীদের অপরাধ প্রমাণ করতে না পারার বিষয়ে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে আসামিদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেয়ার সুযোগ নেই। মামলাটিতে উল্লিখিত মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও অর্থ পাচারের যে অভিযোগ রয়েছে তার সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ বাদী সরবরাহ করতে পারেননি। যে কারণে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।

মানব পাচারের মতো ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব সংস্থাটিকে দেয়ার কারণ হলো সিআইডি এ কাজের জন্য গঠিত একটি বিশেষায়িত সংস্থা। বাদী নিজেই যদি তথ্যপ্রমাণ দেবেন, তাহলে তদন্তকারী সংস্থাটির কাজ কী? তবে কি ধরেই নেয়া যায় যে সংস্থা ও নিয়োজিত কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে দক্ষতার অভাব রয়েছে? কেননা তদন্তসংশ্লিষ্টরাও উল্লেখ করেছেন কারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে।