রমজানে ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ এ মাসে সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রমজানের অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস আগে থেকেই যদি আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও পাইকারি বাজার পর্যায়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তবে খুচরা বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। কিন্তু চলতি বছর সেই প্রস্তুতির ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচনী ব্যস্ততায় রমজানকেন্দ্রিক বাজার মনিটরিং কার্যক্রমে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব এরই মধ্যে পাইকারি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকা, দেশে পর্যাপ্ত আমদানি এবং কয়েক মাস ধরে বাজার স্থিতিশীল থাকার পরও রোজার এক মাস আগেই ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, গম ও চালের দাম বেড়ে গেছে। এটি স্পষ্টতই তদারকির দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে।

রমজানের বাজার তদারকি ও পর্যালোচনা নিয়ে ১৯ জানুয়ারি বৈঠক ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যদিও ১৭ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরুর সম্ভাব্য তারিখ। অর্থাৎ রমজান শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে বাজার তদারকি করতে সভা করা হবে। এরপর বিভাগ কিংবা জেলা পর্যায়ে নির্দেশনার পর মাঠ পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম শুরু হতেই আরো অন্তত এক সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন হবে। এতে সময়ক্ষেপণ হবে। এরই মধ্যে পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। আমদানিকারক থেকে পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের দাম কয়েক হাত ঘুরে বেড়ে যাচ্ছে। একবার পণ্যের দাম বেড়ে গেলে পরে অভিযান চালিয়েও খুচরা বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর এ বাজার থেকেই দেশের অর্ধেকের বেশি ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ হয়। এখানকার অস্থিরতা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, বন্দরে চার্জ বাড়ানো, লাইটারেজ জাহাজ সংকট এবং বন্দর থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা—সব মিলিয়ে সরবরাহ চেইনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা রমজানের আগেই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এ সংকট অনেকাংশেই বাজার তদারকির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল। প্রশাসনের নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এ যেন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবার রোজা শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ সয়াবিন তেলের পাইকারি দাম ছিল ৬ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু বৃহস্পতিবার একই মানের সয়াবিন তেলের লেনদেন হয়েছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৬ হাজার ৮৫০ টাকায়। আবার মণপ্রতি চিনির দাম প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, ছোলার দাম কেজিপ্রতি ৩-৫ টাকা বেড়ে ৬৫-৭০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। আমদানি ও উৎপাদন মৌসুম শুরু হওয়ায় পেঁয়াজের দাম নিম্নমুখী থাকলেও আদা-রসুনসহ মসলাজাতীয় পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। দুই মাস ধরে চালের বাজার নিম্নমুখী অবস্থায় স্থিতিশীল থাকলেও আবার বাড়ছে প্রধান খাদ্যশস্যটির দাম। এছাড়া গমের বাজার মণপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে আটা-ময়দার বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

চলতি অর্থবছর শেষে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামেনি। এ অবস্থায় গত নভেম্বরে আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা বাড়িয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। অথচ মূল্যস্ফীতি এখনো ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে মুদ্রাপ্রবাহের পরিবর্তে বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতাই মূল ভূমিকা রাখছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। যদিও নীতি সুদহার বাড়ানোর খুব একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যাচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠে যায়। পরে তা কিছুটা কমে গত বছরের অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ৩৯ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। তবে নভেম্বরে এসে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়তে শুরু করে। অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ থাকলেও নভেম্বরে এ হার বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়। সর্বশেষ ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে ঠেকেছে। তবে অনেকেই মনে করছেন, এ হিসাবের চেয়ে বাজারে পণ্যের দাম প্রকৃতপক্ষে বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব না দিয়ে কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ বাজারকে আরো বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে বলে জোর আশঙ্কা রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু রাতারাতি মূল্যস্ফীতির কারণগুলো দূর করা সম্ভব নয়। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে। এটি করতে হবে বাজার তদারকির মাধ্যমে। তাই শিগগিরই কঠোর তদারকি এবং সে মোতাবেক কাজ শুরু করতে হবে।

যদিও প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে বাজার মনিটরিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হবে। নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। তবে বৃহৎ পরিসরে রমজানের ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে মাঠ পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার কাজ করতে নির্দেশনা দেয়া হবে। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে রমজানের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। কিন্তু এ বছর সে ধারাবাহিকতা না থাকায় বাজারে সুযোগসন্ধানী মহলের তৎপরতা বাড়ছে।

রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকিতে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালন করলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। সরকারিভাবে বিভিন্ন পণ্যের মজুদ বাড়াতে হবে। পণ্যের কৃত্রিম সংকট হলেই সরকারি মজুদ থেকে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। সরকারের মজুদ থাকলে কৃত্রিম মজুদকারীরাও পণ্য মজুদ করবে না বলে আশা করা যায়। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ছোট-বড় সব আমদানিকারক যাতে পণ্য আমদানি করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। সিন্ডিকেটের বাইরে পণ্য আমদানি বাড়লে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যেতে পারে।

সরকার নির্ধারিত পণ্যের দাম বাস্তবায়নে বাণিজ্যসহ কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি সংস্থাকে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব ঘাটতি রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে। রমজানের আগে দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে সরকারকে সদা তৎপর থাকতে হবে।