অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলতি বছর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এ সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে আসন্ন নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। এর মাধ্যমে জনগণ সরকার প্রতিনিধি নির্বাচিত করে এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কৌশল এটি। শুধু তাই নয়, অগণতান্ত্রিক সরকারকে আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যার প্রভাব দেশের আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতায়ও পড়ে। তাই দেশের সার্বিক অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে দীর্ঘদিন এমন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি, যা ছিল প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকার আমলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচন ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত।

এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গঠন করা হয়েছিল ‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’। সম্প্রতি এ কমিশিন এসব নির্বাচন-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সরকারের কাছে। এ কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে একের পর এক সাজানো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধী দল ও জনগণের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এসব নির্বাচন মূলত ছিল প্রহসনমূলক। ডামি প্রার্থী, নির্বাচনের আগের রাতে সিল দেয়া ব্যালট বাক্স ভরে রাখার মাধ্যমে বিগত সরকার নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করেছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদন আকারে বর্তমানে উঠে এলেও রাজনৈতিক বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজ বরাবরই এসব নির্বাচন ঘিরে প্রশ্ন উত্থাপিত করেছে এবং দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি তারা আস্থা হারিয়েছে। তবে প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকার করা হয়েছে যে অতীতের নির্বাচনগুলোয় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এ ধরনের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হোক, তা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। এজন্য সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে। এজন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড রয়েছে। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও যেকোনো প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কমিশন, সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি, যথাযথ নিয়ম মেনে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রার্থী, প্রার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে ভোটদানের পরিবেশ ও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কাজের সুষ্ঠু ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। আর এটিকে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর হত্যাকাণ্ড ও কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলা ঘটনা সেই উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরনের নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে—নির্বাচনের আগে, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের।

এর বাইরে সবচেয়ে জরুরি হলো নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করা। বিগত নির্বাচনগুলোর অনিয়মের পেছনে প্রশাসনের বড় দায় ছিল। এছাড়া নির্বাচন কমিশনকেও ব্যাপক মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল। আর এ দুই প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে বিগত সরকার দীর্ঘমেয়াদে তার ক্ষমতা ধরে রেখেছিল। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল না। আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে এ দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড যাতে নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয় তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রকে সিসিটিভির আওতায় আনা জরুরি, যেটি এখনো পুরোপুরিভাবে করা যায়নি। সেই সঙ্গে ব্যালট পেপার ও বাক্সের ট্র্যাকিং, কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল দ্রুত প্রকাশ এবং পরবর্তী অডিটের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতাও এক্ষেত্রে অপরিহার্য। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা, প্রশাসনের ভূমিকা ও ফলাফল নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পথ আগেই নির্ধারণ না করলে সংকট বারবার ফিরে আসবে। এছাড়া নির্বাচনী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। অতীতের অনিয়মের বিচার না হলে ভবিষ্যতে কেউ নিয়ম মানতে বাধ্য হবে বলে মনে হয় না।

মনে রাখা প্রয়োজন, বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করে, নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করে। দীর্ঘমেয়াদে আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। যার প্রতিফলন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানেও দেখা গেছে। দেশ এখনো স্থিতিশীল হতে পারেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করা যায়নি। এখনো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়নি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জনগণ আবারো যাক, সেটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আস্থা পুনরুদ্ধার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করার কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমানে দেশে যে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা কাটিয়ে ‍ওঠার প্রথম সিঁড়ি হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যদি এবারো নির্বাচন ঘিরে প্রশ্ন থেকে যায়, তবে আবারো দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। আর এজন্য ভুক্তভোগী হবেন জনগণ। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো সরকার গঠন করার পর সেটি স্বৈরাচার হয়ে উঠবে সেটিও কাম্য নয়। আগামীতে নির্বাচিত সরকারকে এটি বিবেচনায় রাখতে হবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচন আবশ্যক, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রয়োজন। আর সুশাসন ছাড়া দেশের অর্থনীতিও টেকসই হবে না।