স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। তবে জিডিপির সঙ্গে বাজেট ঘাটতির অনুপাতে সামঞ্জস্য ছিল। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনে জিডিপির আকার টেনে বড় করা হলেও রাজস্ব আহরণ সেভাবে বাড়েনি। দেশের উন্নয়নমূলক নানা প্রকল্পে খরচ করা হয়েছে লাখো কোটি টাকা। টাকার জোগান দিতে নিতে হয়েছে দেশী-বিদেশী ঋণ। ঘাটতি বাজেট মেটানোর জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া সরকারের ঋণের বড় অংশই আসে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। ট্রেজারি বিল-বন্ড তথা সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে এ ঋণ নেয়া হয়। প্রকল্প ও ঋণের সামঞ্জস্য ধরে রাখতে ব্যবধান বেড়ে যায় বাজেট ঘাটতি। ঘাটতি মেটাতে আনা অর্থ যদি সঠিক খাতে, সততার সঙ্গে, সঠিক সময়ে, উৎকৃষ্ট পন্থায় ব্যবহার করা যেত, তাহলে ঘাটতি বাজেট ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু এসব ঋণের অর্থ লুটপাট, অপচয়, আত্মসাৎ, ভুল প্রকল্পে খাটানো হয়েছে। ফলে ঘাটতি বাজেট আদতেই দেশের অর্থনীতিতে ক্ষত সৃষ্টি করছে। এদিকে দেশের জিডিপির আকার বড় করা হলেও বাংলাদেশের বাজেটের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস রাজস্ব আহরণ বাড়েনি। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতি বছরই বাজেট প্রণয়ন করে সরকার। কিন্তু কোনো বছরই সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রত্যাশা অনুপাতে আয় না হওয়ায় এটিও ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে সরকারকে। দেশের চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ঘাটতি বাজেট কমাতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ দরকার।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেয়া ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ঋণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত তিনটি কিস্তির অর্থ পাওয়া গেছে। এখন চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে বেশকিছু শর্ত সামনে এসেছে, যা বাংলাদেশ সরকারকে পূরণ করতে হবে। ঋণের শর্ত পর্যালোচনায় গত রোববার আইএমএফের মিশন শুরু হয়েছে। ওইদিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে। সফরের শেষে ১৭ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে তারা মূল্যায়ন ও সুপারিশ জানাবে। মিশনের প্রথম দিনে অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন মিশনের কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আইএমএফ রাজস্ব পরিস্থিতি, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরেকটু স্থিতিশীল করা এবং বাজেটে ঘাটতি কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৭ বছরে বাংলাদেশ সরকারের ঋণ ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৮-পরবর্তী মাত্র পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ কোটি টাকার নতুন ঋণ নিয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। আর উচ্চ সুদে নেয়া এ ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়েই এখন সরকারের পরিচালন ব্যয়ের অর্ধেক চলে যাচ্ছে। সরকারি ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সরকারের ঋণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর তথা ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষেও দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণ স্থিতি ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে ঋণের এ স্থিতি ১৯ লাখ ২২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সে হিসাবে এ পাঁচ বছরে সরকারের ঋণ বাড়ে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৭ বছরে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, মাত্র পাঁচ বছরে তার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। এ দেশী-বিদেশী ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশের। নিজস্ব অর্থায়নে দায় পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় ঋণ করেই এসব দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে ক্রমেই বাড়ছে পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি। বাংলাদেশের আয়ের অন্যতম খাত রাজস্ব আয়। দেশের জিডিপির আকার বাড়লেও রাজস্ব আহরণ সেভাবে বাড়েনি। করজাল জিডিপি অনুপাতে বিস্তৃত করা যায়নি। প্রতি অর্থবছরই সরকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু কখনই তা বাস্তবায়ন হয় না। এদিকে প্রতি বছরই সরকারের বাজেটের আকার বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ঘাটতি পূরণে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ ঋণের কিস্তি ও সুদ টানতে গিয়ে ব্যয় চাপ আরো বেড়ে যাচ্ছে সরকারের। এ চক্র থেকে বেরোতে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি উঠেছে। বলা হচ্ছে, দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। করজালের বিস্তৃতি না বাড়ালে এটিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বেসরকারি খাত যত বিকশিত হবে রাজস্ব আহরণ তত বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না করা, কর সম্প্রসারণে জরিপ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা ও পদ্ধতিগত সমন্বয়হীনতা; কর ব্যবস্থাপনার তথ্য বিনিময়ের অপ্রতুলতা এবং দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও ভৌত অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এসব প্রতিবন্ধতা নিরসণসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়িয়েই দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এমনকি বাংলাদেশের জিডিপি নেপালের চেয়ে অনেক বড় হলেও কর আহরণ তাদের থেকে অনেক কম। নেপালে কর-জিডিপি অনুপাত ১২-১৩ শতাংশ। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে দেশের অর্থনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞরা বরাবরই পরামর্শ দিচ্ছেন। এমনকি আইএমএফও শর্ত দিয়েছে। তারা নিজস্ব আয় থেকে ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধে গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো জরুরি।
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৪ লাখ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ছিলেন। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র ৪৩ লাখ। অর্থাৎ নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বাড়লেও রিটার্ন জমা দেয়া ব্যক্তির সংখ্যা সেই তুলনায় কম। কমসংখ্যক রিটার্ন জমা দেয়ার জন্য অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আদায় ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ কম। প্রত্যক্ষ কর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি না পাওয়া কর ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। এনবিআরের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া প্রত্যক্ষ কর আহরণের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো কর জমাদানের প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল। করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব হতে হবে। এছাড়া করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে হবে। আয়করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আহরণ বহুগুণে বেড়ে যাবে। রাজস্ব আহরণ বাড়লে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে এবং ঘাটতি বাজেটও কমবে।










