একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ একবার আমাকে বলেছিলেন যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি আলোচনাগুলো আবর্তিত হয় মূলত সেসব প্রাথমিক চালিকাশক্তিকে কেন্দ্র করে, যেগুলো পরিবর্তনশীল অন্যান্য উপাদানকে প্রভাবিত করে। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘‌আপনি কেবল ভিন্ন একটি উপাদানকে পরিবর্তনশীল দাবি করেই নীতিগত সুপারিশগুলোর অভিমুখ পাল্টে দিতে পারেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ার আগে স্টিফেন মিরনের একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ হয়, যেখানে ঠিক এ কথাই বলা আছে। যেহেতু তার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ঘটে, সেহেতু বিষয়টি গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।

প্রচলিত ধারণায় যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য ঘাটতির জন্য দায়ী করা হয় এর অতিব্যয়কে। এটি দেশটির আর্থিক ঘাটতিতেও (প্রাথমিক চালিকাশক্তি) বড় প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে মিরন যুক্তি দেন যে, প্রকৃত পরিবর্তনশীল উপাদান হলো বিশ্বের বাকি অংশে মার্কিন সম্পদের, বিশেষত ট্রেজারির প্রতি তীব্র চাহিদা। বিদেশীরা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আর্থিক লেনদেনে ব্যবহারের জন্য আরো বেশি মার্কিন ট্রেজারি কিনতে চায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিশাল চাহিদা মেটাতে বড় রাজস্ব ঘাটতিতেও পড়তে হয়েছে। মূলধনপ্রবাহ ডলারের বিনিময় হারকে এতটাই শক্তিশালী করে রাখে যে, মার্কিন রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতা করতে পারেন না, যার কারণে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়।

যুক্তিটি একাধিক কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, সময় বিবেচনা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। একই সময়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব ঘাটতিতেও রূপ নেয়। যদিও এর একটি ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। সে সময় ডটকম বুমের কারণে মূলধনি মুনাফার ওপর কর এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফলে সাময়িকভাবে মার্কিন অতিব্যয় সরকার থেকে গৃহস্থালী পর্যায়ে সরে গিয়েছিল।

যদিও বিদেশীরা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সম্পদ কিনে আসছে এবং মার্কিন সংস্থাগুলোও একইভাবে বিদেশী সম্পদ কিনছে। তবে বিদেশী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ডলার সঞ্চয়ের প্রভাব প্রকৃতপক্ষে ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর থেকেই প্রকট হয়ে ওঠে। সে সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যে কঠোর শর্ত দিয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পূর্ব এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতি আকস্মিক অর্থায়ন সংকটের বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে তুলতে বিশাল পরিমাণ রিজার্ভ সংরক্ষণ শুরু করে। সুতরাং এখানেও সময়ের হিসাব মেলে না।

তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি সমানভাবে সব খাতে বিদ্যমান নয়। বরং এটি পণ্য খাতে বাণিজ্য ঘাটতি এবং পরিষেবা খাতে নিট উদ্বৃত্ত (২০২৪ সালে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার) বজায় রাখে। অর্থনীতিবিদরা এমন একটি প্রবণতা দেখলে এটিকে প্রচলিত তুলনামূলক সুবিধার ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাপল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ডিজাইন করা আইফোন (এবং এর সফটওয়্যার কনটেন্ট) বিশ্বব্যাপী বিক্রি করে বিশাল মুনাফা অর্জন করে। অন্যদিকে ফক্সকন চীন ও ভারতে আইফোন তৈরি করে খুবই অল্প মুনাফা লাভ করে। তাই সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি বড় মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো বিশ্বের বাকি অংশে মার্কিন ট্রেজারির প্রতি যদি অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়, তাহলে মার্কিন বন্ডে বড় অংকের প্রিমিয়ামেও এর প্রতিফলন থাকা উচিত। কিন্তু মিরন অভিযোগ করেছেন, মার্কিন বন্ডের সুদহারে এমন কোনো প্রিমিয়ামে প্রতিফলন নেই। ফলে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন সম্পদ উৎপাদনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি সুবিধা পাচ্ছে না। কেন এ চাহিদা ডলারের মূল্য ধরে রাখলেও মার্কিন বন্ডের সুদহার কমাবে না?

এর সহজ ব্যাখ্যা হলো মার্কিন কংগ্রেস তার ইচ্ছামতো ব্যয় করে এবং ঘাটতি পূরণে বাকি বিশ্বের ওপর নির্ভর করে। তারা ট্রেজারি কিনে সেই ব্যয় মেটায় কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দ্বারা পূরণ করতে পারে না। কখনো কি কোনো কংগ্রেস সদস্য বলেছেন যে ট্রেজারির বৈশ্বিক চাহিদা মেটানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতিতে চলা উচিত? যদি সত্যিই মার্কিন সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত চাহিদা এত বড় সমস্যা হতো, তাহলে কংগ্রেস সহজেই ছোট ঘাটতিতে চলতে পারত। এভাবে বিদেশীরা সীমিত ট্রেজারি কেনার জন্য প্রতিযোগিতায় নামত এবং এতে মার্কিন সুদহার আরো কমে যেত (এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ত)।

তদুপরি যদি রিজার্ভ তৈরি করা সত্যিই এত বড় অতিরিক্ত বোঝা হয়ে থাকে, তাহলে কেন অন্য দেশগুলোকে এটি বহন করতে দেয়া হবে না? কিন্তু এ ভাবনার অনেক দূরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জোটভুক্ত দেশগুলোকে শুধু ডলারভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবার জন্যই হুমকি দিয়েছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে বিদেশী অর্থের প্রয়োজন (সম্ভবত এটি এক প্রকার স্বীকারোক্তি যে রাজস্ব ঘাটতিই আসল পরিবর্তনশীল উপাদান। মিরন বিদেশীদের মার্কিন সম্পদ কেনা এবং এর আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করার আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেসব বিদেশী দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আরো সুযোগ পায়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বাইরে চলে যায়। উদ্বেগজনকভাবে এর মধ্যে ট্রেজারি সুদের ওপর বাছাইকৃতভাবে করারোপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র তার এ অতিরিক্ত বোঝা ছাড়তে না চায়, তবে আমদানি শুল্ক কি অতিমূল্যায়িত ডলারের প্রভাব কাটিয়ে মার্কিন নির্মাতাদের সাহায্য করতে পারে? মিরনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুল্ক আরোপের ফলে ডলারের বিনিময় হার আরো বাড়বে। যেমনটি ঘটেছিল ২০১৮-১৯ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিল। কিন্তু শক্তিশালী ডলার মার্কিন রফতানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং যদি আমদানি করা পণ্যের ডলারের দাম খুব বেশি পরিবর্তন না হয়, তাহলে মার্কিন নির্মাতারা কীভাবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে তা বোঝা কঠিন।

অতএব, মিরন পরিকল্পিত ডলার অবমূল্যায়নের দিকে মনোনিবেশ করেছেন, যেখানে অ-মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হস্তক্ষেপ থাকবে, যাদের শুল্ক আরোপের হুমকি বা মার্কিন প্রতিরক্ষা সহায়তা প্রত্যাহারের ভয় দেখিয়ে রাজি করানো হবে। তবে এমন হস্তক্ষেপ কার্যকর হলেও বিদেশী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি করে নিজেদের দেশীয় বন্ড কিনতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ঘাটতিকে আরো কঠিন করে তুলবে।

মিরন অবশ্যই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, কেন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের তৈরি করা ব্যবস্থা থেকে সরে আসছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মার্কিন রাজস্ব ঘাটতিই একমাত্র কারণ নয়। চীনের ভোগপ্রবণতা কমে যাওয়াও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতায় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বাণিজ্যিক অংশীদারের তুলনায় এর শুল্কহার কম, কিছু দেশ ব্যবসায় বেশি ভর্তুকি দেয় এবং কিছু দেশ ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে এসব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে (সম্ভবত প্রচ্ছন্ন হুমকির সহায়তায়) সমাধান করাই সর্বোত্তম উপায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির পরিণতি কী হবে তা স্পষ্ট নয়। ডলারের আকর্ষণ যে বাড়তি বোঝা এবং অতিরিক্ত সুবিধা নয়—এমন দাবি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেষ করে এ যুক্তি দেয়া ব্যক্তিরাই যখন এ বোঝা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে ভুক্তভোগী দেশ ধরে নিয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে তা বাজারে অস্বস্তি তৈরি করে। যদি এ ধরনের আচরণ ডলারের আকর্ষণকে কমিয়ে দিত, তাহলে এটি সত্যিই একটি অতিরিক্ত বোঝায় পরিণত হতো। তবে এমন ভবিষ্যৎ কোনো আমেরিকানই চায় না।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

রঘুরাম জি রাজন: ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রধান অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং Breaking the Mold: India’s Untraveled Path to Prosperity (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, মে ২০২৪) বইয়ের সহ-লেখক (রোহিত লাম্বার সঙ্গে)

অনুবাদ: দিদারুল হক