ডেভিড সি এঙ্গারম্যান, দক্ষিণ এশিয়ার ছয় অর্থনীতিবিদ—অমর্ত্য সেন, মনমোহন সিং, রেহমান সোবহান, মাহবুব উল হক, লাল জয়াবর্ধনে, জগদীশ ভগবতী—কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়নতত্ত্বে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছেন। এ বিষয়ে অ্যাপোসলস অব ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক বই লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অধ্যাপক ডেভিড সি এঙ্গারম্যান। সম্প্রতি এ বই নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম
‘অ্যাপোসলস অব ডেভেলপমেন্ট’ (উন্নয়নের পুরোহিত) বইটি লেখার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল? এমন কোনো মুহূর্ত, নথি বা ব্যক্তিগত গল্প ছিল কি যা আপনাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল যে এ ছয়জন অর্থনীতিবিদ একটি একক আখ্যানের অংশ?
আমি মূলত আন্তর্জাতিক উন্নয়নের ইতিহাস লেখার আগ্রহ থেকেই বইটি লিখতে শুরু করি। এর আগে স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারতে অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী বইয়ের কাজ শেষ করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতার সূত্রে দক্ষিণ এশিয়া আমার চিন্তায় গভীরভাবে গেঁথে ছিল। আমি চেয়েছিলাম বিষয়টিকে কেবল নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেও দেখতে।
আমার এক সহকর্মী, অধ্যাপক রোহিত দে, পরামর্শ দিলেন যে আমার আগ্রহের বহু মানুষ ও ধারণা ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কেমব্রিজে একত্র হয়েছিল। এ সূত্র ধরে আরো অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি ছয়জন অর্থনীতিবিদকে খুঁজে পাই, যারা সবাই ১৯৫৫-১৯৫৭ সালের মধ্যে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। এতে আমার ভারতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন গবেষণার একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয়। গবেষণার একপর্যায়ে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হই—এ ব্যক্তিরাই কেন? অনুসন্ধানের উত্তরও তখন স্পষ্ট হয়। তারা সবাই ১৯৩২-৩৬ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ১৯৫৩-৫৭ সালের মধ্যে কেমব্রিজে অধ্যয়ন করেছেন। সেখান থেকেই বইটির মূল কাঠামো ও রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘উন্নয়ন’ শব্দটি প্রায়ই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা দারিদ্র্য হ্রাস অর্থে ব্যবহৃত হয়। আপনার বইয়ে এটিকে প্রায় একটি গভীর ধারণা বা বিশ্বাস হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আপনার নিজের গবেষণায় আপনি উন্নয়নকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং আপনার মতে মানুষ সাধারণত এটির সম্পর্কে কী ভুল বোঝে?
আমার দৃষ্টিতে এর সংজ্ঞা বেশ বিস্তৃত। আমি মনে করি, অর্থনীতির বিভিন্ন শাখা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে নিজস্বভাবে অবদান রাখে। আমি একে দেখি অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্দেশ্যে গৃহীত সচেতন ও লক্ষ্যনির্ভর প্রয়াস হিসেবে, যা প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রের উদ্যোগেই পরিচালিত হতো। তবে এর মানে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়; জিডিপি প্রবৃদ্ধি তার একটি অংশমাত্র।
এ ছয়জন ‘অ্যাপোসলস’ যখন কেমব্রিজে পড়াশোনা শুরু করেন, তখনো ‘উন্নয়ন অর্থনীতি’ (development economics) নামে কোনো স্বতন্ত্র ক্ষেত্র গড়ে ওঠেনি। তাই তারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, কল্যাণ অর্থনীতি ইত্যাদি বিস্তৃত ক্ষেত্রে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছিলেন। তারা কখনো এ ধারণাকে সংকীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করেননি, আমিও করিনি।
আপনি প্রতিষ্ঠান বা নীতির পরিবর্তে ব্যক্তি আকারে অর্থনীতিবিদদের ওপর মনোযোগ দিয়েছেন। এ মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে কী প্রকাশ করেছে?
আমি এ উপলব্ধি থেকেই কাজটি শুরু করি যে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও উন্নয়ন অর্থনীতি মূলত বাস্তবমুখী ক্ষেত্র। এগুলোর পরিসর শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক জগতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) কিংবা আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর পরিকল্পনা কমিশন, উন্নয়ন সংস্থা ও অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ বিস্তৃত পরিসরকে ধরতে গিয়ে আমি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস লেখার পথে না গিয়ে ছয়জন অর্থনীতিবিদের দীর্ঘ কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিই। এ পদ্ধতি আমাকে বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন, একাডেমিক কাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সংযোগস্থলগুলো দেখিয়েছে। ফলে বইটি কেবল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, বরং ব্যক্তিগত যাত্রার ধারাবর্ণনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে যা একে আরো গ্রহণযোগ্য ও পাঠযোগ্য করেছে।
তাদের ব্যক্তিজীবনে গভীরভাবে প্রবেশ করা কি কঠিন ছিল?
এক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল কী অন্তর্ভুক্ত করা হবে ও কী বাদ দেয়া হবে তা নির্ধারণ করা। এ বইয়ে আমি পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখার পরিবর্তে অর্থনীতিবিদদের পেশাগত জীবনের ওপর মনোযোগ দিয়েছি। আমি তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কেবল তখনই কথা বলেছি যখন সেই অভিজ্ঞতাগুলো সরাসরি তাদের পেশাগত পথকে প্রভাবিত করেছিল। এর বেশি কিছু নয়। সেই অর্থে, এটি অন্য যেকোনো কাজের মতোই একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল: সীমানা কোথায় টানতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন আরো গবেষণা করতে হবে এবং কীভাবে বিষয়গুলোকে একসঙ্গে রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পশ্চিমা দাতা সংস্থা বা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়। আপনার বইটি তুলে ধরে যে গ্লোবাল সাউথের অর্থনীতিবিদরা কীভাবে সেই বিতর্কগুলোকে আকার দিয়েছেন। এখন গল্পের সেই দিকটি ফিরে দেখা কেন গুরুত্বপূর্ণ? উন্নয়নকে একটি দ্বিমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় হিসেবে দেখার মাধ্যমে আমরা কী লাভ করি?
এর মাধ্যমে উন্নয়ন আসলে কী, মানুষ তাত্ত্বিকভাবে কী ভাবছে ও বাস্তবে কী করছে বা বিশ্বাস করছে, তা উপলব্ধি করতে পারি। আমার মনে হয়, গল্প বলার এটিই সবচেয়ে সঠিক ও কার্যকর পদ্ধতি। এ ছয়জন অর্থনীতিবিদ কিংবা ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর আরো অনেক গবেষকের অবদান স্বীকার না করে উন্নয়নের ইতিহাস লেখা অসম্ভব। তারা আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজ করে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই কারো ভূমিকাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
আপনার বইয়ে এতগুলো দেশ, ভাষা ও আর্কাইভ কভার করতে হয়েছে। এটি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং ছিল। উৎস খুঁজে বের করা বা এই ভিন্ন ভিন্ন অর্থনীতিবিদের জীবনকে এ গল্পে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আপনি সবচেয়ে বড় কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
আমি কিছুটা হতাশ ছিলাম। কারণ ‘অ্যাপোসলস’দের ব্যক্তিগত কোনো আর্কাইভ ব্যবহার করতে পারিনি। হয়তো এর কারণ তারা জীবনের বিভিন্ন সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফলে তাদের কাগজপত্র কখনো এক জায়গায় সংগৃহীত করা হয়নি। আবার কেউ কেউ হয়তো তাদের কাছে যা ছিল তা দিতে আগ্রহী ছিলেন না।
ভাষার দিক থেকে বললে, বইটি মূলত ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। আমি রুশ ভাষার এক-দুটি উৎস ব্যবহার করলেও অধিকাংশই ছিল ইংরেজিতে। এটি এক অর্থে এটিই প্রতিফলিত করে যে এ অর্থনীতিবিদরা তাদের পেশাগত জীবনের অনেকটা ইংরেজি ভাষার পরিসরেই কাটিয়েছেন। অবশ্য আমি চেয়েছিলাম বাংলা, উর্দু, হিন্দি, সিংহলি কিংবা মারাঠি ভাষার উৎসও কাজে লাগাতে। তাতে হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি বই তৈরি হতো। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী বাংলাদেশী আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কিছু বাংলা উৎস অনুবাদে আমাকে সহায়তা করেছিল। তবে বইটি শেষ পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার উৎসের ওপরই লেখা হয়েছে।
যদিও আপনার বইটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, তবে এটি যে বিতর্কগুলো অন্বেষণ করে যেমন বৈষম্য, টেকসইতা ও বৈশ্বিক অর্থায়ন, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। সেই প্রথম দিকের অর্থনীতিবিদদের কোন শিক্ষাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক, বা সম্ভবত পুরনো ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি করার বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক করে?
এ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে লেখার একটি বড় সুবিধা ছিল। তাদের মধ্যে পাঁচজনের কর্মজীবন একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে বইটিতে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকসহ পরবর্তী সময়কালও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা সম্ভব হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক উন্নয়নকে আমি যেমন ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর এক যৌথ প্রকল্প হিসেবে দেখি, তেমনি এখান থেকে একটি মৌলিক শিক্ষা মেলে: বাস্তব প্রয়োগ সবসময় তত্ত্বের আগে আসে। বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই মনে করেন যেকোনো ধারণা ব্যক্তিগত চিন্তা থেকে জন্ম নিয়ে পরে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে ‘উন্নয়ন অর্থনীতি’ সবসময়ই নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের প্রয়াস থেকেই বিকশিত হয়েছে। বাস্তব জগতের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়া ও সমাধানের চেষ্টার মাধ্যমেই ক্ষেত্রটি ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে। সেই কারণেই বইটি বৈশ্বিক ও জাতীয় উভয় স্তরে গভীর মনোযোগ দেয়।
‘অ্যাপোসলস অব ডেভেলপমেন্ট’-এ, রেহমান সোবহান কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি আপনার বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু। তার গল্পটি বইয়ে কীভাবে স্থান পেয়েছে? একটি আঞ্চলিক কেস স্টাডির চ্যালেঞ্জ হিসেবে নাকি জ্ঞানের রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে?
আমি বলব, এটি চ্যালেঞ্জের চেয়ে বরং এক বড় সুযোগ। তার কর্মজীবন আমাকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পথ দেখিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো আঞ্চলিক বৈষম্য। ধনী-দরিদ্রের প্রচলিত বিভাজনের পাশাপাশি তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য চিহ্নিত করেন। পাশাপাশি তা সমাধানের প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমেই পরবর্তী সময়ে প্রথমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনের পথ তৈরি করে।
দ্বিতীয় সুযোগটি আসে তার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কাজ থেকে। এর মাধ্যমে আমি এনজিও খাতের উত্থান নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করার সুযোগ পাই। আমার মতে, এটি নব্বইয়ের দশকের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ছিল।
রেহমান সোবহানের মতে স্বাধীনতার ঠিক পরপরই একটি সাম্যের সমাজ গড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা দেখা গিয়েছিল। আপনার গবেষণার ওপর ভিত্তি করে আপনি বক্তব্যটি কীভাবে দেখেন?
আমি মনে করি, এটি সেই দ্বিধাটিই তুলে ধরে, যা অধ্যাপক সোবহান এবং তার সমসাময়িক অনেকেই ভালোভাবে জানতেন। প্রশ্নটা হলো, উন্নয়নের লক্ষ্য কি দারিদ্র্য হ্রাস হওয়া উচিত নাকি বৈষম্য হ্রাস? দারিদ্র্য হয়তো সম্পদের বণ্টন পরিবর্তন না করেও হ্রাস করা যেতে পারে। কিন্তু রেহমান সোবহান সবসময় কেবল দারিদ্র্য নয়, বরং বৈষম্য দূর করার বিষয়েই বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। আর এটা নিশ্চিতভাবেই একটি কঠিন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তার সহপাঠী মাহবুবুল হক একবার বলেছিলেন যে প্রবৃদ্ধি না থাকলে আমরা কেবল ‘দারিদ্র্য পুনর্বণ্টন’ই করতে পারব।
আপনার বইয়ের একটি অংশে দুই ব্যক্তিত্ব কেমব্রিজে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান (তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) সম্পর্কে বিতর্ক করেছিলেন। আপনি কি সেই বিতর্কগুলো থেকে কোনো বিশেষ আকর্ষণীয় ঘটনা খুঁজে পেয়েছেন?
হ্যাঁ। ১৯৭২ সালে নিউইয়র্কের রচেস্টারে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও মাহবুবুল হক একটি কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাহবুবুল হক ছিলেন ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে। তিনি বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাকে একটি বিপর্যয় হিসেবে দেখেছিলেন। অন্যদিকে রেহমান সোবহান তার অবস্থানে অবিচল ছিলেন। তিনি স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দিকে পৌঁছায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি কূটনৈতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এক ধরনের ‘বিকল্প-রাষ্ট্রদূত’ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
কেমব্রিজের ছাত্র থেকে রেহমান সোবহানের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রধান কণ্ঠে পরিণত হওয়ার পরিভ্রমণটা উল্লেখ করার মতো। তার কেমব্রিজের অভিজ্ঞতার কোন দিকগুলো অর্থনীতির ছাত্র থেকে জাতীয় মুক্তির চিন্তক হিসেবে রূপান্তরে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল?
রেহমান সোবহান কীভাবে কেমব্রিজে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তা নিয়ে তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন। মজার বিষয় হলো, এ পরিবর্তন ক্লাসরুমের চেয়ে বরং বিতর্কের রাজনৈতিক পরিবেশের মাধ্যমে বেশি ঘটেছিল। তিনি নিউ স্টেটসম্যান অ্যান্ড নেশন (New Statesman and Nation)-এর মতো ম্যাগাজিনগুলোর আগ্রহী পাঠক হয়ে ওঠেন। যখন তিনি ষাট-এর দশকের শেষের দিকে ফোরাম (Forum) ম্যাগাজিনটি প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি সেটিকে সরাসরি ওই প্রকাশনাগুলোর আদলে তৈরি করেন। সেই অর্থে, কেমব্রিজ তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এ অভিজ্ঞতাই তার ভেতর দক্ষিণ এশিয়াকে একটি ঐক্যবদ্ধ অঞ্চল হিসেবে দেখার স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতেও সাহায্য করেছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও দেশের প্রতি রেহমান সোবহানের অবদান সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেহমান সোবহানেরই ছাত্র ছিলেন। বিগত দশকে রেহমান সোবহান একটি চ্যালেঞ্জিং অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছেন, আবার একই সঙ্গে দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নীতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আমি বলব, রেহমান সোবহান ষাট ও সত্তরের দশকে যখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন, তখন তিনি আওয়ামী লীগকে যেভাবে দেখতেন, তার তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দলটি সেই আদর্শ থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে।
আপনার বইয়ের ছয়জন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মধ্যে কার দর্শন আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে?
খুবই সংগত প্রশ্ন। ব্যক্তিগতভাবে আমি রেহমান সোবহানের প্রতিই বেশি ঝুঁকি। যদিও আমি তার মতো একজন নিবেদিত কর্মী ছিলাম না। তবে ছয়জন অ্যাপোসলসকেই একসঙ্গে বিবেচনা করলে বইটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়। অ্যাপোসলরা কেমব্রিজে যা শিখেছিলেন, তার মধ্যে একটি মূল শিক্ষা হলো—অর্থনীতি কোনো একক অবস্থান নয়, বরং একটি বিতর্ক। তারা সবাই মিলে একক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেননি; বরং উন্নয়নকে একটি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর মাধ্যমে একটি বিস্তৃত বিতর্কের কাঠামো উপস্থাপন করেছেন।
গ্লোবাল সাউথের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনি তাদের দর্শন বা তত্ত্বগুলোকে কীভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন?
আমি মনে করি, এ শিক্ষাই এখন জরুরি যে বাস্তব প্রয়োগ সবসময় তত্ত্বের আগে আসে। অর্থাৎ অনমনীয় মতাদর্শের (rigid ideology) চেয়ে ধীরগতির পরিবর্তন ও বাস্তবমুখিতার (pragmatism) প্রয়োজন বেশি। অর্জন সাধারণত ধাপে ধাপে, ছোট ছোট উন্নতির মাধ্যমে আসে। আমরা যেখানেই পারি, পরিস্থিতির উন্নতি করি। আমরা জানি যে ভবিষ্যতের প্রজন্মকে এ সমাধানগুলো আবার দেখতে হবে ও সংশোধন করতে হবে। কারণ যেকোনো সমস্যার সমাধান অনিবার্যভাবে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আপনার ভূমিকা কীভাবে দেখেন? নাকি আপনার প্রাথমিক লক্ষ্য অতীত বুঝতে সাহায্য করা?
পেশাগতভাবে আমার ঝোঁক শেষের দিকে: অতীত বোঝা। দক্ষিণ এশিয়ায় ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশককে পুনরুজ্জীবিত করা বর্তমানে একটি প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক শিক্ষা। সে সময় মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করত যে তারা বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারে। এটি কোনো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল না; এটি ছিল সম্পৃক্ততা ও তাদের অঙ্গীকার। এ ধরনের দৃঢ় সংকল্প আমার ভালো লাগে। আমার মনে হয়, মূল শিক্ষাটা হলো সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা।
নতুন প্রজন্ম জাতি গঠনে সহায়তা করার জন্য আপনার বই থেকে কী শিখতে পারে?
শুনতে হয়তো সন্তোষজনক মনে হবে না, তবে বাস্তব পরিবর্তন শুরু হয় সক্রিয় অংশগ্রহণ ও যুব আন্দোলনের মাধ্যমে। ঠিক যেমনটা আমরা গত বছর বাংলাদেশে বা এই সেপ্টেম্বরে নেপালে দেখেছি। এ ধরনের অংশগ্রহণ পরিবর্তনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালায় ঠিকই তবে তা কেবলই শুরু। রেহমান সোবহানের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করেছিলেন। এর পরের দুই-তিন বছর দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন। তার পর থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশকে সঠিক পথে চালিত করার জন্য প্রেরণা জুগিয়েছেন, চালনা করেছেন এবং পথ দেখিয়েছেন। এটি হলো আজীবনের এক সক্রিয় অংশগ্রহণ, যা অনেক সাফল্য এনেছে।
আপনার বই থেকে এমন কোনো বিষয় বা বার্তা আছে যা আপনি তুলে ধরতে চান?
আমি দুটি মূল ধারণা তুলে ধরতে চাই। প্রথমত, ‘গ্লোবাল সাউথ’ হলো একটি সক্রিয় প্রকল্প। দ্বিতীয়ত, বাস্তব প্রয়োগ তত্ত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমি ইতিহাস বোঝার জন্য একটি ইতিহাস গ্রন্থ লিখছি, তবুও বইটি একই সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং লেগে থাকার গুরুত্বও তুলে ধরে। বিপ্লব একদিনে অর্জিত হয় না; বিপ্লব এক দিন, এক সপ্তাহ বা এক মাসে শুরু হয় কেবল। আমার সেই ছয়জন অর্থনীতিবিদ প্রত্যেকেই নিজস্ব কর্মে লেগে ছিলেন। তারা বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে গেছেন।
একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ইতিহাসবিদ হওয়ার সুবিধা হলো আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে হয় না। আমি যা পড়ছি, তা আমাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করছে ঠিকই, তবে আমি মনে করি এখানে সম্ভাবনাও রয়েছে। পরিস্থিতি অনেক দিন ধরেই অস্থির বলে মনে হচ্ছে এবং তাতে কোনো পরিবর্তনও আসেনি। তবুও ছোট ছোট অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। আর বিপ্লব প্রায়ই এ ধরনের ছোট ছোট অগ্রগতিরই ধারাবাহিকতা। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ এখনো নমনীয়, পরিবর্তনযোগ্য মুহূর্তে আছে। আশার কারণও আছে, আবার সতর্কতামূলক ইঙ্গিতও রয়েছে।
শ্রুতলিখন ও অনুবাদ: মিনহাজুল আবেদীন









