কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ সার। ধান চাষের মৌসুমে এ উপকরণের সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয়। সেসময় দেশের কৃষকরা চাহিদামাফিক সার পান না। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি টাকা দিলে সার পান কৃষক। তৈরি হয় সারের কৃত্রিম সংকট। ফলে সারের দাম বেড়ে যায়। যথাসময়ে কৃষকরা সার না পেলে চাষাবাদ ব্যাহত হয় ও ফলন কম হয়। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ ওঠায় সরকার সার বিতরণের পুরো দায়িত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী চক্র ভাঙতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯’ সংশোধন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সারবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটির সভায় এ নীতিমালা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে সংশোধিত নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
নতুন নীতিমালায় অনিয়মকারী ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের বিধান থাকছে। সেই সঙ্গে সারের বর্তমান ডিলারশিপ সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী চক্র ভাঙতে এ উদ্যোগ ইতিবাচক। একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। সেবার মান বাড়বে এবং কৃষক উপকৃত হবেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক ডিলার থাকলে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারবে না। একই সঙ্গে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া (ডিএপি, টিএসপি, এমওপি) সার একই ডিলারের অধীনে বিতরণের ব্যবস্থা করা হলে কৃষককে আর আলাদা জায়গায় যেতে হবে না। এতে সময় ও খরচ—দুই-ই বাঁচবে। তবে এসব সফলতা নির্ভর করছে নীতিমালাটি যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়নের ওপর। তবে উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে সারের সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হতে পারে।
দেশে সার বিতরণ ব্যবস্থায় ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণের দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) হাতে। সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯-এর অধীনে সংস্থা দুটি সারা দেশে ডিলারশিপ নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করত। বিএডিসি ও বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সারের ডিলারশিপ রয়েছে মোট ৭ হাজার ১৫০টি। এর মধ্যে বিসিআইসির আওতাধীন ডিলার রয়েছে ২ হাজার ১১৮ আর বিএডিসির আওতাধীন ৫ হাজার ২২ জন। বর্তমানে দেশে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে ডিলার থাকার বিধান রয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বিদ্যমান ডিলারের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। অতীতে দেখা গেছে, দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেয়ার কারণে সার বিতরণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা ধান চাষের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পাননি। নতুন নীতিমালা অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট, সরকারি চাকরিজীবী বা একই পরিবারের একাধিক সদস্য কোনোভাবেই ডিলারশিপ পাবেন না। স্থানীয় প্রশাসনের যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য আবেদনকারীদের ডিলার হিসেবে অনুমোদন দেয়া হবে। এমন নীতিগত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা গেলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
তবে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা ঘটলে নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ডিলার নিয়োগে যদি দলীয় আনুগত্য, ঘুস বা প্রভাব আবারো প্রবেশ করে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাছাড়া নতুন নীতিমালার অধীনে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের চাপ সামলাতে ছোট ডিলাররা সক্ষম নাও হতে পারেন। তাই তাদের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সহায়তা, ঋণ ও প্রশিক্ষণ।
সরকারের পক্ষ থেকে সারের সংকট নেই বলা হলেও চলতি আমন মৌসুমে দেশের চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সংকট ছিল। তবে বেশি দাম দিলে ঠিকই সার পেয়েছেন কৃষকরা। এ সংকটকে ‘কৃত্রিম’ বলছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ কৃত্রিম সার সংকট সৃষ্টি করে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও দুই হাজারের বেশি ডিলারের এ ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে, যাদের ডিলারশিপ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নতুন নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্যই হলো এ চক্রকে ভেঙে দেয়া। তাই এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষকরা এর সফল পেতে পারেন।
তবে নির্বাচনের আগে নতুন ডিলার নিয়োগকে ঘিরে আবারো রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিসিআইসি ও বিএডিসির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আগে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। যদি সেই পুরনো সংস্কৃতি নতুন ব্যবস্থায় ফিরে আসে, তবে স্বচ্ছতার পরিবর্তে আরো বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। ডিলার সংখ্যা দ্বিগুণ হলে তদারকি আরো কঠিন হবে। ফলে দুর্নীতি ঠেকানো আরো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কৃষি খাত অত্যন্ত চাপে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনয়ন অত্যন্ত জরুরি। তাই সরকারের নতুন উদ্যোগে সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি আশঙ্কাও কম নয়। তবে সার বিতরণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাতে নেয়া যৌক্তিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে, কৃষক সত্যিই এর সুফল পাচ্ছেন কিনা। সরকারের দায়িত্ব হলো—প্রতিটি ইউনিয়নের কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে, সময়মতো, যথাযথ মানের সার পৌঁছে দেয়া। আর এটি তখনই সম্ভব, যখন ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকবে, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং কৃষকের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়া হবে।









