বাংলাদেশ সরকারের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। যে কারণে প্রতি অর্থবছরে প্রণয়ন করা হয় ঘাটতি বাজেট। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ করে সরকার সেই ঘাটতি বাজেট পূরণের চেষ্টা করে। এতে আবার সরকারের ব্যয়ের বৃহত্তম খাত হয়ে দাঁড়ায় এসব ঋণের সুদ পরিশোধ। এর বাইরে সরকারের ব্যয়ের প্রধান দুটি অংশ হলো পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়। সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোয় দেখা গেছে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। বিপরীতে কমছে উন্নয়ন ব্যয়। পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ আবার যায় কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। এমন পরিস্থিতিতে নবম জাতীয় পে-কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করেছে তা বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের পরিচালন ব্যয় উদ্বেগজনক হারে বাড়বে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষার মতো উন্নয়নমূলক খাতের ব্যয় আরো সংকুচিত হয়ে আসার শঙ্কা রয়েছে। কেবল তা-ই নয়, পুরো পরিচালন খাতের ব্যয় মেটানোর সরকারি সক্ষমতাও আরো কমে আসবে।

এর বাইরেও দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান একটি সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির বড় ক্ষত হয়ে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যাংক মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ভাটা ও ঋণপ্রবাহ নিম্নমুখী হওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য বাজারে অর্থপ্রবাহ সীমিত করে জনগণের চাহিদার রাশ টানা, যাতে চাহিদা নিম্নমুখী হয়ে মূল্যস্তর নিচে নেমে আসে। যদিও মূল্যস্ফীতির ওপর কোনো পদক্ষেপের প্রভাব খুব বেশি পড়েনি। তবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির অর্থ হলো বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে যাওয়া, যা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরো স্ফীতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর আর্থিক চাপ আরো বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন বৃদ্ধিসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত সুবিবেচনাপ্রসূত। বিশেষ করে সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

নবম জাতীয় পে-কমিশন সর্বনিম্ন ধাপে বেতন কাঠামো ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। আর সর্বোচ্চ ধাপে বেতন কাঠামো ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বেতন-ভাতা বাড়ানোর এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকারের প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এদিকে এরই মধ্যে বর্তমানের ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং নয় লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। আর এ অর্থ সংস্থানের উৎস রাজস্ব আয়। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয় পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। কোনো অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। চলতি অর্থবছরের (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রথম ছয় মাসের রাজস্ব আয়েও সে চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে রাজস্ব আয়ে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি রয়ে গেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এনবিআরের রাজস্ব আহরণের হালনাগাদ চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের সংশোধিত মোট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু আয় হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ হয়েছে। কিন্তু এ সময় সরকারের ব্যয় ছিল বহুগুণ বেশি। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় মোট ৬ লাখ ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা পরিচালন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, যা সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিগত সময়ে রাজস্ব আয়-ব্যয়ের চিত্র এটাই প্রকাশ করছে যে সরকারের প্রতি অর্থবছরে যে আয় হয় তা দিয়ে পুরো পরিচালন ব্যয়ই মেটানো সম্ভব না। যে কারণে ঋণ করে চলতে হয় সরকারকে। পাঁচ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তাছাড়া বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা আরো বাড়বে। কারণ বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান রাজস্ব আয় দ্রুতগতিতে বাড়ানোর মতো কোনো কার্যকর কৌশল সরকারের হাতে নেই। এমনকি কর ফাঁকি পুরোপুরি বন্ধ করার মতো কোনো কৌশলও সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই সরকার যখন বাড়তি ব্যয় মেটাতে ঋণের দিকে ঝুঁকবে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণ, সেটি বেসরকারি খাতের ওপর চাপ বাড়াবে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন যদি দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হয় তাহলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। তাতে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও বেসরকারি খাতে যতটুকু স্থিতিশীলতা রয়েছে, সেটিও ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ কর্মকাণ্ড এ খাতে পরিচালিত হচ্ছে। তাই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন, যা খাতটিকে আরো নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে। সরকারি খাতের কর্মজীবীদের বেতন আড়াই গুণ বাড়ানোর আগে সরকারকে অবশ্যই বেসরকারি খাতের কথাও বিবেচনায় নিতে হবে।