তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা জাদুঘরেও। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করতে জাদুঘরগুলোর আধুনিকায়ন ঘটেছে। যে কারণে এসব জাদুঘর কখনো আকর্ষণ হারায়নি। কিন্তু পুরো বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশের জাতীয় জাদুঘরে। বছর দশেক আগেও প্রতি বছর গড়ে ছয় লাখ দর্শনার্থী জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দর্শনার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমেছে।

অন্যদিকে লুভ্যর মিউজিয়াম, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভ্যাটিকান মিউজিয়াম, চীনের জাতীয় জাদুঘর, লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতো বহু বিশ্বখ্যাত জাদুঘরে এখনো লাখ লাখ দর্শনার্থী যান। প্রাচীন সভ্যতার শুরু থেকে আধুনিক সভ্যতার বর্তমান সময় পর্যন্ত ইতিহাসের বহু শ্রেষ্ঠ নিদর্শন রাখা আছে জাদুঘরগুলোয়। আধুনিক উপায়ে লাখ লাখ নিদর্শন সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে এসব জাদুঘরে। তবে কেবল নিদর্শন প্রদর্শনী নয়, দর্শকদের কাছে আরো তথ্যবহুল ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের জন্য জাদুঘরগুলোয় সংযুক্ত করা হয়েছে এআর/ভিআর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল আর্কাইভ। এগুলোর মাধ্যমে দর্শনার্থীর অংশগ্রহণমূলক অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য অনেক জাদুঘর প্রাঙ্গণে গবেষণাগারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এমনকি অনেক জাদুঘর বিনামূল্যে দোভাষীর ব্যবস্থা রেখেছে, যাতে যেকোনো ভাষার জনগণ জাদুঘর স্বাচ্ছন্দ্যে পরিদর্শন করতে পারে। এভাবে বিশ্বের বহু জাদুঘর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ইতিহাস-ঐতিহ্য পৌঁছে দিচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা ও গবেষণা উপযোগী হয়ে উঠেছে।

দেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় জাদুঘরকেও আধুনিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক উপায়ে গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও লোকজ সংস্কৃতির মতো সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় জাদুঘর এখনো প্রথাগত সেকেলে পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এখনো পুরনো চারতলা ভবনেই জাদুঘরের প্রশাসনিক ও প্রদর্শনী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম তলায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক নিদর্শন। দ্বিতীয় তলায় ইতিহাস ও শিল্পকলার গ্যালারিতে সুলতানি ও মোগল আমলের শিল্পকর্ম, মুদ্রা ও অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। তৃতীয় তলায় রয়েছে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন—দুর্লভ আলোকচিত্র, অস্ত্র ও স্মারক। চতুর্থ তলায় বিশ্ব সভ্যতা ও লোকশিল্পের নিদর্শন স্থান পেয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে একটি লাইব্রেরি এবং সংরক্ষিত পশুপাখি ও তিমি মাছের কঙ্কাল। এখানে ডিজিটাল গাইড, ইন্টার‌্যাকটিভ ডিসপ্লের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পায়নি এখনো। আবার এটি কলেবরেও বাড়েনি। যে কারণে প্রদর্শিত নিদর্শনের সংখ্যাও সীমিতই রয়ে গেছে।

জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে প্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক সময়ের প্রায় ৯৪ হাজার নিদর্শন। তালপাতার পাণ্ডুলিপি, প্রাচীন মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র, শিল্পকর্ম, লোকজ সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক—সব মিলিয়ে এ জাদুঘরের সংগ্রহশালা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। কিন্তু জায়গাসংকট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এর মাত্র ৪ শতাংশ নিদর্শনই দর্শনার্থীরা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থাৎ জাতীয় জাদুঘরে এসে দর্শনার্থীরা প্রকৃত অর্থে জাতীয় ঐতিহ্যের সামান্যই দেখতে পান। একই প্রদর্শনী, বিশেষ কোনো কর্মসূচি না থাকা, দিবসভিত্তিক গতানুগতিক ধাঁচের অনুষ্ঠান, অদক্ষ পরিচালনাসহ নানা কারণে মানুষের কাছে জাদুঘর তার আবেদন হারিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর সংরক্ষণ ব্যবস্থা। দেশের জলবায়ু এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাতীয় জাদুঘরের স্টোররুম ও সংগ্রহশালাগুলোর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত নয়। এর ফলে কাগজ, কাঠ, চামড়া, ধাতব সামগ্রীতে দ্রুত ক্ষয় দেখা দিচ্ছে। এরই মধ্যে বহু মূল্যবান নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাওয়ার তথ্য সংশ্লিষ্টরা স্বীকারও করেছেন। অর্থাৎ আধুনিকায়ন তো দূরের কথা, একটি জাতীয় জাদুঘরে নিদর্শন সংরক্ষণের মতো সুষ্ঠু পরিবেশও নেই। এটি প্রমাণ করে যে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি নীতিনির্ধারকরা কতটা উদাসীন।

সরকারি নীতিনির্ধারকদের উচিত জাতীয় জাদুঘরকে নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা। এর অবকাঠামো সম্প্রসারণ, আধুনিক স্টোররুম নির্মাণ, ডিজিটালাইজেশন এবং দক্ষ জনবল দ্বারা এটি পরিচালনার জন্য উদ্যোগ নেয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বেসরকারি খাত ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে জাদুঘরকে শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়, শিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

জাতীয় জাদুঘর কোনো সাধারণ সাংস্কৃতিক স্থাপনা নয়; এটি দেশ ও সমাজের স্মৃতি ও পরিচয়ের ধারক। এ প্রতিষ্ঠান যদি আধুনিকতার ভিড়ে পুরোপুরি আবেদন হারিয়ে ফেলবে সেটি কখনই কাম্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনতিবিলম্বে যদি জাতীয় জাদুঘর আধুনিকায়নের উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে একদিন এর বিপুল সংগ্রহ আর অক্ষত থাকবে না। পাশাপাশি জনগণকেও আকৃষ্ট করতে পারবে না।

জাদুঘর হতে হবে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জাদুঘরের কার্যক্রম আর নিছক নিদর্শন প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। এটাকে আধুনিক রূপ দিতে হবে। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানতে চায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে—দেখতে চায়, শুনতে চায়, অনুভব করতে চায়। সে বাস্তবতায় ডিজিটাল গাইড, ইন্টার‌্যাকটিভ ডিসপ্লে, ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি, অনলাইন আর্কাইভ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া বহুভাষিক তথ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় জাদুঘরকে সর্বজনীন করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে বিদেশী পর্যটকরাও আকৃষ্ট হবেন। তা না হলে জাদুঘর ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। আর এটি ঘটলে দেশের ইতিহাস বিলীন হতেও বেশি সময় লাগবে না। কেবল তা-ই নয়, ইতিহাস বিকৃতির মতো ঘটনাও বেড়ে যাবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ইতিহাস নিয়ে দেশে এরই মধ্যে বিভাজন দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি আরো নাজুক হতে পারে যদি জাতীয় জাদুঘরকেই সংরক্ষণ করা না যায়।