ড. ফরিদ তালুকদার, শিক্ষক ও গবেষক। যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার ম্যাকনিজ স্টেট ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেসের ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক সাউথ এশিয়া ইনিশিয়েটিভের চেয়ারম্যান। করোনা মহামারী-পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের চাকরিবাজার, জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয় নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

করোনা মহামারী কর্মক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন এনেছে; হোম অফিস, হাইব্রিড অফিস, কম কর্মঘণ্টা—এ আলাপগুলো এসেছে। কর্মক্ষেত্রে কভিডের দীর্ঘমেয়াদি কী কী প্রভাব আপনারা দেখছেন?

কভিড যখন শুরু হয় তখন তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ব খুব একটা বুঝে উঠতে পারেনি যে কভিডকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন করপোরেট কোম্পানি ও তাদের মালিকরাও বুঝতে পারেনি যে তাদের কর্মীদের সঙ্গে কেমন আচরণ হওয়া উচিত। এটি বুঝে উঠতে উঠতে অনেক সময় চলে গেছে। উন্নত বিশ্ব কিছুটা বুঝলেও উন্নয়নশীল বিশ্ব বুঝতে সময় নিয়েছে অনেক। উন্নত বিশ্ব বিষয়টাকে আগে বোঝায় এবং প্রযুক্তিতে উন্নত হওয়ায় তারা তাদের কর্মচারীদের বাসায় বসে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং তারা একটি হাইব্রিড মডেল তৈরি করেছে—কিছুদিন বাসায় ও কিছুদিন অফিসে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে এর কোনোটাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের কর্মচারীদের অফিসে ও কারখানায় এসেই কাজ করতে হয়েছে, আর যারা আসতে পারেনি তাদের ছাঁটাই করতে হয়েছে। কভিড মহামারীর প্রভাব শেষ হলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই ধকল পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। তখন আমরা কোয়াইট ফায়ারিং বা গোপনে ছাঁটাই করা নিয়ে গবেষণা করেছি। পাশাপাশি ‘‌কোয়াইট কুইটিং’ নিয়েও কাজ করেছি। ‌

কোয়াইট কুইটিং বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

কোয়াইট কুইটিং হচ্ছে একজন কর্মীর চাকরি বিবরণীতে যতটুকু লেখা থাকে, সে তার বাইরে কাজ করে না। অর্থাৎ যখন ৫টা বাজবে তখন সে তার কাজ বন্ধ করে দেবে। নির্ধারিত কাজের বাইরে কোনো সহকর্মী সহায়তা চাইলেও সে কাজ করবে না। কোয়াইট ফায়ারিং হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তার কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে তেমন ভূমিকা রাখে না বা রাখতে চায় না। তারা মনে করে, কর্মীরা আমার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বেশি দিন থাকবে না। ফলে বিভিন্ন দায়িত্ব থেকে কর্মীদের দূরে রাখা হয়। তখন কর্মীদের মধ্যে একটা জব ট্রমা তৈরি হয়।

আমরা একটি গবেষণা করেছিলাম সেটি হলো ‘‌ডেথ ফোবিয়া’। সেখানে দেখা যায়, কভিড চলাকালীন অনেক চাকরিজীবী মনে করত তারা মারা যাবে! এ মৃত্যুভয় তাদের উৎপাদনক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়,৷ তারা কাজ করতে চায় না, অফিসে যেতে চায় না। গত কয়েক বছর এমন একটি জটিল অবস্থায় আমরা ছিলাম। সেটা আমরা কাটিয়ে উঠেছি। কারণ কভিডের প্রভাব তেমন একটা নেই। এখন আবার শোনা যাচ্ছে কভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্ট আছে, তবে আগের মতো নয়। এ সময়ে গরিব দেশ বাদে যারা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে, যাদের প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটে সহজলভ্যতা আছে তারা মোটামুটি একটা কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। যেখানে কেউ চাইলে বাসায় বসে কাজ করতে পারবে, কেউ চাইলে হাইব্রিড মডেলও অনুসরণ করতে পারবে। এখানে বলে রাখা দরকার, বাসায় বসে কাজ করার ফলে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী-সন্তানরা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে বাসায় থাকার ফলে পারিবারিক কলহ তৈরি হয়, এতে কাজে মনোযোগ দেয়া কঠিন হয়। যার কারণে কেউ কেউ আবার অফিসে যেতে চায়। কিন্তু অফিস বন্ধ। উন্নত বিশ্বে, যেমন ইউরোপের দেশ ও আমেরিকায় বাসায় বসে কাজের কাঠামোটা এখনো আছে। বাংলাদেশে কেমন আছে জানি না, হয়তো তেমন নেই। কারণ অনেক কর্মীর ইন্টারনেট অ্যাকসেস ও কম্পিউটার সুবিধা নেই, বাসায় বসে কাজ করার দক্ষতাও নেই। যদি এসব সমস্যা সমাধান করা যায় তবে বাসায় বসে কাজের কাঠামো ও হাইব্রিড কাঠামো দুটোই কার্যকর হবে। যখন করোনা মহামারী বা যেকোনো মহামারীতে প্রতিষ্ঠানের কাজ চালিয়ে নেয়া সহজ হয়। তখন কোম্পানি ও কর্মী কেউই সংকটে পড়বে না।

আপনাদের নিবন্ধে দেখলাম, ২০২১ সালের এপ্রিল-সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ মিলিয়ন কর্মী চাকরি ছেড়েছিল।৷ মাইক্রোসফটের ৩০ হাজার কর্মীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ কর্মী তাদের চাকরি নিয়ে অসন্তুষ্ট। এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি কেমন? সেখানকার বড় কোম্পানিগুলো মেধাবীদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে?

কথা সত্য, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক মানুষ চাকরি ছেড়েছে কভিডের সময়, যেটাকে বলা হয় ‘গ্রেট রেজিগনেশন’। কর্মীদের মধ্যে মৃত্যুভয় কাজ করত। কর্মীদের জব সন্তুষ্টি কম ছিল। আপনারা জানেন কভিডে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে। তাদের সমাজ কাঠামো হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, তারা আমাদের মতো সামষ্টিক জীবনে অভ্যস্ত নয়। ফলে তারা যখন মৃত্যু হুমকি বা অনিশ্চয়তা দেখে তখন তারা ভয় পায়। তখন তারা অস্থিতিশীল থাকে। তারা এ ভয় থেকে চাকরি ছেড়ে দেয়। আবার চাকরি ছেড়ে কিন্তু তারা বসে থাকে না। অন্য একটা জোগাড়ও করে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ আছে এবং চাকরি পাওয়াও সহজ। ধরুন, বাংলাদেশে কোনো একজন একটি ভালো পদে চাকরি করছেন, যদি তিনি চান সেটা ছেড়ে অন্য একটা ভালো চাকরি জোগাড় করবেন, এটা বাংলাদেশে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কেউ যদি মাইক্রোসফটের চাকরি ছেড়ে দেয়, তখন সে এমন এমন কাজ করতে পারবে, যা করে সে পরিবার চালাতে পারবে। এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রে যখন সে দেখে তার সঙ্গে কোম্পানির হিসাব মিলছে না বা সে স্বাধীনতা পাচ্ছে না এবং একই সঙ্গে তার অন্য চাকরির ব্যবস্থা করা সহজ, ফলে তারা খুব সহজে চাকরি ছাড়তে পারে। সে যদি কোনো কফি শপেও ৮ ঘণ্টা কাজ করে তাহলেও সে পরিবার নিয়ে মোটামুটি ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। এ সুযোগ বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে নেই। এজন্যই অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি ছাড়ার অনুপাত বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যাদের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত বিশ্বের কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের যারা কাজ করতে আগ্রহী তারা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রযুক্তি খাতের বিশেষ করে ইন্টারনেট, ফেসবুক ও ইউটিউবের ভূমিকা সবেচেয়ে বেশি। এ খাত থেকে তারা প্রচুর রাজস্ব আয় করে। উৎপাদন খাত যেমন পোশাক, লেদার ও মৎস্যের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পপণ্য তারা বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে। যদি তারা পোশাক বা লেদার জাতীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন করে তাহলে সেই উৎপাদিত পোশাক বা লেদার পণ্য কেউ কিনতে পারবে না, কারুর দাম হবে অনেক। শ্রম মজুরি বেশি হওয়ায় পণ্যের দামও অনেক বেড়ে যাবে। এজন্যই এ ধরনের পণ্য উৎপাদন না করে তারা আউটসোর্স করে। যেহেতু তারা অন্য দেশে সাশ্রয়ে উৎপাদনের জন্য আউটসোর্স করে বা পণ্য আমদানি করে—তা আমাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। আমাদের এখানে বিশাল আকারের সস্তা শ্রমবাজার রয়েছে। এ সস্তা শ্রমবাজারের ফলে আমাদের তৈরি পোশাক, লেদার ও পাট শিল্প-কারখানার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর শ্রমঘন শিল্প নেই বলে তারা সবসময় এ খাতগুলোয় আমাদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। এখন কথা হলো, এ বাজারটা একা আমাদের দখলে নেই, এতে অনেক দেশ আছে, অনেক বিক্রেতা আছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেই বাজার কীভাবে ধরে রাখব সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য আমাদের কৌশল সাজাতে হবে কীভাবে এ বাজার আমাদের দখলে থাকবে বা এ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমরা ভালো করতে পারি

আমরা দেখছি, জেন-জি ও মিলেনিয়ালস—তারাই এ সময়ের উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, আবার তারাই শ্রমশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জেন-জি ও মিলেনিয়ালরা তাদের কর্মক্ষেত্রে কী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন?

এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশ্বের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা জানি জেনারেশন-এক্স, ওয়াই, জির পর আরেকটি জেনারেশন আসছে—জেনারেশন আলফা। জেন-এক্স ও জেন-ওয়াইয়ের মধ্যে আমরা জেন-ওয়াইয়ের মধ্যে পড়ি। আমাদের যে আগের প্রজন্ম এবং জেন-এক্সের আগের প্রজন্ম যাদেরকে বেবি বোমার বলে, সেই প্রজন্ম ও জেনারেশন এক্স তারা পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ দেখেছে। পৃথিবী প্রযুক্তিতে তখন এত উন্নত ছিল না। পৃথিবীতে এখন যত অর্থসম্পদ আছে অতীতে এমন ছিল না। জেন-জি যাদেরকে বাংলাদেশে জেন-জেড বলা হয়, তারা এমন পিতা-মাতা পেয়েছে যারা আর্থিকভাবে সংগতিপূর্ণ। তাদের অর্থসম্পদ থাকার ফলে জেন-জি অর্থসম্পদ নিয়ে এত চিন্তিত নয়। তারা চিন্তা করে আরাম-আয়েস এবং স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন নিয়ে। যেমন আমাদের আগের প্রজন্ম, মানে আমাদের বাবা-চাচারা। তারা সারা দিনরাত মাঠে-ঘাটে কাজ করতে পারতেন এবং করতেন। আমাদের প্রজন্ম অনেক বেকার থাকার পরও মাঠে-খেতে-খামারে কাজ করার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ হলো, জেন-জির একটা নিশ্চিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে। তাদের বাবা-মা তাদের জন্য বাড়িঘর করে রেখেছেন অথবা ব্যাংকে জমানো টাকা আছে। যে টাকা দিয়ে তারা মোটামুটি চলতে পারে। এজন্যই জেন-জি অভ্যাসবশত আরাম-আয়েস চায়, ফ্লেক্সিবিলিটি চায়। তারা চায়, তারা যে অফিসে চাকরি করবে সে অফিসের ক্যাফেটেরিয়া অনেক সাজানো থাকবে, অফিস সুন্দর হবে, টপ ফ্লোরে সুইমিংপুল থাকলে বেশ। এজন্য যদি ২০ হাজার টাকা কম বেতনও দেয় সে সেখানে চাকরি করবে। কারণ সে দেখাতে চায় তার কোম্পানি অনেক সুন্দর, অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে, তার অনেক আরাম-আয়েস আছে। সে চায় এমন অফিসে চাকরি করতে যেখান থেকে সে বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই বের হয়ে কক্সবাজার চলে যেতে পারে। এজন্যই জেন-জির অভ্যাস জেন-এক্স ও জেন-ওয়াই থেকে ভিন্ন। জেন-জি বেশি আরাম-আয়েস চায় বলেই আমরা দেখি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাকরি ছাড়ার প্রবণতা খুব বেশি। একটু এদিক-ওদিক হলেই তারা চাকরি ছেড়ে দেয়। জেন-জিকে ধরে রাখা, তাদেরকে সন্তুষ্ট করা, তারা যা চায় তা নিশ্চিত করা কোম্পানির জন্য চ্যালেঞ্জ। জেন-জি চাকরি ছাড়তে যতটা চিন্তামুক্ত থাকে ততটা জেন-এক্স ও জেন-ওয়াই চিন্তামুক্ত নন।

চাকরিরবাজারে কর্মী ধরে রাখতে কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো?

বাংলাদেশে সস্তা শ্রম পাওয়া যায় এবং এখানে বেকারত্বের হার বেশি। ফলে এখানকার দু-একটা বড় কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানিই কর্মী ধরে রাখা নিয়ে তেমন চিন্তা বা গবেষণা করে না। আমাদের সস্তা শ্রমবাজার আছে ও অনেক লোকবল আছে—এটাকে কোম্পানিগুলো কীভাবে দেখে? সেটা একটা বড় গবেষণার বিষয়। কোম্পানিগুলো দেখে ‘ভাত ছিটালে আমার কাকের অভাব হবে না’ এভাবে। কিন্তু এ কর্মীদের ধরে রেখে দীর্ঘমেয়াদে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়িয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করে ধরে রাখার মতো কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা সাধারণত কোনো কোম্পানি নেয় না। কারণ তারা জানে, আজকে যদি ২০ জন কর্মী চলে যায় তাহলে কালকে ৩০ জনকে এর চেয়ে কম বেতনে চাকরিতে নেয়া সম্ভব! আমি যখন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন এমন প্রোপাগান্ডা ছিল। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, বিশেষ করে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষরা মনে করতেন, সহকারি বা সহযোগী অধ্যাপকদের বেশি বেতন দিয়ে রেখে লাভ নেই, কেবল ক্লাস নিতে পারলেই হবে। এজন্যই তারা বেশি লেকচারার নিতে চান। কারণ তার বেতন কম। তাকে দিয়ে বেশি কাজ করানো যায়! এ প্রবণতা আমাদের শিল্প-কলকারখানায়ও আছে। এর মধ্যেও কিছু কোম্পানি আছে যারা কর্মীকে ধরে রাখতে চায়। তারা মনে করে, কর্মীরা আমাদের সম্পদ। তাদের ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ চিকিৎসা যাতায়াতসহ নানা সুবিধা দেয়। বার্ষিক ভাতা দিয়ে থাকে। যদিও এগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে জুতসই নয়।

কর্মীদের জন্য কাজের সন্তুষ্টি (জব স্যাটিসফেকশন) নিশ্চিত করা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য মেধাবী কর্মীদের ধরে রাখার (ট্যালেন্ট রিটেনশন) চ্যালেঞ্জে কীভাবে ভারসাম্য নিশ্চিত করা যায়? নারী-পুরুষের মধ্যে কাজের সন্তুষ্টি (জব স্যাটিসফেকশন) নিয়ে কোনো তারতম্য আছে কিনা?

আমাদের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরিরতদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, নারী কর্মীদের চাকরিতে সন্তুষ্টি পুরুষদের তুলনায় বেশি। এটার অনেক কারণ থাকতে পারে। এরমধ্যে একটা হলো, নারীদের চাকরির ক্ষেত্রে পরিবারের প্রত্যাশা কম, তার আয় দিয়ে পরিবার চালাতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সে এমন একটা চাকরি করতে চায় যেটা দিয়ে সে সুন্দর একটা জীবন পরিচালনা যেন করতে পারে। সে ভালো পোশাক কিনতে পারবে, পরিবারে অল্প সহায়তা করতে পারবে, বাবা-মাকে মাস শেষে কিছু টাকা দেবে। এই হলো তার ইচ্ছা। সেক্ষেত্রে একজন পুরুষের কাছে পরিবারের প্রত্যাশা অনেক বেশি, ফলে তার চাকরি সন্তুষ্টিও খুব কম হয়। সে প্রত্যাশা অনুযায়ী সন্তুষ্টিমূলক চাকরিও কম পায়। ফলে তারা একটু ভালো অফার পেলে চাকরি পরিবর্তন করে। কোম্পানি পুরুষ কর্মীদের ধরে রাখতে পারে কম। কিন্তু নারী কর্মীদের ধরে রাখতে পারে বেশি সময়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। নারীরা সচরাচর তার কর্মক্ষেত্রের নিকটে থাকে। দূরে থেকে তার জন্য চাকরি চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর, ফলে সে বাসা পরিবর্তন করে অফিসের পাশে নেয়,৷ কিন্তু আমরা দেখেছি অনেক পুরুষ কর্মী পুরান ঢাকা থেকে উত্তরায় গিয়ে চাকরি করে। তার পক্ষে বাসা পরিবর্তন করা সম্ভব হয় নয় নানা কারণে। এই যে যোগাযোগজনিত জটিলতা, এটার জন্য তার চাকরিতে প্রভাব পড়ে এবং সে অসন্তুষ্ট থাকে। যদি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতো অথবা কোম্পানি ট্রান্সপোর্টেশন সুবিধা দিত তাহলে পুরুষ কর্মীদের জব সন্তুষ্টি বাড়ত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। আমরা শিগগিরই সেখান থেকে বেরোতে পারব এমন সম্ভাবনা নেই বলা চলে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো অনেক দেশ বাণিজ্যযুদ্ধের সুবিধা নিয়েছে, আমরা কেন সুবিধা নিতে পারছি না?

বাণিজ্যযুদ্ধ আমরা অনেক বছর ধরে দেখছি এবং এটা চলবে। আমাদের এটা ধরেই কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। আমাদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ানো দরকার। আঞ্চলিক সংযোগটা কী? আমাদের সার্ক আছে তেমনি সাফটা চুক্তিও আছে, এপিটিএ (দি এশিয়া-প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্ট) চুক্তিও আছে। আমরা দেখছি, এ চুক্তিগুলো থেকে খুব একটা সুবিধা পাচ্ছি না। অন্যদিকে আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর মধ্যে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে। সেটা কখনো কখনো তাদের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ২০ শতাংশকেও ছাড়িয়ে যায়। এই যে আঞ্চলিক সংযোগ ও সংঘ আছে—আমাদের সেগুলোর সঙ্গে জড়িত হতে হবে। অথবা নতুন কোনো সংঘ তৈরি করা যায় কিনা সেদিকে তাকাতে হবে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, আজারবাইজান, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান—এশিয়ার এ রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধপ্রবণ নয়। তাদের সঙ্গে যদি সংযোগ বাড়ানো যায় তাহলে ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি কমে গেলেও সমস্যা নেই। তখন এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমরা রফতানি করে একটা ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারব। কিন্তু এটার জন্য আমাদের সংযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে যাতে আমাদের আমদানি কম করতে হয়। আমদানি কম হলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে যা আমাদের উন্নয়নে কাজে লাগবে। কীভাবে খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ানো যায়, সেটাতে গুরুত্ব দিতেই হবে। কেননা বিশ্ব কখনো আর শান্ত হবে না। এটা বলতে পারব না যে এটাই শেষ যুদ্ধ, আগামীকালই শান্তি ফিরবে। এজন্য খাদ্যনিরাপত্তা লাগবেই, আমাদের যেন বলতে না হয় ওই যুদ্ধের জন্য খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে! আমাদের আঞ্চলিক যোগাযোগ আরো প্রসারিত করতে হবে, যদি আমরা বিশ্বে ভালোভাবে টিকে থাকতে চাই।