নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহার ও পরিষ্কার পানি পান—এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ জীবন ও মানবিক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব অভ্যাস শুধু রোগ প্রতিরোধই করে না, বরং একটি সচেতন, উৎপাদনশীল ও দায়িত্বশীল জাতি গঠনে কাজ করে। অথচ এসব বিষয় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। আর এর প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’ শীর্ষক জরিপে। দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন—এ তিন মৌলিক সেবা একসঙ্গে পাচ্ছে না। জরিপে দেখা যায়, দেশের মাত্র ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি—এ তিন সুবিধা একসঙ্গে রয়েছে। অর্থাৎ বাকি ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসব মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সংকট সবচেয়ে বেশি। সেখানে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী ওয়াশ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যেখানে শহুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ হার ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এ তথ্যগুলো মূলত নির্দেশ করছে যে দেশে স্বাস্থ্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও গত পাঁচ দশকে উল্লেখযোগ্য হারে শিক্ষা অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু তাতে প্রাধান্য পায়নি এসব সুবিধা। এমনকি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৌচাগার থেকে বেরিয়ে হাত ধোয়ার মতো ব্যবস্থাও নেই।

শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধ এবং একটি সচেতন জাতি গঠনের জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিনের বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পানি হচ্ছে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু পানি যদি খাওয়ার উপযোগী, জীবাণুমুক্ত বা নিরাপদ না হয় তাহলে এর মাধ্যমে জীবননাশ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। দূষিত ও ময়লা হলে এর মাধ্যমে পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড, জন্ডিস, উদরাময় ইত্যাদি ছড়িয়ে যায় এবং চর্মরোগও হয়। অন্যদিকে স্যানিটেশন বা পয়ঃপ্রণালি, পয়োনিষ্কাশন পদ্ধতি, ল্যাট্রিন ইত্যাদি যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকে সেখান থেকেও নানা ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহার ও পরিষ্কার পানি সুবিধা নিশ্চিত করা বেশ কয়েকটি কারণে জরুরি। উদাহরণ হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি লক্ষ্যের কথা বলা যায়। এসডিজি ৪-এ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির অভাবে শিশুদের নানা রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে। ডায়রিয়া, টাইফয়েড রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। এতে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতি বাড়ে। ফলে শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

আবার এসডিজি ৩-এ সবার জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের জন্যই সেটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর শৈশব ছাড়া বাকি জীবনে কতটা সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দিহান হতে হয়। এমনকি এসডিজি ৬-এ বিশুদ্ধ পানি ও সবার জন্য স্যানিটেশনের কথা উল্লেখ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এগুলো নিশ্চিত করা গেলে এসব লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হতো বলেই প্রতীয়মান হয়।

বিভাগভিত্তিক তথ্যও বৈষম্য তুলে ধরছে। পানির মৌলিক সরবরাহ ও স্যানিটেশনে বরিশাল বিভাগ সবচেয়ে পিছিয়ে, আর তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধার ক্ষেত্রেও ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ পিছিয়ে থাকা দুঃখজনক। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে ওয়াশ ব্যবস্থাপনায় কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশ সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিশোরী শিক্ষার্থীরা। পিরিয়ড চলাকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার না থাকায় অনেক মেয়েই স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। এটিও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। নারী শিক্ষার অগ্রগতির কথা বললেও বাস্তবে এ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে না পারা এক ধরনের নীতিগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মৌলিক সুবিধা নেই—এ কথা বহুদিন ধরে বলছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশন ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা নিয়ে অনেক আগে থেকে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা সেটিকে গুরুত্ব দেননি। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী শ্রীলংকা, ভুটানেও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অনেক উন্নত। অথচ আমরা তাদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি, বিনিয়োগের অভাব ও সঠিক পরিকল্পনা না থাকা। কাজেই এখানে প্রয়োজন তথ্য-উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য বিনিয়োগ বাড়ানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষার পরিবেশ পাওয়ার, যেখানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে। জাতিসংঘও এর ওপর জোর দিয়ে বলেছে, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ ছাড়া কার্যকর শিক্ষা সম্ভব নয়। এসব সুবিধা না থাকলে শিশুরা বেশি অসুস্থ হয়, নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

শিক্ষা খাতে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভবন ও শ্রেণীকক্ষ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু স্যানিটেশন সুবিধা, বিশুদ্ধ পানির উৎস নিশ্চিত—এগুলোও যে অবকাঠামোগত সুবিধার অন্তর্গত সেটি পরিকল্পনায় থাকছে না। অনেক স্কুল ভবনে শৌচাগার থাকলেও তা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য লোকবল নিয়োজন করা হয় না। কিংবা তালাবদ্ধ থাকে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক সবার সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। আর সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। যারা এর বাস্তবায়নে উদাসীনতার পরিচয় দেবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্যের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের নাম নয়। সুস্থ দেহ ও মন ছাড়া কার্যকর শিক্ষা সম্ভব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের অসুস্থতা বাড়ে, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর। সরকারের উচিত ওয়াশ ব্যবস্থাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রেণীকক্ষ ও ভবনের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, পর্যাপ্ত টয়লেট ও কার্যকর হাইজিন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও জরুরি। একটি সভ্য ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র গড়তে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশ সংকট দূর করা অপরিহার্য। অবহেলা নয়, এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোভিত্তিক স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।