জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে পৃথক্‌করণের অধ্যাদেশ জারি হয় গত মাসের ১২ তারিখ। অধ্যাদেশ জারির পরদিন থেকেই এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে পদ-পদবি ঘিরে আন্দোলন শুরু করেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। উপরন্তু এ পরিষদের পক্ষ থেকে ২৭ জুনের মধ্যে সংস্থাটির চেয়ারম্যানকে অপসারণের আলটিমেটামও দেয়া হয়। তাদের এ দাবি না মানায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত শনিবার থেকে কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে শুরু হয় ‘লাগাতার কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। ফলে সারা দেশের কাস্টম হাউজ ও শুল্ক স্টেশনগুলোয় আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। স্থবিরতা দেখা দেয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে, বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক, প্লাস্টিক, সিরামিক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ওষুধসহ দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত। গতকালও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিজেদের দাবিতে অনড় এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গতকালও কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিতে আন্দোলনকারী ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।

সম্প্রতি চলমান সংকট সমাধানের জন্য একটি বৈঠক আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও সেই বৈঠক থেকে কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আসেনি। ২ জুলাই আরেকটি সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে চলমান পরিস্থিতিতে গতকাল এক বিবৃতি দিয়েছে সরকার। বিবৃতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সব শ্রেণীর চাকরিকে অত্যাবশ্যকীয় সেবা ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি সংস্থাটির আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে, কাজে যোগ না দিলে দেশের জনগণ ও অর্থনীতির সুরক্ষায় সরকার কঠোর হবে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও এনবিআরের আন্দোলনরত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধানের পথে হাঁটা জরুরি এবং সেটি অতিসত্বর হতে হবে। এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, এনবিআরের অচলাবস্থায় শুধু তৈরি পোশাক শিল্পে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ খাতের অনেক কারখানা দেউলিয়াও হয়ে যেতে পারে।

দেশের মোট আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য খালাস ও বিল অব এন্ট্রি দাখিল বন্ধ, এমনকি রফতানি পণ্যের কনটেইনার বন্দরেও প্রবেশ করতে পারছে না। এ অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বাজার হারানোর আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের আন্তরিক ও এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। নয়তো দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি হবে। এমনিতেও দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। রাজস্ব আহরণসহ রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অপ্রতুল আয় হয় সরকারের, যার প্রভাব পড়ে বাজেট বাস্তবায়নে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ বেড়েই চলেছে। রাজস্ব পরিস্থিতির এমন দশায় যদি আন্দোলনের কারণে এনবিআরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়, তা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেতই বটে। তাই দাবি যা-ই হোক সেটার যৌক্তিকতা বা পূরণ হওয়া নিয়ে সংলাপে বসা উচিত, অর্থনীতির স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন কাজ করা থেকে আন্দোলনরত কর্মীদের সরে আসা উচিত। সরকারকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে বসে এর সমাধানের পথে হাঁটতে হবে।

বর্তমানে এনবিআরে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে সরকারের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। এনবিআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ দেড় মাস ধরে আন্দোলন চলমান। সরকারের শুরুতেই বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে তৎপর হওয়া প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে এনবিআরের কলমবিরতির কারণে রাজস্ব আহরণসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা সরকারের অদূরদর্শিতাকে নির্দেশ করছে। সরকার যদি শুরুতেই আন্তরিক সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানে আগ্রহ দেখাত, তবে হয়তো আজকের এ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্রিয়তা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য বাণিজ্য হয়। এ জটিল পরিস্থিতিতে সরকার ও আন্দোলনকারী—দুই পক্ষেরই দায় এড়ানোর সুযোগ কম। তাই দুই পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। আলোচনার টেবিলে বসা প্রয়োজন।

এনবিআরের আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কলমবিরতি কর্মসূচির কারণে এরই মধ্যে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ-সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে আমদানীকৃত কাঁচামাল খালাস করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া তারা আরো বলেন, বন্দর, বিমানবন্দরে আমদানি ও রফতানিযোগ্য অনেক পণ্য রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট এ জটিলতায় এয়ার শিপমেন্ট ও রফতানি আদেশ বাতিল করার হুমকিও দিয়েছেন অনেক ক্রেতা।

এ অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল ও ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ প্রদানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। মনে রাখা প্রয়োজন, গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল রফতানি বাণিজ্যে। এভাবে এক বছরের ব্যবধানে যদি আবারো আমদানি-রফতানি বাণিজ্য অব্যাহতভাবে ব্যাহত হয় তাতে সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। তাছাড়া এনবিআর সংস্কারে ঘিরে চলমান আন্দোলনের বাইরেও বর্তমানে দেশের আমদানি-রফতানি শিল্পে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছেন যা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, সংশ্লিষ্টরা। এনবিআরে জটিলতার কারণে সে চেষ্টা আলোর মুখ দেখতে পারবে কিনা তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে। অথচ রফতানি আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত। রিজার্ভ পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা এ আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। আর আমদানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে থাকলে তাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে, যা দেশীয় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে চলমান আন্দোলনের আশু সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে। সংকট উত্তরণের জন্য সরকার ও আন্দোলনরতদের দ্রুত সমঝোতার পথে আসার বিকল্প নেই।