বিশ্ব অর্থনীতির মন্থরগতি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের মুখে অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সীমিত করার কথা ভাবতে পারে। এটি হবে একটি মারাত্মক ভুল। কারণ দারিদ্র্য মোকাবেলা করা শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংঘাত প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।

সাম্প্রতিক গবেষণা দারিদ্র্য হ্রাসের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে সমর্থন করে, যেখানে দেখা যায় যে দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ কমালে বার্ষিক মাথাপিছু প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কঙ্গো ও প্যারাগুয়ের মতো দেশগুলোয় এর অর্থ দাঁড়াতে পারে বার্ষিক মাথাপিছু প্রবৃদ্ধিতে ২৫ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি।

আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে গুরুতর বাজেট সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারগুলোকে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করতে হবে:

১. জ্বালানি: সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সরবরাহ বৃদ্ধি শিল্প ও কৃষি খাতের জন্য অপরিহার্য। এটি দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় টেকসই প্রবৃদ্ধিকে চালিত করবে। এক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হলো, বিশ্বব্যাংক ও আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এএফডিবি) একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ ‘মিশন ৩০০’, যার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ মিলিয়ন আফ্রিকানকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

২. মানবসম্পদে বিনিয়োগ: গবেষণা বারবার দেখিয়েছে যে শৈশবকালীন কর্মসূচি, মানসম্মত শিক্ষা এবং সহজে প্রাপ্তব্য স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ উচ্চ প্রতিদান নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, জ্যামাইকায় শৈশবে গৃহীত পদক্ষেপ মধ্যজীবনের আয় ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। অনুরূপভাবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির একটি গবেষণা দেখায় যে স্কুল পুষ্টি কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলারের বিনিময়ে অন্য খাতে ৯ ডলার পর্যন্ত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। কেনিয়ার ‘হোম-গ্রোন স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম’ শিক্ষা, পুষ্টি এবং স্থানীয় কৃষিকে সংযুক্ত করে স্কুল উপস্থিতি বাড়িয়েছে, স্বাস্থ্য ফলাফল উন্নত করেছে এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করেছে।

৩. বড় অবকাঠামো: বৃহৎ আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক একীকরণকে ত্বরান্বিত করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দারিদ্র্যকে দ্রুত হ্রাস করে। পশ্চিম আফ্রিকার পাঁচটি দেশকে সংযুক্তকারী ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের ‘আবিদজান-লাগোস সুপার-করিডোর’ ২০৩০ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার মোট বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশের দায়িত্ব নেবে। অনুরূপভাবে এএফডিবির অর্থায়নে নির্মিত ৫৭৬ মিলিয়ন ডলারের ‘নাকালা রোড করিডোর’ এরই মধ্যে জাম্বিয়া, মালাউই ও মোজাম্বিকের ২০ লক্ষাধিক মানুষের জন্য উপকারী প্রমাণ হয়েছে।

নতুন অর্থায়নের কৌশল: এ কৌশলগুলো সাশ্রয়ী হলেও বিশ্বজুড়ে সরকারি বাজেট যখন চাপে রয়েছে, তখন এদের বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য বর্ধিত অর্থায়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘বিশেষ উত্তোলন অধিকার’ (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস-এসডিআর)। এএফডিবি এবং ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) একটি হাইব্রিড ক্যাপিটাল ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করেছে, যা এ এসডিআরের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।

২০২৪ সালে আইএমএফ দেশগুলোকে স্বেচ্ছায় তাদের বিদ্যমান এসডিআর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এএফডিবি ও আইডিবির মাধ্যমে পুনরায় বরাদ্দ করার অনুমতি দিয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর ট্রিপল-এ ক্রেডিট রেটিং এবং প্রমাণিত সাফল্যের রেকর্ড রয়েছে, যা তাদেরকে অতিরিক্ত সম্পদকে সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম করে তোলে। এ উদ্যোগের প্রভাব হতে পারে যুগান্তকারী, কারণ আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এএফডিবি ও আইডিবিতে প্রাপ্ত এসডিআরের প্রতিটি ডলার সমমানের অর্থকে তিন থেকে আট গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এভাবে এসডিআর কাজে লাগিয়ে নিম্ন সুদের ঋণ, গ্যারান্টি ও মিশ্র অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা অবকাঠামো, গ্রিনটেক ও কৃষি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করবে।

লাতিন আমেরিকায়, আইডিবি অনুমান করে যে ১ বিলিয়ন ডলারের এসডিআর ব্যবহার করে ৭-৮ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিল তৈরি করা সম্ভব। এ তহবিল ১০ মিলিয়ন শিশুর জন্য স্কুলের খাবার, ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন নারী ও শিশুর জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং এক বছরের জন্য ৪ মিলিয়ন পরিবারের জন্য সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টাকে গতি দেবে।

আফ্রিকার সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা: অল্প পরিমাণ এসডিআরের পুনর্বণ্টনও বিশাল সুবিধা দিতে পারে, বিশেষ করে আফ্রিকায়। মাত্র ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এসডিআর এএফডিবিতে হস্তান্তর করলে তা ১০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন অর্থায়ন তৈরি করতে পারে। এএফডিবির হিসাব অনুযায়ী, এ অর্থ কৃষি খাতে বিনিয়োগ করা হলে ১৬ মিলিয়ন কৃষকের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ হবে, খাদ্য উৎপাদন ৪০ মিলিয়ন টন বাড়বে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আট কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে।

এর অতিরিক্ত ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আঞ্চলিক অবকাঠামোতে, যেমন ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘লোবিটো করিডোর’ প্রকল্পে, ব্যবহার করা যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমর্থিত প্রকল্পটি অ্যাঙ্গোলাকে জাম্বিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করবে, যা আটলান্টিক থেকে এশিয়ার শিপিং সময় অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দেবে এবং কপার ও কোবাল্ট রফতানি থেকে বিলিয়ন ডলারের আয় বৃদ্ধি করবে।

যথেষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে এসডিআর বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এএফডিবি এবং আইডিবির উদ্ভাবনী মডেলের মাধ্যমে দেশগুলো তাদের এসডিআরের একটি অংশ ঋণ দিয়ে যুগান্তকারী বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক রিজার্ভের মূল্য সংরক্ষণ এবং অংশগ্রহণকারী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য উচ্চতর প্রতিদান নিশ্চিত করতে পারে।

দারিদ্র্য দূরীকরণের লড়াইকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা উচিত। সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারে, জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে এবং সবার জন্য একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

আকিনুমি এ. আদেসিনা: আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের (২০১৫-২৫) সাবেক প্রেসিডেন্ট

ইলান গোল্ডফাজন: ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট