২০২২ সালের আগস্টে দেশে ডিজেলের দাম ৪০-৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়। ফলে কয়েক দিনের জন্য পরিবহন খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। কিছু পেট্রল পাম্প বন্ধ ছিল। কিছু ট্রাক চলেনি। এতে সাময়িকভাবে মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ইত্যাদির দাম বেড়ে যায়। এ সময় ডিম, মুরগির দাম বাড়ার কারণ তদন্ত করার জন্য জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে একজন কর্মকর্তাকে পাঠানো হয় আশুলিয়ায় কাজী ফার্মসে। সেখানে অনেকক্ষণ ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়। অনুসন্ধানে আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায়নি। পরদিন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে কাজী ফার্মস কর্তৃপক্ষকে ডাকা হয়। সেখানে তৎকালীন ডিজি সাহেব ঘোষণা করেন যে পোলট্রিতে একটি সিন্ডিকেট আছে এবং এ সিন্ডিকেটই দাম নিয়ন্ত্রণ করে। ঘোষণাটা শুনে আমরা খুব আশ্চর্য হই। কারণ আমরা প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ খাতে কাজ করে যাচ্ছি। সিন্ডিকেটের কথা কখনো বলাও হয়নি এবং এর অস্তিত্বও আমরা কখনো দেখিনি। আমরা অত্যন্ত অবাক হই এবং ধারণা ছিল, শিগগিরই হয়তো প্রকৃত সত্য তুলে ধরে সেই বক্তব্য রিভাইজ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে পোলট্রি খাতের সবকিছু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে—এমন কথা সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হলো এবং এমনভাবে প্রচার করা হলো যে সারা দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি সেটি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন।

কিন্তু পোলট্রিতে আসলে কোনো সিন্ডিকেট নেই। যদিও এর বিপরীত ধারণাটাই সবার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে আছে। তবু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে এ খাতে কোনো সিন্ডিকেট নেই।

সিন্ডিকেটের সঙ্গে দামের প্রসঙ্গও চলে আসে। সে বিষয়ে কিছু বলা যাক। ২০২৪-এর মার্চে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে ডিম ও ফিড কী দামে বিক্রি হবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তাদের হিসাবে, একটা ডিমের উৎপাদন খরচ ৮ টাকা ৮১ পয়সা। অর্থাৎ আমরা সেই ডিম ৯ টাকা ৫ পয়সায় বিক্রি করতে পারব। একই সময় আবার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরেও ডিমের উৎপাদন ব্যয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তাদের হিসাবে, ডিমপ্রতি উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ১৯ পয়সা। সাধারণত উৎপাদন খরচ বা দামের বিষয়টি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরই বেশি জেনে থাকে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তাদের কর্মকর্তাদের বাজারে পাঠান এবং বাজার থেকে উৎপাদন খরচের তথ্য সংগ্রহ করে। সেজন্য তাদের দাম নির্ধারণ পদ্ধতি বা নির্ধারিত দাম খুব গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তার পরও গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিমের দাম ৯ টাকা ৫ পয়সাই বহাল ছিল। অথচ সে সময় ডিম উৎপাদন করতে ১০ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছিল। সেপ্টেম্বরের পর আবার একটা নতুন দাম নির্ধারণ করা হয় এবং মুরগির জন্যও দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এভাবে দাম নির্ধারণ করায় দেখা গেল, ডিম ও মুরগি উৎপাদকদের উৎসাহ অনেক কমে গেল এবং এ দুই খাতে আগের তুলনায় নতুন বিনিয়োগও কম হয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, দাম নির্ধারণের এ নীতি বজায় থাকলে পোলট্রি খাতের ভবিষ্যতের জন্য তা ভালো হবে না। বরং দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সরবরাহ বেশি আসবে এবং দামও স্থিতিশীল থাকবে।

এক্ষেত্রে ভারতের পোলট্রি খাতে লক্ষ করা যায়। ভারতে এ খাতের খাদ্যপণ্যে কোনো সরকার নির্ধারিত দাম নেই। কিন্তু ভারতে ডিম-মুরগির সরবরাহের কোনো ঘাটতি কোনো সময় হয় না। বরং সেখানে এগুলোর বাজার স্থিতিশীল। সেই সঙ্গে পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় ভারতে ডিম-মুরগির দামও বেশ কম।

আমরা ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণ করতে পারব না। কিন্তু দাম নির্ধারণের এ প্রক্রিয়া থেকে বের হতে পারলে আমরা একটি সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারব। বাণিজ্য উপদেষ্টার প্রতি বিষয়টি বিবেচনার জন্য অনুরোধ রইল।

ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণ ও সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশন ও পোলট্রি খাতের মধ্যে একটি ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। সেটিও সমাধান করা দরকার। কিছুদিন আগে প্রতিযোগিতা কমিশন কাজী ফার্মস, প্যারাগন, সিপি, নারিশ ফিড, আলাল এগ্রো ফুড প্রডাক্টস ও সুগুনা ফুডস বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড—এ ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মুরগির বিক্রয়মূল্য ও সরবরাহ যোগসাজশে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ এনে মামলা করে। এ মামলায় কাজী ফার্মসকে গুরু শাস্তি দেয়া হয়েছে—৫ কোটি টাকা জরিমানা। চূড়ান্ত আদেশে বলা হয়েছে, যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ ছাড়াই অনুমান করে শাস্তি দেয়া হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, ছয়টি কোম্পানিতে মুরগির দাম প্রায় একই সময়ে একই হারে বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়। এতেই নাকি যোগসাজশ প্রমাণ হয়। এতে আসলে যোগসাজশ প্রমাণ হয় না। কারণ বাংলাদেশে যখন মুরগির দাম বাড়ে তখন সব বিক্রেতাই দাম বাড়ান। আর যখন কমে তখন সব বিক্রেতাই দাম কমান। দেশে এ ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও প্রায় শত বড় কোম্পানি আছে যারা ওই একই সময়ে একই হারে দাম বাড়ায়। আবার একই সময় দামও কমায়। শুধু তা-ই নয়, দেশে প্রায় এক লাখ ক্ষুদ্র খামারি উৎপাদক আছেন এবং তাদের দাম বাড়ানোর রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করলে একই চিত্র দেখা যেত। কারণ এটাই আমাদের বাজারের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু অন্যান্য বড় কোম্পানিকে বাদ দিয়ে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে দাম হ্রাস বা বৃদ্ধির জন্য অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতা কমিশন ওই মামলা করেছে বলে চূড়ান্ত আদেশ থেকে জানা যায়। আমাদের ধারণা, প্রতিযোগিতা কমিশনের অভিযোগের কোনো প্রকৃত প্রমাণ না থাকায় কমিশন এক ভুয়া বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হয়েছে। যে ছয় কোম্পানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং শাস্তি দেয়া হয়েছে তার মধ্যে থাইল্যান্ডের সিপি গ্রুপ আছে এবং ভারতের সগুনা গ্রুপও রয়েছে। সগুনা ভারতের সবচেয়ে বড় পোলট্রি কোম্পানি। অন্যদিকে সিপি পৃথিবীব্যাপী একটি শীর্ষস্থানীয় কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ কোম্পানি ২১টি দেশে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী নিয়ে কাজ করে। ২০২৩ সালে তাদের রেভিনিউ আয় ছিল মোট ৯৭ বিলিয়ন ডলার। এই সিপি কোম্পানি সামান্য কয়েকটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করতে বাংলাদেশে আসেনি। অর্থাৎ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন বা প্রতিযোগিতা কমিশনের অভিযোগ বাস্তবসম্মতও নয়। এখানে কিছু ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার আছে যেগুলো ঠিক করা দরকার। এভাবে বরং সৎ ও নীতিমান ব্যবসায়ী, যারা ডিম-মুরগির চাহিদা পূরণ করে আসছেন, তাদের ব্যবসাবিমুখ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারী, শিক্ষিত তরুণ; যারা এ ব্যবসায় আসতে চাচ্ছেন, তাদেরও ব্যবসাবিমুখ করা হচ্ছে। দেশের স্বার্থে যারা পোলট্রি ব্যবসায় আসতে চান, সরকারি পর্যায় থেকেই তাদের সহযোগিতা করা দরকার।

কাজী জাহেদুল হাসান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফার্মস লিমিটেড

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]

sd