চীনে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রথম দেখা দেয় ২০১৯ সালের শেষদিকে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতেই এ ভাইরাস ইউরোপ-আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। একই বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ক্রমান্বয়ে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে থাকলে মার্চের শেষ দিক থেকেই সরকার দেশে ছুটি ও লকডাউন ঘোষণা করে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই জীবন-জীবিকা বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে সরকার ও শিল্পোদ্যোক্তারা অফিস-আদালত, কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে ক্রমান্বয়ে খুলে দেন। করোনার সময় দেশে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের, বিশেষ করে উৎপাদন, ভোগ, আমদানি-রফতানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রাস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দেশের অর্থনীতি সচল রাখা গেলেও করোনা পরিস্থিতির আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারী সারা বিশ্বের জীবন ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যেমন বেশি, অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবও বেশি হয়েছে। তিন বছর বিশ্বকে মারাত্মকভাবে ভুগিয়ে ও লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে করোনার সংক্রমণ বন্ধ হয়েছিল। এতে আশা করা গিয়েছিল, প্রাণঘাতী ভাইরাসটি প্রাকৃতিকভাবে নির্মূল হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। যেহেতু পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই সংক্রমণ ঠেকাতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে কভিড আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৩ জন। মে মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ জনে। আর জুনের প্রথম আটদিনে আক্রান্ত হয়েছে ৩৬ জন। ৫ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজন মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সংক্রমণের সংখ্যা এখনো অনেক কম হলেও আগের সপ্তাহের তুলনায় ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

এমন অবস্থায় সংক্রমণ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ সংক্রমণ হারের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় সবাইকে মাস্ক পরার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। বিশেষত বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের এ ধরনের স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ঈদ ফেরত যাত্রীদের মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর সচেতনতা খুব বেশি কাজে লাগে না।

৪ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পার্শ্ববর্তী দেশে কভিডের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। দেশে গত মে মাস থেকেই করোনার প্রকোপ বাড়ছে।

আইসিডিডিআর,বির (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ) তথ্যমতে, চলতি বছর সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো করোনার নতুন দুটো সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি ও এক্সএফসি। যেগুলো ওমিক্রন জেএন.১-এর একটি উপশাখা। সম্প্রতি যেসব নমুনা পাওয়া গেছে, তার প্রায় সবগুলোয় এক্সএফজি ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এ ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি। ফলে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে তারা বয়স্ক ব্যক্তি, শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা আগে থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা তাদের জন্য এ ভ্যারিয়েন্ট মারাত্মক হতে পারে। এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এনবি.১.৮.১ নামে আরেকটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জেনেটিক সিকুয়েন্স পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানা গেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য বেনাপোলসহ সব স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে স্ক্রিনিংসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মানার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জোরদার করা হয়েছে। গত ২৩ মে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক বুলেটিনে বলা হয়েছে, এ ভ্যারিয়েন্ট খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং এর সংক্রমণ হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

আশঙ্কাজনক না হলেও দেশে এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ২৩ মে দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, এনবি.১.৮.১ ধরন এখন ক্রমেই ছড়াচ্ছে। এর সংক্রমণের হারও বেশি। তবে করোনার আগের ধরনগুলোর চেয়ে এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি নয়। এ পরিস্থিতিতে করোনার সম্ভাব্য বিস্তার বন্ধে এর পরীক্ষার সরঞ্জাম সংখ্যা বাড়ানো এবং আবার টিকা দেয়া শুরুর কথা বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, করোনা প্রতিরোধের উপায় হলো মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও টিকা নেয়া। যারা বয়স্ক, অল্প রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা, ভিন্ন কোনো জটিল রোগে ভুগছেন তাদের জন্য তো বটেই, এমনকি যেসব ব্যক্তির সর্বশেষ টিকা নেয়ার মেয়াদ ছয় মাস পার হয়ে গেছে, তাদেরও করোনার টিকা নেয়া উচিত। এছাড়া যেসব ব্যক্তি এর আগে একটি ডোজ নিয়েছেন, তাদের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ নেয়া প্রয়োজন।

দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও আসলে করোনা প্রতিরোধসংক্রান্ত তৎপরতা প্রায় নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে করোনার তথ্য সংগ্রহসংক্রান্ত কাজও ঢিমেতালে চলছে। অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সূত্র জানাচ্ছে, এখন তাদের হাতে ৩১ লাখ টিকা মজুদ আছে। এর মধ্যে ১৭ লাখের মেয়াদ আগামী আগস্টের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। করোনার টিকা আবার নতুন করে শুরু করার বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী স্তরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। করোনার সংক্রমণ রোধে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিট মজুদের কথা বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার কোনো কিট নেই বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা বয়স্ক, কিডনি রোগী, গর্ভবতী নারী, ক্যান্সার রোগী, হাঁপানিতে ভোগেন বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় আক্রান্ত তাদের জন্য এ ভাইরাস ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কভিডের যেকোনো ভ্যারিয়েন্টই বয়স্ক, গর্ভবতী ও আগে থেকে জটিল রোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে আবারো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এখন থেকেই নিয়মিত হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার, মাস্ক পরা ও ভিড় এড়িয়ে চলা—এ অভ্যাসগুলো আবার শুরু করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নিতে যাবেন বা যারা চিকিৎসা দেবেন তাদের সবাইকে মাস্ক পরা, হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মানা দরকার।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর ২০২৫ সালের ৮ জুন পর্যন্ত দেশে মোট ২০ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৯ জন আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫০০ জনের। ২০২৪ সালে কেউ মারা না গেলেও ২০২৩ সালে ৩৭ জন এবং ২০২২ সালে ১ হাজার ৩৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

যেহেতু করোনার সংক্রমণ বাড়ছে সেহেতু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কভিড আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে। রেলওয়ের মতো অন্যান্য পরিবহনেও যাত্রীদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। যেকোনো মূল্যে করোনার সংক্রমণ কমাতেই হবে। শুরুতেই যদি এর সংক্রমণ রোধ করা না যায় তাহলে পরে বিভিন্ন উদ্যোগেও কাজ হবে না। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।