বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান ও মূল্য সংযোজনের নিরিখে চামড়া শিল্প একটি অপার সম্ভাবনাময় খাত। তৈরি পোশাকের পরই চামড়া শিল্প থেকে আসে দেশের সর্বোচ্চ রফতানি আয়। পর্যাপ্ত নিজস্ব কাঁচামাল, সস্তায় শ্রমিক ও সহজে রফতানি সুবিধা অর্জনের সুযোগসহ অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক গুণগত মানের অভাবে ব্যর্থতার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে এ শিল্প খাত। বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ থাকতে হয়। কিন্তু সাভারের হেমায়েতপুরে স্থাপিত ট্যানারি শিল্পে সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। অধিকাংশ ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় বাংলাদেশ মূলত এমন সব বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে যেখানে ব্র্যান্ড মূল্য নেই। ফলে স্থানীয় রফতানিকারকরা পণ্যের দাম কম পান। আবার দেশের বাজারেও চাহিদা অনুযায়ী চামড়াজাত পণ্যের হিস্যা বাড়ছে না। দেশের বাজারের সিংহভাগ অংশই দখল করে আছে বিদেশী পণ্য। এ শিল্প থেকে রফতানি আয় বাড়াতে হলে ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এলডব্লিউজি সনদ পেতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি। এজন্য সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে ২০১৭ সালে স্থানান্তর করা হয় সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীতে। ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে স্থাপন হয় সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি)। সেটি পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় দূষিত পানি যাচ্ছে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে। বিগত সরকারের সময়ে পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের নানা অভিযোগ ও আন্দোলনের পরও এ খাতের দূষণ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই আন্দোলনকারীদের কয়েকজন বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তারা দায়িত্ব নেয়ার নয় মাসেও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এ শিল্পের বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে মরণদশায় ধলেশ্বরী নদী। নদীর তীরে উন্মুক্ত স্থানে ক্রোমিয়ামযুক্ত কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়, যা পানি ও মাটি দুটোই দূষিত করছে। অন্যদিকে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন মূলধনের অভাবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছেন না কারখানাগুলোয়। সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক রফতানিতে। বর্তমানে সাভারে সিইটিপির প্রায় ১৮ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঈদুল আজহার সময়ে অন্তত ৪৫ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের প্রয়োজন পড়ে।

দেশের সিংহভাগ ট্যানারি প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজি সনদ না পাওয়ায় রফতানি আয়ে পিছিয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সময় সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানালেও সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। প্রতিনিয়তই ট্যানারির বর্জ্যে নানাভাবে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীসহ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, যা ঈদুল আজহার সময় বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সাভারের চামড়া শিল্পের বিদ্যমান সংকট সমাধান করার জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কখনো কখনো আলাপ-আলোচনা হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কাজ লক্ষ করা যায়নি। এ শিল্পের যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে দরকার কার্যকর পদক্ষেপ। ধলেশ্বরীর দূষণ বন্ধ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরের দূষণ বন্ধ না হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাংলাদেশী চামড়া কিনছে না। বাংলাদেশী চামড়ার বড় ক্রেতা বর্তমানে চীন। বাংলাদেশ থেকে রফতানিকৃত চামড়ার সিংহভাগই সেখানে যাচ্ছে। সেখান থেকে দাম পাওয়া যায় তুলনামূলক কম। কারণ দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া চামড়া প্রধানত ক্রাস্ট লেদার। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ফিনিশড লেদারে পরিণত করে বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে চীন। অথচ বাংলাদেশ নিজেই যদি আধুনিক ট্যানারি শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে ফিনিশড লেদার রফতানি করতে পারত, তাহলে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার হচ্ছে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের। সেখানে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের। এটা দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। এখানে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এটির জন্য কমপ্লায়েন্স বা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দ্রুত দূর করা দরকার।

২০০৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও টিম্বারল্যান্ডের মতো কয়েকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ও জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিলে এলডব্লিউজি গঠন করে। পরিবেশ সুরক্ষায় জোর দিয়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন নিশ্চিত করাই সংস্থাটির লক্ষ্য। বর্তমানে বিশ্বে এক হাজারের বেশি ব্র্যান্ড ও সরবরাহ খাতের প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজির সদস্য। এলডব্লিউজির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি কারখানা নিরীক্ষার জন্য একটি সাধারণ মানকাঠামো তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে তারা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর উপাদান, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুসারে, এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় হারাচ্ছে। এলডব্লিউজি তথ্য বলছে, এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতালির রয়েছে ৯৫২টি, ভারতের ৩৩৪, চীনের ২৬৩, পাকিস্তানের ৬২, তাইওয়ানের ২৪, ভিয়েতনামের ২৭টি আর বাংলাদেশে মাত্র আটটি।

যদিও আট বছর আগে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে সাভারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। সিইটিপি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। এদিকে দূষিত হচ্ছে ধলেশ্বরী। কমপ্লায়েন্সের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়ার মূল্য কমেছে। আবার ট্যানারির শ্রমিকরাও ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শ্রমিকদের আবাসন ও চিকিৎসাসহ তাদের জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদা পূরণে নেই যথাযথ ব্যবস্থা। ট্যানারিগুলোয় স্থায়ী ও অস্থায়ী দুই ধরনের শ্রমিক কাজ করেন। তাদের জীবন অনেকটা দুর্বিষহ। মজুরি বোর্ডের নির্ধারিত গ্রেড নয়, অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের বেতন নির্ধারিত হলেও ওভারটাইম ও ছুটি সুবিধা সীমিত। নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা। সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থাও ঠিকমতো করাতে পারেন না তারা। তাই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

চামড়া, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। অথচ পরিবেশ দূষণ, অর্থ সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে চামড়া শিল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে তা মেনে নেয়া যায় না। এ শিল্পকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য উন্নত বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী শিল্পটিকে পরিবেশবান্ধব করাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। তবে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অতীতের অনেক ভালো উদ্যোগের মতো এটাও তেমন ভালো ফল দেবে না। চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে থাকছে, এমনটা কাম্য নয়। প্রয়োজনীয় প্রণোদনাসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিশ্চিত করতে পারলে এটা তৈরি পোশাক খাতের মতো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি প্রধান খাত হতে পারে।