এমন বয়স কাঠামো যেকোনো দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু এ সময় দীর্ঘমেয়াদি নয়। সময় ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা ও তাদের জন্য পর্যাপ্ত শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ রাখা। অন্যথায় তারা জনসম্পদ না হয়ে জনমিতিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতি তরুণদের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরই মধ্যে দেশের ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে বলে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি বাংলাদেশের তরুণদের পরিস্থিতি ও শ্রমবাজারের বাস্তবতাকেই প্রকাশ করছে।
দেশে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হলেও তাদের বড় একটি অংশের দক্ষতা কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাত প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল খুঁজে পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না প্রায় এক কোটি মানুষ। যুব বেকারদের উল্লেখযোগ্য অংশই স্নাতক ডিগ্রিধারী।
পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের বিকাশ না ঘটায় অনেকেই আত্মকর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকেছে, যা ইতিবাচক। তবে এতে প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদনশীলতা বা কর্মসংস্থান বেড়েছে এমন নয়। কেননা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ক্ষুদ্র পরিসরে, স্বল্প প্রযুক্তিনির্ভর এবং কম উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজার সম্প্রসারণ, পণ্য উন্নয়ন কিংবা ডিজিটাল বিপণনের মতো দক্ষতার ঘাটতির কারণে এসব উদ্যোগ বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারছে না। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও উৎপাদনশীলতা ও আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের জন্য শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানো নয়, কর্মসংস্থানের গুণগত মান এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। নতুন প্রকল্পও গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা কতটা, তা নিয়ে যথেষ্ট মূল্যায়ন নেই। কতজন প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের আয় কতটা বাড়ছে কিংবা প্রশিক্ষণ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না।
বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও স্বল্প দক্ষতা বড় বাধা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও অধিকাংশই অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ। ফলে তারা উচ্চ মজুরির পরিবর্তে নিম্ন আয়ের কাজে নিয়োজিত হন। অন্যদিকে জাপানের মতো দেশে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দক্ষ ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন বিদেশী কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ক্রমেই দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে প্রচলিত দক্ষতার ধারণাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু কারিগরি জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডিজিটাল দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ ও দলগত কাজের দক্ষতা, বিদেশী ভাষাজ্ঞান এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা। অথচ দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে সনদনির্ভর। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা কম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ দুর্বল এবং পাঠ্যক্রম হালনাগাদের গতি ধীর। ফলে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা শ্রমবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুপাতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আকার বাড়েনি। অথচ উৎপাদনশীল, নিরাপদ, ন্যায্য মজুরিনির্ভর এবং দক্ষতা বিকাশের সুযোগসম্পন্ন কর্মসংস্থান ছাড়া জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন কঠিন হয়। বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি অনিশ্চিত, স্বল্প আয়ের কিংবা দক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকেন, তাহলে তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হবে না। একইভাবে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি বাড়ানো ছাড়া শোভন কর্মসংস্থানের পরিসরও বাড়বে না। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পনীতি, বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক লভ্যাংশের যে সুযোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটা পুরোপুরি ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন ফলাফলনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল; শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব; প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ; আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশেষ সহায়তা। সর্বোপরি শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাত বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য বিনিয়োগ ও শিল্পায়নকে আরো গতিশীল করা জরুরি এবং তরুণদের সময়োপযোগী দক্ষতায় দক্ষ করতে তুলতে হবে। তরুণদের প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা এবং আনুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজন করতে পারলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথ সুগম হবে। তরুণরাও অর্থনৈতিক উদ্বেগ থেকে মুক্তি পাবে।









