মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিসর বিবেচনায় বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় নয়, বিশ্ব পরিমণ্ডলেই অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশ। যেখানে প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের বহু দেশ প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম, দশম এমনকি দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা বিস্তৃত রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে তা এখনো প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীতেই সীমাবদ্ধ। তিন দশকের বেশি সময়েও অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিসর বাড়ানো না যাওয়াটা নীতিগত ব্যর্থতারই প্রতিফলন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাধ্যমিক শিক্ষায়। অবৈতনিক না হওয়ায় এবং শিক্ষা ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ছে। দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যের বাস্তবতায় শিক্ষার বিপুল ব্যয় বহন করা দেশের বড় একটি অংশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে শিক্ষা হয়ে উঠছে আর্থসামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরো প্রকট করছে।
১৯৭২ সালে রচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানেও অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে এ সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এখানেই রয়েছে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। রাষ্ট্র যদি সংবিধানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থও হয়, তবু নাগরিকরা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন না। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারসহ ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এসব সংস্কার কমিশনের মধ্যে শিক্ষা খাত সংস্কারের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় শিক্ষা নেই।
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বহু দেশ প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম, দশম এমনকি দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার আইনি নিশ্চয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ। শুধু তাই নয়, প্রাথমিক পর্যায়েই মানসম্পন্ন অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দেশের সংবিধানে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈষম্যমূলক ও সর্বজনীন করা যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি দেখা গেছে, যার দরুন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে। এমনকি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও এ দেশে প্রায় ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে অন্তত পাঁচ ধরনের পাঠ্যক্রম চালু আছে। প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের বিষয়টি কেবল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-তেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, বাস্তবায়ন হয়নি। এতে দিন দিন অভিভাবকরা সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার জন্য বেছে নিচ্ছেন বেসরকারিভাবে স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা অবৈতনিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রমের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অবৈতনিক ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা বললেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় সরকারি বিদ্যালয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকরা। শিক্ষাবিদদেরও মত, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বজনীন ও বিনা ব্যয়ে পড়াশোনার শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। সুতরাং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত না হলে শিক্ষা খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কখনই পূরণ হবে না।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। এ গ্রেড অনুযায়ী তাদের মূল বেতন ১১ হাজার টাকা এবং বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ সর্বসাকল্যে পান সাড়ে ১৯ হাজার টাকার মতো। শিক্ষককে যদি পর্যাপ্ত বেতন ও সঠিক মর্যাদা দেয়া না হয়, তাহলে শিক্ষাদান তার কাছে কেবলই অন্তঃসারশূন্য দায়িত্ব মনে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ব্যতীত সুফল আশা করা বোকামি। একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক শিক্ষার্থী, সমাজ ও দেশকে পরিবর্তনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আর প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষকের বেতন কাঠামো ও মর্যাদা বাড়ানোর বিকল্প নেই। মেধাবীদের এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট করতে হলে এ পেশার সব ধরনের বৈষম্য ও সমস্যা দূর করার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন ও আত্মবিশ্বাসী হন। লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং বেশি বেতনের চাকরিগুলোর একটি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনের দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে লুক্সেমবার্গ। ইউরোপের এ দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৫ হাজার ৯৮৪ ডলার ৩০ সেন্ট। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি। দেশটির প্রাথমিক শিক্ষকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৫ হাজার ৭৯৯ ডলার ৯১ সেন্ট। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা সুইজারল্যান্ডের শিক্ষকরা ন্যূনতম ৫ হাজার ৭৯ ডলার বেতন পেয়ে থাকেন। শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষকের বেতন অনেক কম। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিসর বিস্তৃত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও মর্যাদা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক সংকটও রয়েছে। মানসম্পন্ন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োজনের ব্যবস্থা করা দরকার।
শিক্ষা নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্র যদি সত্যিই বৈষম্য কমাতে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার পরিসর বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজির লক্ষ্য-৪-এর অন্তর্ভুক্ত প্রথম সাবকম্পোনেন্ট ৪.১-এ বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সব ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা। এসডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়নে মাধ্যমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অবৈতনিক করা যেতে পারে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যয়ের ৭১ শতাংশই পরিবার বহন করে। এ শিক্ষা ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের মতো দেশের পরিবারগুলোর একটি বড় অংশের পক্ষে এ বিপুল পরিমাণ ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। যদি সরকারের পক্ষ থেকে অবৈতনিক শিক্ষার স্তর বাড়ানো না হয় তবে সামাজিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়তে থাকবে। তাই শিক্ষা ব্যয়ের অন্তত বড় অংশ রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। অন্যথায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।










