আনু মুহাম্মদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী। বর্তমানে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। তিনি তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৯৮ সালে। ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি এর সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। অনেকেই বলছেন, বিগত সরকারের মতোই বাজেট পেশ করা হয়েছে এবার। আপনার মূল্যায়ন কী?
যুক্তিসংগত কারণেই এবারে নতুন কোনো মেগা প্রকল্প নেয়া হয়নি। অন্যান্য অনেক প্রকল্পের ব্যয়ও কাটছাঁট করা হয়েছে। সুতরাং সে হিসেবে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার আরো কম হতে পারত। এবার অনেকের প্রত্যাশা ছিল, বিগত অর্থবছরগুলোয় বাজেটের যে ধরন, অগ্রাধিকার ও অস্বচ্ছতা ছিল, এ অর্থবছরে তার পরিবর্তনের সূচনা অন্তত দেখা যাবে। সে রকম কিছু কথা অবশ্য বাজেটের শুরুতে ছিল। এ বাজেট জিডিপি-কেন্দ্রিক, অবকাঠামো-কেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির বাইরে গিয়ে সামগ্রিক কল্যাণের বিষয়টা দেখবে, মানবকল্যাণে নজর দেবে ইত্যাদি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তিন শূন্য তত্ত্ব বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ কথাগুলোর সঙ্গে বাকি বাজেটের কাঠামোর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং তার উল্টোযাত্রা দেখা গেছে। মনে হয় এ কথাগুলো যারা লিখেছেন আর যারা বাজেট প্রণয়ন করেছেন—এ দুই গ্রুপের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
আগের বাজেটের ধরনের সঙ্গে এ বাজেটের অগ্রাধিকারের বিষয়ে অবস্থান অভিন্ন। যেমন জনপ্রশাসন খাতে বিপুল ব্যয়। এর মধ্যে গাড়ি, কেনাকাটা ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার কারণে জনপ্রশাসনের ব্যয় এবারো বেড়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটেও বেড়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটেও বেড়েছে। আগে যে ছাঁচে বাজেট করা হতো এবারো সেটাই করা হয়েছে। ছাঁচটার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও জ্বালানি—এগুলো সবই হচ্ছে নিচের দিকে! যদিও এগুলো ওপরের দিকে আসার কথা। অর্থ উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে দেখা গেছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেট অনুপাতের দিক থেকে বরাবরের মতোই নিচে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশের কম এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ শতাংশের কম। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সারা বিশ্ব এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাংলাদেশ একেবারে নিচের দিকে। যে বরাদ্দ দেয়া হয় তারও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ স্বচ্ছতার অভাবে অপচয়, দুর্নীতি, ভুল প্রকল্প ও অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ—এগুলোর পেছনে ব্যয় হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কম, তারা বেশি কিছু করতে পারবে না এটা আমরা জানি। কিন্তু তারা একটা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারত। সেটা না করে একদিকে আগের ছাঁচ অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে ট্রাম্প আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা কেমন এবং এর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
বৈষম্য কমাতে বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোগান্তি কমাতে তিনটি পথ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কর ব্যবস্থা। বাংলাদেশে আগে থেকেই কর-জিডিপির অনুপাত কম। এটা বাড়ানোর বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ঠিকই আছে। বাড়ানোর জন্য যেটি জরুরি সেটি হলো বিত্তবানদের কাছ থেকে কর আদায় নিশ্চিত করা। আগেও দেখা গেছে যাদের কর দেয়ার কথা তারা তা দিচ্ছে না, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে! বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার ধরনই হচ্ছে পরোক্ষ কর বেশি, প্রত্যক্ষ কর কম। প্রত্যক্ষ কর পেশাজীবীদের কাছ থেকে নেয়া হয়। কিন্তু বিত্তবানদের কাছ থেকে খুবই কম নেয়া হয়! ভ্যাটসহ পরোক্ষ কর ৬০ শতাংশের বেশি এবং এ বাজেটেও সেটি আছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর করের বোঝা অব্যাহত থাকছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটি বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পথ তৈরি করা। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনই আনা হয়নি। তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা। এ খাতেও আগের সময়ের মতো কিছু ভুল বরাদ্দ যুক্ত করে এর আকার বড় করে দেখানো হয়েছে। যেমন পেনশন, ভর্তুকি ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। এগুলো বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে ভাতা দেয়া হয় তা জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় গড় হার হলো শতকরা ৩ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ অনেক পেছনে। বরাদ্দ যতটুকু হয় তার অনিয়ম তো আছেই। সর্বজনীন রেশনিংয়ের ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার ছিল। তার কোনো আলোচনা নেই, বরং চলতি টিসিবির মাধ্যমে বিতরণ সামগ্রীর দাম এর আগেই বাড়ানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে শ্রমজীবী, কৃষক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যারা অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছেন তাদের কারো জন্যই কোনো আশার কথা নেই বা নতুন কোনো উৎসাহের জায়গা নেই। কর ব্যবস্থায় আমদানি পণ্যের ওপর শুল্কহার কোথাও কমানো হয়েছে, কোথাও মওকুফ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতির প্রভাব আছে। আমরা দেখছি ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতির হুমকি কীভাবে সারা পৃথিবীতে উন্মাদনা তৈরি করেছে। তবে উন্মাদনা তৈরি করে তার পক্ষেও টিকে থাকা মুশকিল, তাই পাল্টা শুল্কনীতি স্থগিত করতে হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার এতটাই কাবু হয়েছে যে আর কোনো বিবেচনা বা চেষ্টা না করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত সব পণ্যের শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে কিংবা শুল্কহার কমানো হয়েছে। এমনকি যুদ্ধাস্ত্রের ওপর সামান্য শুল্কহার ছিল সেটাও বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য আমদানি পণ্যের শুল্কহার কমানো হয়েছে। যেমন বাংলাদেশের প্লাস্টিকের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, এটা খুবই যুক্তিযুক্ত। কারণ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো উচিত। কিন্তু আমদানীকৃত প্লাস্টিকের ওপর আবার শুল্ক কমানো হয়েছে। যার ফলে বিদেশী প্লাস্টিক আরো বেশি করে দেশে প্রবেশ করবে। তারপর বিদেশী মাছ, মাংস, পোশাক—এগুলোর ওপর কর কমানো হয়েছে। এর ফলে সরকারেরও আয় কমবে। এ আয়টা আবার বাড়ানোর জন্য সরকার দেশীয় শিল্পের ওপর অনেক কর আরোপ করা হয়েছে বা আগে যে ছাড় ছিল সেটা কমানো হয়েছে। বিস্ময়কর হলো বড় পাবলিক বাসের ওপরেও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ বিশেষ করে সোলার প্যানেল আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করা ছিল এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক মওকুফ করা ছিল—এ বাজেটে আগের বাজেটের সেই ধারাবাহিকতার কোনো পরিবর্তন দেখিনি।
জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছেন এ বাজেটে?
জাতীয় সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত সরকারের এটা নিয়ে কোনো মনোযোগই ছিল না। এ কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অনলাইন তথ্যপ্রযুক্তি খাতগুলোয় জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোয় গুরুত্ব দেয়নি বিগত সরকার। মানুষ প্রত্যাশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় সক্ষমতায় গুরুত্ব দেয়া হবে, কিন্তু তা দেয়া হয়নি। জাতীয় সক্ষমতা কম হওয়ায় আমাদের আমদানিনির্ভরশীলতা বাড়ছে। এ নির্ভরশীলতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করে, যা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তেলের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা আছে! এ সরকার এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অথচ জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা অর্জন করা গেলে আমাদের এত আমদানিনির্ভরশীলতা থাকত না। ভর্তুকিও কমে যেত। যুদ্ধ বা যুদ্ধ হুমকির কারণে সামনে আরো ঝুঁকি বাড়বে এবং এটা পুরো অর্থনীতিকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের দিকে নজর দিলে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার জন্য সরকারের অস্থিরতা দেখা যেত না।
এবারের বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আসবে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর সব সময়ই ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু এনবিআরের সংস্কার নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে?
প্রথমত, বাংলাদেশে বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের ছাড় দেয়ার চর্চা বরাবরই ছিল। দ্বিতীয়ত, এ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়নি। কারণ বিগত ১৫ বছর আমরা দেখেছি, প্রতিষ্ঠানগুলো বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া কাজ করেনি, ওপরের আদেশে সব কাজ হতো। তাই এখন মূল কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাবানদের প্রভাব থেকে মুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন ও সক্রিয় করা। এর জন্য যে ধরনের সংস্কার প্রয়োজন ছিল অর্থাৎ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্বাধীন করা ও সক্ষমতা বাড়ানো—সে রকম কোনো উদ্যোগ এ সরকারের কাছ থেকেও দেখছি না। আইএমএফ কোনো শর্ত দিলে সেটিকে সরকার পূরণ করছে, কিন্তু এভাবে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো যায় না। প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিজস্ব উদ্যোগ থাকতে হয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের যে প্রয়োজন সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে সাজাতে হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হয়। সে রকম কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হবে। প্রত্যক্ষ কর ঠিকমতো আয় হবে না, তবে পরোক্ষ কর আয় হবে। একটা পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে জনগণের ওপর নানা শুল্ক কর আরোপ করা হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ানো মূলত করের মতোই, এর প্রভাব আরো সর্বব্যাপী। রাজস্ব আহরণের প্রক্রিয়া স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক না হওয়া পর্যন্ত এ জায়গায় ঘাটতি ও দুর্বলতা দূর হবে না।
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে। এ ঋণনির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বিচার ঋণনির্ভরতাই দেশকে একটা বড় বিপদের মুখে নিয়ে গেছে। এ কারণে এখন বিপুল পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে! আর এটিই এখন বাজেটের বৃহত্তম খাতে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। এজন্য ঋণনির্ভর প্রকল্প বাদ দিতে হবে। যদিও কিছু প্রকল্প অন্তর্বর্তী সরকার স্থগিত বা বাতিল করেছে। কিন্তু দায়মুক্তি আইনের অধীনে বড় বড় প্রকল্পের কাজ, ঋণনির্ভর অনেক প্রকল্প এখনো অব্যাহত আছে। জনপ্রশাসন খাতের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেশি। এতে আমলানির্ভর বা আমলাদের সুবিধাদানের জন্য জনপ্রশাসন খাতের অর্থ ব্যয় হয়। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজেট ঘাটতিও বাড়ছে। ফলে সরকার আবার ঋণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকার যখন বেশি মাত্রায় ঋণ নেয় তখন অর্থকরী খাতে বিকৃতি তৈরি হয়।
সরকারের বেশি বেশি ঋণের কারণে বেসরকারি খাত বা উৎপাদনশীল খাতে যে ঋণের দরকার হয় তার জোগান কমে যায়। এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ছোট ছোট উদ্যোক্তা। সারা দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে কয়েক কোটি মানুষ জড়িত। যারা অনেক কষ্ট করে পুঁজি জোগাড় করে ব্যবসা দাঁড় করায়। অনানুষ্ঠানিক খাতে সরকারের সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দাঁড় করানো উচিত। তাদের সহযোগিতা করলে স্থিতিশীল কর্মসংস্থান বাড়বে। ফলে অর্থনীতি গতিশীল হবে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার ঋণ না নিয়ে এবং ঋণখেলাপিদের ঋণ না দিয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া দরকার। সরকার ও ঋণখেলাপিরা ঋণ নিলে অর্থনীতির সংকট বাড়বে। এ পুরো ঋণ ব্যবস্থাপনারই বড় সংস্কার করা প্রয়োজন। সরকারের ঋণ নেয়া কমাতে হবে এবং ঋণখেলাপিদের ঋণ দেয়া বন্ধ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতায় নিয়ে আসা দরকার।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?
গত দেড় দশকে অবাধ সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের কারণেই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছিল। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। কারণ যারা সম্পদ লুণ্ঠন করেছে ও অর্থ পাচার করেছে তারা আপাতত নিষ্ক্রিয়, এসব গোষ্ঠীর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সরকার এ সুবিধার ওপর ভর করে দেশে যাতে বিনিয়োগ ভালো হয় সেদিকে মনোনিবেশ করতে পারত। অর্থকরী খাত বা বেসরকারি খাত যাতে একটা সুশৃঙ্খল অবস্থায় আসে, সেজন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল। সরকার যেভাবে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর শুল্কছাড় দিয়েছে, একই সঙ্গে দেশীয় পণ্য উৎপাদনের ওপর যেভাবে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তাতে দেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লেই মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখবে। তারপর সরকার বেশি ঋণ নিলেও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। তেলের দাম বেড়ে গেলেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। তাই সরকারের এখন বিবেচনায় থাকতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও যেন দেশে দাম বাড়ানো না হয়। আগে বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম কম ছিল দেশীয় বাজারে দাম বেশি ছিল। ফলে অনেক মুনাফা জমা আছে। এখন সেটাকেই বিবেচনায় এনে তেলের দাম না বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। তেলের দাম বাড়ালে এবং সরকারের অন্যান্য ভূমিকার কারণে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কম। যদি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করবে।
দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হচ্ছে। কিন্তু সে তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এ বাজেট কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?
এ সরকার এসেছে একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সরকারের মনে রাখা দরকার ছিল, এ গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল কর্মসংস্থানের দাবিতে আন্দোলন বিস্তারের মধ্য দিয়ে। গত ১০ মাসে যত সভা-সমাবেশ-মিছিল হয়েছে, মানুষ দাবি-দাওয়া নিয়ে এসেছে তাদের প্রায় সবার মূল দাবি হলো ‘কাজ’। স্কুল-কলেজ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পল্লী বিদ্যুৎ কর্মী, তথ্য আপা, আনসারসহ সবার মূল দাবি নিরাপদ ও নিশ্চিত কর্মসংস্থান। সবাই কাজ করেই বাঁচতে চায়, বাড়তি সুবিধা তারা কেউ দাবি করেনি। সেজন্য বাজেটের মূল বিষয় হওয়া দরকার ছিল কর্মসংস্থান। এটা কথাবার্তায় আছে, কিন্তু কাজের মধ্যে নেই! সরকারের যে বরাদ্দ ও উদ্যোগ—সেগুলোর মধ্যে কর্মসংস্থান গুরুত্ব পাওয়া দরকার ছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালসহ রাষ্ট্রীয় বহু প্রতিষ্ঠানে এখনো লাখ লাখ পদ খালি আছে, যে পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে না।
উল্টো অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে বেকারত্ব বাড়ছে। দারিদ্র্য বাড়ছে। মালিক অপরাধী হওয়ার কারণে অনেক কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মালিক অপরাধী হলে তার শাস্তি হবে শ্রমিকরা কেন শাস্তি পাবে? খুবই ভুল পদক্ষেপ। যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা, সেখানে কারখানা বন্ধ করে লক্ষাধিক নতুন বেকার তৈরি করা হয়েছে! এগুলো সরকার ও বাজেটের বড় দুর্বলতা। যে ইস্যুকে কেন্দ্র করে গণ-অভ্যুত্থান হলো, সরকার পতন হলো, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এল, সেটিই তাদের মনোযোগে নেই। এটা মনোযোগে থাকলে বাজেটের ছাঁচ ভিন্ন রকম হতো। আসলে সরকার সংস্কারের কথা বলছে অনেক, কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কারের সূচনা করার উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। তার কারণেই বাজেটে আগের ছাঁচই অব্যাহত থেকেছে।










