বছর ঘুরে আবারো মহান বিজয় দিবস সমাগত। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আমেজে পালিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের সঙ্গে মিশে থাকা এ দিবস। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের বিজয় দিবসের তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ দিবস ছিল অনাড়ম্বর, আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব এবং ফাঁপা আবেগে ঠাসা।৷ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের অবৈধ ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রধান ভাবাদর্শিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’। আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংজ্ঞায়িত চেতনার রাজনীতি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মর্মশাঁসের সম্পূর্ণ বিরোধী। গুম, খুন, ক্রসফায়ার, ধর্ষণ, লুটপাট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে তিন তিনটি অবৈধ নির্বাচন—এসব গণবিরোধী মারণঘাতী কর্মকাণ্ডের বৈধতার জন্য আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিতে অভ্যস্ত ছিল। এমনকি ১৬ ডিসেম্বরকে পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শ উৎপাদনের দিবসে পরিণত করেছিল গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।

বেদখল হওয়া জাতীয় ইতিহাস ও দিবস পুনরুদ্ধার করা জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম এক অঙ্গীকার। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের আপামর মানুষের বীরোচিত অর্জন। এ অর্জনকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে আত্মসাৎ করেছিল আওয়ামী লীগ। জনগণের আত্মদান ও বীরত্বকে তো বটেই, এমনকি তৎকালীন ক্রিয়াশীল অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানও আওয়ামী লীগ কখনো স্বীকার করেনি। শুধু তা-ই নয়, শেখ মুজিব ব্যতীত আওয়ামী লীগের অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রকে কখনো প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া হয়নি।

জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাসকে আওয়ামী দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় এক পদক্ষেপ। আওয়ামী লীগ ও দিল্লির সব মিথ্যা প্রচারণা অসাড় প্রমাণ করে দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে লাখো জনতার ঢল লক্ষ করা গেছে। সরকার মহান বিজয় দিবসের ভাবগাম্ভীর্যের প্রতি পূর্ণ সুবিচার করেছে, অথচ দিবসটিকে রেখেছে গোষ্ঠী স্বার্থের ঊর্ধ্বে। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আমলে নিলে সরকারের এমন অবস্থান নজিরবিহীন। আশা করা যাচ্ছে, বিজয় দিবসে জনতার ঢল আরো কয়েক গুণ বাড়বে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিজয় দিবসের মাহাত্ম্য সমুন্নত রাখবে।

বিভিন্ন পক্ষের ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর দিকে তাকালে চমকপ্রদ ও আশাজাগানিয়া বেশকিছু বিষয় নজর এড়ায় না। বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বধ্যভূমিতে শনাক্তকৃত জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের গণকবরে জিয়ারত, মোমবাতি প্রজ্বালন, বিজয় শোভাযাত্রা, কনসার্ট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে শুরু করে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে দোয়া ও প্রার্থনা—এমন অভিনব ও গণমুখী সব কর্মসূচির প্রাবল্য দেখা যাচ্ছে।

এসব কর্মসূচির বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শাসনের প্রধান হাতিয়ার ছিল বিভাজনের রাজনীতি। জনগণকে পরস্পরবিরোধী নানা বর্গে বিভক্ত করা ছিল এ ধরনের শাসনপ্রণালির প্রধান কৌশল। ধর্ম বনাম প্রগতি, শাহবাগ বনাম শাপলা, সেকুলারবাদ বনাম মৌলবাদ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বনাম বিপক্ষ শক্তি—এমন বিভাজনমূলক চাল আওয়ামী শাসনের ভিত মজবুত করেছে।

আওয়ামী লীগ পতনের পর উদযাপিত প্রথম বিজয় দিবসে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন পক্ষের গৃহীত কর্মসূচিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, গণতন্ত্রকামী জনগণ বিভাজনের পাতানো জাল ছিঁড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর। এসব কর্মসূচি বলতে চায়, ধর্মের সঙ্গে ভাষার আবশ্যিক কোনো বিরোধ নেই; বরং, ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য ও স্মৃতির বৈচিত্র‍্য মিলিয়েই আমরা একটি সুসংহত রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হয়ে উঠব।

মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের একমাত্র শাসক যাকে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। এরশাদের মতো তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। পতনের পর রাজনীতিতে এরশাদের পুনর্বাসন হয়েছিল। এর ‘কৃতিত্ব’ আমরা তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোকে দিতেই পারি। তবে এবার শিক্ষার্থী সমাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও জনগণ এমনই এক তীব্র গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে যে গণহত্যাকারী হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

একুশ শতকের বৈশ্বিক ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শাসককে এ দেশের তরুণরা অবৈধ ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে। এজন্য তারা নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে। এটা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে আত্মতুষ্টির ফুরসত নেই। হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার তৈরি করা ব্যবস্থা পুরোটা অক্ষত রয়ে গেছে। এজন্যই শিক্ষার্থী-তরুণরা ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’-এর রাজনীতি নিয়ে হাজির হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে হাসিনার নামের আগে খুনি বা গণহত্যাকারী না লিখলে তরুণরা ক্ষুব্ধ হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ব্যবহার করে আবার দেশে ঢুকতে তৎপর। আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ রীতিমতো পত্রিকায় কলাম লিখে হাহাকার করছেন৷ ইতিহাস নাকি মুছে ফেলা হচ্ছে! এ অশ্রু বিসর্জনের মাজেজা বোঝা কঠিন। অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে কোনো ইতিহাস মুছে ফেলা হচ্ছে না; বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুজিববাদী বিচ্যুতি ঠিক করার মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস সৃষ্টির পথ সুগম করা হচ্ছে মাত্র। মুজিববাদী ভাবাদর্শ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিকৃতি সাধন করেছে। ইতিহাসের সব স্বর মুছে দিয়ে একক ব্যক্তির মহিমা কায়েমের পাঁয়তারা করেছে।

বাংলাদেশের সুশীল সমাজের বড় অংশ চার দশক ধরে ইতিহাসকে আওয়ামী লীগের কোলে তুলে দিয়েছে। চেতনা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছে। সেই চেতনা ইন্ডাস্ট্রি যে কতটা দেশ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তা বলা শুরু হয়েছে মাত্র। বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র করতে হলে ইতিহাসের বি-আওয়ামীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ইতিহাসের অন্যায্য মুজিবময়তা দূর করার মাধ্যমে ব্যক্তি মুজিবের ঐতিহাসিক ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের পরিসর তৈরি করা সম্ভব হবে। তেমন পরিস্থিতিতে দেবত্ব আরোপ নয়; ইতিহাসে ব্যক্তি মুজিবের অবদান নিঃসংকোচে স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা থাকবে না।

স্মরণ করা আবশ্যক, ২০২০ সালে মুজিব বর্ষ পালনের নামে শেখ হাসিনা গুজরাটের কসাই, হিন্দুত্ববাদের সর্দার নরেন্দ্র মোদিকে প্রধান অতিথি করে বাংলাদেশে এনেছিলেন। ছাত্র-তরুণরা প্রতিবাদ করায় তাদের হত্যা আর জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছিল। বাংলাদেশের সুশীল সমাজের ‘মূলধারা’ তখন নীরব ছিল। মূলত তারা যে থরে-থরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবেগ দেখিয়ে থাকেন, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ থাকে না, স্রেফ গণবিরোধী ওই চেতনাটুকুই থাকে।

আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং বিকৃত ইতিহাসের নির্জলা শিকারদের ইতিহাসের এসব রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার হিম্মত অর্জন করতে হবে। একক ব্যক্তির মহিমাময় রূপকথাকে ‘ইতিহাস’ নামে চালানোর চেষ্টা ধোপে টিকবে না। শেখ মুজিবের জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না কিসিমের নলা মার্কা বিশ্বাস থেকেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাহাত্তর-পঁচাত্তর রেজিম সম্পর্কে সত্য ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে। ইতিহাসের বি-আওয়ামীকরণ তথা গণতন্ত্রীকরণ মেনে নিয়ে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। আইনি-বেআইনি বল প্রয়োগ করে ইতিহাসের টুঁটি আর চেপে রাখা যাবে না, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অনেক অর্জনের অন্যতম এক অর্জন এ নতুন বাস্তবতা।

আরো এক কারণে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান তাৎপর্যপূর্ণ। এ অভ্যুত্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির অন্যায্য হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও এক বিরাট রায়। দিল্লির এস্টাবলিশমেন্টের জন্য বাংলাদেশের অস্তিত্ব এক উভয় সংকট তৈরি করে। তারা না পারে বাংলাদেশকে গিলতে, না পারে ফেলতে। ফলে বাংলাদেশে তাদের এমন এক শাসকগোষ্ঠী দরকার যারা বিনা প্রশ্নে দিল্লির দাসত্ব মেনে নেবে। দিল্লির সম্প্রসারণবাদী রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল ধরে দিল্লিকে এ সুবিধা দিয়ে আসছে। বিনিময়ে তিন তিনটি অবৈধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে মসনদে টিকিয়ে রেখেছে দিল্লি। জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দিল্লির নাক গলানোর রাস্তা বন্ধ হওয়া শুরু করেছে। অর্থাৎ একাত্তর সালে আমরা যে কারণে স্বাধীন হয়েছিলাম—একটি স্বতন্ত্র ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার উদ্দেশ্যে—চব্বিশে এসে তা বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশ এ সুযোগ হেলায় হারাবে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে আমরা কলহ চাই না; তবে অবশ্যই আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। ইতিহাসের বি-আওয়ামীকরণ এবং আগ্রাসনবিরোধিতার উদযাপন এবারের বিজয় দিবসের প্রধান আকর্ষণ।

সাতচল্লিশ-পরবর্তী দল হিসেবে তখনকার জন্য একটি গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত করতে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছিল। একাত্তরের ইতিহাসকে তারা আত্মসাৎ করেছে। চব্বিশে তারা পরাজিত শক্তি। আওয়ামী লীগের ইতিহাস: ব্যর্থতা, আত্মসাৎ আর পরাজয়ের ইতিহাস। এবারের বিজয় দিবস অন্যান্য বছরের তুলনায় আলাদা, কারণ এবারের বিজয় দিবসের মাধ্যমে আমরা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পেরেছি৷ এ অর্থে, একাত্তর ছিল স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের ইতিহাস; আর চব্বিশ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস। চব্বিশে বিজয়ের মাধ্যমে আমরা একাত্তরকে আওয়ামী দখলমুক্ত করেছি। চব্বিশ তাই একাত্তরে ফেরা।

সারোয়ার তুষার: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক কমিটি