ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের জন্য—বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য—শুধু একটি যুদ্ধ নয়, বরং এটি ইউরোপের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং ঐক্যের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারণকারী একটি সংকটও। এ যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইউরোপ কেবল অর্থনৈতিক জোট নয়, বরং প্রয়োজনে তাকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবেও কাজ করতে হবে। কিন্তু এ বাস্তবতায় ইউরোপের ভেতরেই ইউরোপের ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান।

ইউক্রেন যুদ্ধকে আমরা সাধারণত একটি ইউরোপীয় যুদ্ধ হিসেবেই দেখি—রাশিয়া বনাম ইউক্রেন, ন্যাটো বনাম মস্কো কিন্তু বাস্তবে এ যুদ্ধ ইউরোপের ভেতরের রাজনীতিকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার, কূটনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইউরোপীয় রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট নয়, বরং এটি ২৭টি দেশের একটি রাজনৈতিক ইউনিয়ন, যেখানে বড় সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই সব দেশের সম্মতি প্রয়োজন হয়। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল ছোট দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে—এ নিয়ম কখনো কখনো পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জিম্মি করার হাতিয়ারেও পরিণত হতে পারে, ভিক্টর অরবান ঠিক সেটাই করছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইইউ যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে এগিয়েছে, তখন অরবান প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাধা দিয়েছেন। অরবান কখনো ভেটো দিয়েছেন, কখনো শেষ মুহূর্তে আপত্তি তুলে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করেছেন। এতে ইউরোপের ঐক্য যেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে, তেমনি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ভিক্টর অরবান নিজেকে ইউরোপে ‘শান্তির কণ্ঠস্বর’ হিসেবে মনে করেন এবং তার মতে ইউক্রেন যুদ্ধ একটি অপ্রয়োজনীয় সংঘাত, যা দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার মাধ্যমে শেষ করা উচিত। কিন্তু এ শান্তিবাদী ভাষ্যের আড়ালে যে রাজনীতি কাজ করছে, তা ইউরোপীয় ঐক্যের জন্য গভীরভাবে সমস্যাজনক; কারণ অরবানের অবস্থান শুধু যুদ্ধের বিরোধিতা নয়, বরং এটি কার্যত ইউরোপের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করার একটি কৌশলও।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইইউ যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অরবান তখন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করেছেন। কখনো ভেটো দিয়ে, কখনো শেষ মুহূর্তে আপত্তি তুলে তিনি সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করেছেন। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ইউক্রেনই নয়, বরং ইউরোপের ঐক্যও দুর্বল হয়েছে—কারণ যুদ্ধের সময় সিদ্ধান্তের গতি নিজেই একটি কৌশলগত অস্ত্র। অরবানের অবস্থানকে বোঝার জন্য তার রাশিয়া নীতির দিকে তাকানো জরুরি। হাঙ্গেরি ইউরোপে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোর একটি। প্যাকস-২ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রুশ বিনিয়োগ, দীর্ঘদিনের জ্বালানি চুক্তি এবং পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অরবানের পররাষ্ট্রনীতিকে ইইউর মূলধারা থেকে আলাদা করেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ তার কাছে কেবল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি শক্তির ভারসাম্যের খেলা, যেখানে ভিক্টর অরবান হাঙ্গেরির স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। এ অবস্থান অরবানের ঘরোয়া রাজনীতিতেও কার্যকর। হাঙ্গেরির অভ্যন্তরে তিনি যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শক্তিশালী করেছেন। ‘হাঙ্গেরি যুদ্ধে জড়াবে না’—এ বার্তা সাধারণ ভোটারের কাছে জনপ্রিয়। অথচ তিনি যেটি বলেন না, তা হলো ইউক্রেনের পতন মানে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাব আরো বিস্তৃত হওয়া, যার নিরাপত্তা ঝুঁকি হাঙ্গেরির জন্যও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক। ইইউর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অরবান ইচ্ছাকৃতভাবে ইইউর সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোর দুর্বলতা ব্যবহার করছেন।

সর্বসম্মতিক্রমে তাকে এককভাবে পুরো ইউনিয়নকে জিম্মি করার ক্ষমতা দিয়েছে। ইউক্রেন সহায়তা প্যাকেজ, বাজেট অনুমোদন কিংবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অরবান এ নিয়মকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিনিময়ে তিনি ব্রাসেলসের কাছ থেকে অর্থছাড়, আইনি চাপ শিথিলকরণ কিংবা রাজনৈতিক ছাড় আদায় করেছেন। এ বাস্তবতায় ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহার করার পরিকল্পনা ইইউর ভেতরে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় খুলেছে। কারণ এ পরিকল্পনায় সর্বসম্মতির প্রয়োজন নেই। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব অর্থাৎ অরবান আর এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া আটকে রাখতে পারবেন না।

এ পদক্ষেপ আসলে ইউক্রেনের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ইইউর জন্যও ততটাই; কারণ এটি দেখাচ্ছে যে ইউনিয়ন প্রয়োজনে নিজের কাঠামো রক্ষা করতে প্রস্তুত। তবে এ পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হাঙ্গেরিকে নিয়মিতভাবে পাশ কাটিয়ে গেলে ইইউর ঐক্য নষ্ট হতে পারে, যেখানে কিছু দেশ গভীর একীভূতকরণে এগিয়ে যাবে, আর কিছু দেশ প্রান্তিক অবস্থানে থেকে কেবল বাধা সৃষ্টি করবে। ভিক্টর অরবান এ বিভাজনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অরবানের রাজনীতি তাই ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: একটি রাজনৈতিক ইউনিয়ন কি এমন সদস্য নিয়ে টিকে থাকতে পারে, যে নিয়মের ভেতর থেকেই নিয়মকে দুর্বল করে?

ইউক্রেন যুদ্ধ এ প্রশ্নকে আর তাত্ত্বিক পর্যায়ে রাখেনি, বরং এটি এখন একটি জরুরি বাস্তবতা। ভিক্টর অরবান সেই সদিচ্ছাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে নিয়ম মেনেও নিয়মকে দুর্বল করা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ একদিন শেষ হয়ে হবে—কিন্তু এ যুদ্ধ ইউরোপকে একটি কঠিন প্রশ্ন দিয়ে গেছে: ঐক্য কি কেবল কাগজে-কলমে থাকবে, নাকি প্রয়োজনের সময় তা বাস্তবে রূপ নেবে? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ইউরোপের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ ইউরোপীয় অভ্যন্তরীণ সংকট বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক, কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, অ-সংঘাতমূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এসেছে—যার মূলনীতি হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে: সংকটের সময় নিরপেক্ষতা কোথায় দায়িত্বশীল কূটনীতি, আর কোথায় তা নৈতিক অবস্থানহীনতার রূপ নেয়? সাধারণভাবে ইউক্রেন যুদ্ধকে দেখা হয় রাশিয়া বনাম ইউক্রেন বা ন্যাটো বনাম মস্কোর সংঘাত হিসেবে কিন্তু বাস্তবে এ যুদ্ধ ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও পড়ছে। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—এই সবকিছুর অভিঘাত বাংলাদেশ এরই মধ্যে অনুভব করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৭টি দেশের একটি রাজনৈতিক ইউনিয়ন, যেখানে বড় সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই সর্বসম্মতির প্রয়োজন হয়। এ কাঠামোর উদ্দেশ্য ছিল ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে—এই নিয়ম কখনো কখনো পুরো ইউনিয়নকে জিম্মি করার হাতিয়ারেও পরিণত হতে পারে। ভিক্টর অরবান সেই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইইউ যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে এগিয়েছে, অরবান তখন প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাধা দিয়েছেন। তিনি নিজেকে ‘শান্তির কণ্ঠস্বর’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তার অবস্থান ইউরোপের সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করেছে আর অরবানের রাশিয়া নীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হাঙ্গেরি ইউরোপে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল দেশগুলোর একটি। প্যাকস-২ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি এবং পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অরবানের অবস্থানকে ইইউর মূলধারা থেকে আলাদা করেছে এবং তার কাছে ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন বা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নয়; বরং এটি একটি শক্তির ভারসাম্যের খেলা, যেখানে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাই মুখ্য। এখানেই বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট শিক্ষা রয়েছে।

বাংলাদেশও জ্বালানি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বহু শক্তিধর দেশের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পার্থক্য হলো, বাংলাদেশ কোনো আঞ্চলিক বা সামরিক জোটের ভেতর থেকে সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং ঢাকা সাধারণত জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ভেতরে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে। অরবানের রাজনীতি দেখায়, নিরপেক্ষতার ভাষা ব্যবহার করে কীভাবে একটি রাষ্ট্র বৃহত্তর জোটের নৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সার্বভৌমত্ব, আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করে। ইইউর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থায় সর্বসম্মতির নিয়ম অরবানকে এককভাবে পুরো ইউনিয়নকে জিম্মি করার ক্ষমতা দিয়েছে। বাংলাদেশী পাঠকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা, কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে—ভারতের অনীহা পুরো কাঠামোকেই স্থবির করে রেখেছে।

ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা দেখায় কেবল কাঠামো নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই আসল। এ বাস্তবতায় ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা ইইউর ভেতরে একটি মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে সর্বসম্মতির প্রয়োজন নেই, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। অর্থাৎ ইইউ বুঝতে শুরু করেছে, কখনো কখনো ঐক্য রক্ষার জন্য ভেটো রাজনীতিকে পাশ কাটানো জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এখানেও একটি শিক্ষা আছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান নিতে গিয়ে শুধু ভারসাম্য নয়, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত অস্পষ্টতা স্বল্পমেয়াদে সুবিধা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘নিরপেক্ষতা’ সবসময় শান্তির সমার্থক নয়। কোনো কোনো সময়ে নিরপেক্ষতা আসলে আগ্রাসী শক্তিকেই সুবিধা দেয়। ভিক্টর অরবানের রাজনীতি সেই কঠিন সত্যকেই ইউরোপের সামনে উন্মোচিত করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ একদিন শেষ হবে কিন্তু এ যুদ্ধ ইউরোপকে একটি কঠিন প্রশ্ন দিয়ে গেছে: ঐক্য কি কেবল ঘোষণায় থাকবে, নাকি সংকটের মুহূর্তে তা কার্যকর রূপ নেবে? একই প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক—কারণ পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কূটনৈতিক নীতির শক্তি শেষ পর্যন্ত মাপা হয় সিদ্ধান্তের মুহূর্তে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি গভীর তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: রাজনৈতিক ঐক্য কি কেবল নীতিগত অঙ্গীকারের বিষয় নাকি তা কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল? এই প্রশ্নটি শুধু ইউরোপের জন্য নয় বরং এমন সব রাষ্ট্রের জন্যও প্রাসঙ্গিক, যারা বহুপক্ষীয় কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করেও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়—বাংলাদেশ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সংকট দেখায়, কীভাবে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও সংকটকালে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়মগুলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এ কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতীক হয়ে উঠেছেন, তার ভেটো রাজনীতি ইউরোপীয় ঐক্যকে শুধু বিলম্বিত করেনি; বরং প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সম্মিলিত নিরাপত্তা ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—কারণ বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ, অসংঘাতমূলক পররাষ্ট্রনীতির পথ অনুসরণ করছে, যেখানে নিরপেক্ষতা একটি কৌশলগত অবস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ দেখায়, নিরপেক্ষতা সব সময় সমানভাবে দায়িত্বশীল বা নৈতিক নয়; এর অর্থ ও ফলাফল নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতার অসমতার ওপর।

ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে একটি ক্ল্যাসিক সমস্যা তৈরি করেছে। ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া একটি সমষ্টিগত লাভ—সব রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে কিন্তু এর তাৎক্ষণিক ব্যয় সবার জন্য সমান নয়। হাঙ্গেরির মতো রাষ্ট্রের জন্য নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক খরচ বেশি, তাই তারা সম্মিলিত পদক্ষেপে বাধা দেয়। এটি যৌক্তিক পছন্দের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যাযোগ্য হলেও সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশও বৈশ্বিক রাজনীতিতে অনুরূপ অবস্থার সম্মুখীন। জ্বালানি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো বৈশ্বিক সংকটে স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার অর্থ হতে পারে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ, তবে পার্থক্য হলো বাংলাদেশ সাধারণত সমষ্টিগত উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং সমষ্টিগত সীমিত অংশগ্রহণ বা নীরব কূটনীতির পথ বেছে নেয়। ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখায় সমষ্টিগত উদ্যোগে অংশ না নেয়া আর সমষ্টিগত কার্যক্রম আটকে দেয়া—এই দুইয়ের রাজনৈতিক ও নৈতিক ফলাফল এক নয়।

অরবান নিরপেক্ষতার ভাষা ব্যবহার করেছেন একটি হিসেবে। তার নিরপেক্ষতা কার্যত আগ্রাসী শক্তির জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। এখানে নিরপেক্ষতা একটি কৌশল, নৈতিক অবস্থান নয়। বাংলাদেশের নিরপেক্ষতা ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতির লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সংঘাত এড়ানো কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ দেখায়—সব সংকটে নিরপেক্ষ থাকা মানেই দায়িত্বশীল থাকা নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নীরব সমর্থনের রূপ নিতে পারে, বিশেষত যখন আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে দেখিয়েছে কীভাবে প্রশাসনিক নকশা, সমষ্টিগত উদ্যোগ এবং মৌলিক উদ্যোগ এ তিনটির সমন্বয় ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ইউনিয়ন কার্যকর থাকতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো ভিন্ন কিন্তু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখনো নমনীয় এবং নিরপেক্ষ কিন্তু ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা সতর্ক করে দেয় নিরপেক্ষতা যদি দীর্ঘদিন নীতিগত স্পষ্টতা ছাড়াই বজায় থাকে, তবে তা কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ একদিন শেষ হবে কিন্তু এ যুদ্ধ একটি বৈশ্বিক প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে: নিরপেক্ষতা কখন দায়িত্বশীল কূটনীতি, আর কখন তা নৈতিক অবস্থানহীনতার রূপ নেয়?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভিক্টর অরবানের ভেটো রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য শুধু পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়; বরং এটি একটি নীতিগত সতর্কবার্তা। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে তার ঐতিহ্যগত ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।

প্রথমত, বাংলাদেশকে নিরপেক্ষতার ভাষা ও নৈতিক অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও আগ্রাসনের প্রশ্নে নীতিগত অস্পষ্টতা দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। নিরপেক্ষ থাকা আর নীরব থাকা এক বিষয় নয়—এ পার্থক্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আরো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বহুপক্ষীয় কাঠামোর ভেতরে বাংলাদেশকে আরো সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা নিতে হবে। ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা দেখায়, সমষ্টিগত উদ্যোগকে ভেতর থেকে দুর্বল করা এবং সীমিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের ঝুঁকি কমানো—এ দুইয়ের রাজনৈতিক ও নৈতিক ফল এক নয়। বাংলাদেশ সাধারণত দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়, যা তুলনামূলকভাবে দায়িত্বশীল। ভবিষ্যতে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত—সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত না করে, প্রয়োজন অনুযায়ী শর্তযুক্ত ও নীতিনির্ভর অংশগ্রহণ।

তৃতীয়ত, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে আরো বহুমুখীকরণের দিকে যেতে হবে। হাঙ্গেরির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একক বা অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। বাংলাদেশ যদি জ্বালানি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস ও অংশীদার তৈরি করতে পারে, তবে বৈশ্বিক সংকটের সময় নীতিগত অবস্থান নেয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।

সবশেষে ইউক্রেন যুদ্ধ বাংলাদেশের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—সংকটের মুহূর্তে কেবল ভারসাম্য রক্ষা করাই কি যথেষ্ট, নাকি নৈতিক স্পষ্টতাও কূটনৈতিক শক্তির অংশ? ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিভাজন দেখায়, রাজনৈতিক ঐক্য ও সিদ্ধান্তের সাহস ছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই কার্যকর থাকে না। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো—নিরপেক্ষতা তখনই দায়িত্বশীল কূটনীতি হয়ে ওঠে, যখন তা স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সানজিদা বারী: ডক্টরাল ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো