দেশে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রধান উৎস বিদেশী ঋণ। বৈদেশিক এ ঋণের স্থিতি ও মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ যেভাবে দ্রুত বেড়ে চলেছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগজনক। বিদেশী ঋণের স্থিতি বাড়তে থাকায় পরবর্তী সরকারের ওপর তা পরিশোধের চাপ বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ১১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তা ২০১০-এর তুলনায় প্রায় ছয়গুণ বেশি। বিদেশী ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় দেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বর্তমানে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৬৫৫ ডলার, যা কভিড-পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ।
এ ঋণ বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্পের চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাছবিচারহীন মেগা প্রকল্প, অনিয়ম ও দুর্নীতি। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের আওতায় এ ঋণের সিংহভাগ নেয়া হয় গত আওয়ামী শাসনামলে। বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নেয়া হলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। বরং প্রকল্প ব্যয় অতিরঞ্জিত করে দেখানো, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দেশের আয় ও পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় এ ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয়ও বেশি। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পেই বেশি ঋণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প চালু হলেও তা থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিটার্ন আসছে না। ঋণ করেই এখন ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে।
সামনের দিনগুলোয় সরকারের বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়বে। বড় প্রকল্পগুলোয় গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় সুদ ও আসল দুটোই পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এ চাপ এমন একটি সময়ে আসছে যখন দেশের রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেলেও তা দেশের অর্থনীতি এমন পর্যায়ে নেই যে ঋণ পরিশোধের চাপকে ধারণ করতে পারে। এ অবস্থায় আমাদের বিদেশী ঋণের শর্ত নমনীয় করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে। বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সহনীয়ভাবে ঋণ পরিশোধ করা যায়। পাশাপাশি নতুন করে বিদেশী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে খুব সাবধান থাকতে হবে। আমাদের ঋণ পরিশোধের যে প্রক্ষেপণ করা হয়, সেক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা রয়েছে, সেগুলোকে ঠিক করতে হবে। তা না হলে নীতিনির্ধারকরা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কতটুকু চাপ আসবে, আগাম কোনো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কিনা সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ঋণ পরিশোধের অবস্থা ও রিজার্ভ কোথায় দাঁড়াতে পারে সেই প্রক্ষেপণ বিবেচনায় নিয়ে নতুন ঋণগ্রহণের কৌশল ঠিক করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উন্নয়নের নামে লুটপাটের উদ্দেশ্যে বাছবিচারহীন প্রকল্পে ঋণের কারণেই সরকারের ঋণ এতটা স্ফীত হয়েছে। দেশের বার্ষিক কত বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয় এবং কত ডলার আমাদের সক্ষমতা রয়েছে সেটিও বিবেচনা করা উচিত। শুধু যে বিগত সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে তা নয়, বর্তমান সরকারও পরিচালন ব্যয়ের জন্যও বিদেশী ঋণ নিয়েছে, সেটিও আগের ঋণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে সামনে বিদেশী ঋণের পরিমাণ আরো স্ফীত হচ্ছে।
কোনো দেশে স্বৈরাচার বা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় না রেখে অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য বিদেশীদাতাদের কাছ থেকে যে ঋণগ্রহণ করে তা-ই ‘অডিয়াস ডেট’ বা বিতর্কিত বিদেশী ঋণ। পরবর্তী সময়ে এ ঋণ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। বিশ্বের অনেক দেশ এ ধরনের ঋণের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার এ ঋণ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আইনি কাঠামোও তৈরি হয়েছে। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইকুয়েডর, কিউবা, ইরাক ও আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক, যারা অডিয়াস ডেটকে চ্যালেঞ্জ করে বিদেশী ঋণ মওকুফের সুযোগ গ্রহণ করেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশে বিতর্কিত বিদেশী ঋণগ্রহণের বহু নজির দেখা গেছে। যেসব ঋণ নিয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও আদৌ এসব প্রকল্পের আর্থিক সুফল কতটুকু রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমনকি এসব প্রকল্প যখন শুরু করা হয় তখন দেশে ব্যাপকভাবে আলোচনা ও সমালোচনা উঠেছিল। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের মেগা প্রকল্পগুলোয় দুর্নীতি ও অনিয়মের যেসব তথ্য-উপাত্ত হাজির করা হয়েছে তাতে সরকার চাইলে এসব ঋণকে অডিয়াস ডেট হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে ঋণদাতা দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির উৎকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করতে পারে বাংলাদেশ।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই ঋণ নিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আমাদের আছে কিনা এবং আমরা সঠিক প্রকল্পে ঋণ নিয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করছি কিনা। এমন কিছু প্রকল্পে ঋণ নেয়া হয়েছে সেসব প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেশের ঋণ শোধ করতে হবে ডলারে (বিদেশী মুদ্রা)। তার জন্য প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল দেশ। রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশে ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশী উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেয়া কিছুটা কমেছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক তথা গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বিদেশী ঋণের স্থিতি না বেড়ে উল্টো প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার কমেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিদেশী ঋণের স্থিতি ১১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। এতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়ছে। কিন্তু মেট্রোরেল ছাড়া পদ্মা রেল সংযোগ ও কর্ণফুলী টানেল থেকে তেমন রিটার্ন আসছে না। যে আয় আসছে তার চেয়ে বেশি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এদিকে বিদেশী ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে সুদ বাবদ ব্যয়। কিন্তু যে ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে সেটিও বেশি মনে হতো না, যদি ওইসব ঋণের সদ্ব্যবহার করা যেত ও অর্থনীতি যদি গতিশীল হতো। বিগত সরকারের আমলে নেয়া ঋণের প্রকল্পে অনেক অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে ঋণ পরিশোধে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৫৫ শতাংশ এবং বিদেশী ঋণ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত থাকলে সেটি নিরাপদ। যেভাবে ঋণের বোঝা বাড়ছে, সেটি এভাবে চলতে থাকলে ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার। আমাদের জিডিপির আকার নিয়েও প্রশ্ন আছে। সেক্ষেত্রে ঋণের দিক দিয়ে আমরা হয়তো এখনই নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছি কিংবা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে চলে যেতে পারি। ঋণের নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক নিচে থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের অভাবে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ঋণ পরিশোধে ডলারের প্রয়োজন। আর ডলারের প্রবাহ বাড়াতে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স ভূমিকা রাখে। এজন্য আমাদের রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো দরকার। ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবেলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ রফতানি বৈচিত্র্যকরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে।










