দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে একটা বড় সংকট কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া। যে কারণে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভালো উৎস হতে পারত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাত। কিন্তু এ খাতের বিকাশ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো খাতটিতে ঋণপ্রবাহ তুলনামূলক কম, অর্থাৎ অর্থায়ন ঘাটতি। বর্তমানে এ খাতে ঋণ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২৮০ কোটি ডলার। এছাড়া এ খাতের উদ্যোক্তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া। যদিও তাদের মধ্যে ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা কম। এমনকি প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যেও ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রবণতা কম দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের ব্যাংক খাতে ১ কোটি টাকার কম এমন ঋণের মধ্যে ১৬ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি এমন ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপির খাতায় উঠেছে।

গ্রাহকপ্রতি এসএমই ঋণের পরিমাণ মাত্র ১ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। যদিও গত মার্চে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০২৯ সালের মধ্যে তাদের মোট ঋণের কমপক্ষে ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বরাদ্দ দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং ঋণপ্রবাহ কমছে।

অভিযোগ রয়েছে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহী। এ খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝে ছোট অংকের ঋণ বিতরণে যে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা এবং সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, সে তুলনায় সমপরিমাণ অর্থ বৃহৎ ঋণগ্রহীতাকে দিলে তা ব্যাংকের জন্য বেশি লাভজনক বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের বেশির ভাগ মনে করেন। আবার অনেক উদ্যোক্তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা ট্রানজেকশন রেকর্ড নেই, যা ব্যাংক ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত। এছাড়া জামানতভিত্তিক ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়াও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা। আবার অনেক উদ্যোক্তা ঋণের এসব শর্তাবলি সম্পর্কেও সেভাবে অবগত নন বা বোঝাপড়ায় ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে তাদের অনেকেই সঠিকভাবে আবেদন করতে পারেন না। তবে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, ব্যাংকগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। আর এনজিও বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তাদের মাঝে যে ঋণ বিতরণ করে তার সুদহার হয় বাড়তি। এসব কারণে সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহের গতি বেশ শ্লথ।

অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যে খাতে বেশি অর্থায়ন করেছে, সে খাত থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী। কেবল ঊর্ধ্বমুখীই নয়, পৃথিবীতে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ। এর কারণ ঋণ বিতরণের সময় ব্যাংকগুলো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত গত সরকারের দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাত কার্যত বড় শিল্পোদ্যোক্তাদের সীমাহীন দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন, যার বড় অংশই ফেরত আসেনি। কৃত্রিমভাবে এসব খেলাপি ঋণ লোক চক্ষুর আড়ালে রাখা হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তার প্রকৃত পরিস্থিতি উন্মোচন হয়েছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের ৩৫ শতাংশের বেশি ঋণই খেলাপির খাতায় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

এর বিপরীতে সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা নানামুখী অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যাংক নির্বাহী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এ খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দিতে আগ্রহী থাকেন এবং বাস্তবেও তাদের থেকে ঋণ আদায়ের হার বেশি। সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, নিবিড় তদারকি ও উপযুক্ত ঋণ কাঠামোর কারণে ক্ষুদ্র ঋণ খেলাপির হার কম। কিন্তু এর পরও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হওয়াটা হতাশাজনক। জামানত, কাগজপত্র, শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনীহা এবং নীতিগত জটিলতায় বহু প্রান্তিক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হবেন, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেখানে এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ আদায়ের হার ৯৮-৯৯ শতাংশ, সেখানে মাত্র ৫-১০ লাখ টাকার ঋণের অভাবে বহু উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। অথচ বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আন্তরিকতা ও শর্তাবলি নমনীয়করণে কোনো ঘাটতি থাকে না। ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি ও জবাবদিহিহীনতার নজিরই খেলাপি ঋণ।

ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে ব্যাংক খাতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ বঞ্চিত হবেন না। এটি ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্যও প্রয়োজন। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে ব্যাংক ঋণের বড় অংশ শিল্প ও ব্যবসা খাতে কেন্দ্রীভূত এবং খেলাপি ঋণের বেশির ভাগও এ দুই খাতেই। তাই ব্যাংকের নিজস্ব স্বার্থেও তাদের ঋণ কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। এজন্য উদ্যোক্তাদের কীভাবে সহজ শর্তে অর্থায়ন বাড়ানো যায় তা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া দেশের শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের বড় অংশ হলো সিএমএসএমই। এত বৃহৎ খাতের অর্থায়নের বিষয়টি উপেক্ষা করে টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা বেশ কঠিন হবে। এ বাস্তবতায় জামানতবিহীন বা আংশিক জামানতভিত্তিক ঋণ, অস্থাবর সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে গ্রহণ ও ট্রেডলাইসেন্সের শর্ত শিথিল করা, ডিজিটাল মাধ্যমে সহজ আবেদন প্রক্রিয়া চালু ইত্যাদির মাধ্যমে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আনা যেতে পারে। বর্তমানে অর্থনীতিতে বিনিয়োগেও এক ধরনের স্থবিরতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজতর করা গেলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।