বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। জনসংখ্যার এ বিশাল অংশকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন কঠিন। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই বিকশিত হয়েছে। সেই অনুপাতে বাড়ছে না নারীর অংশগ্রহণ। কর্মে প্রবেশের আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কৌশল জানা না থাকায় নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন বলে সিপিডি আয়োজিত এক সংলাপে উঠে এসেছে। নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে জেলা পর্যায়ে কিশোরী ও তরুণীদের জন্য চাকরির বাজার অনেক চ্যালেঞ্জিং। এ কারণে শহুরে নারীদের চেয়ে গ্রামীণ নারীরা পিছিয়ে রয়েছেন। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেয়া, শিল্পায়নের স্থানীয়করণ ও ডিজিটাল সাক্ষরতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে নারীদের এখনো কিছু বাধা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের বেতনবৈষম্য রয়েছে, নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। তাই শ্রমবাজারে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ বাড়াতে বেতনবৈষম্য কমানোসহ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গত মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংলাপে একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। কিশোরগঞ্জ জেলাকে কেস স্টাডি ধরে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। মোট ১ হাজার ৭২৮ কিশোরী ও যুবতীর ওপর পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৪ শতাংশ যুবতীই চাকরি খুঁজছেন। তবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও কৌশল জানা না থাকায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ কিশোরী ও যুবতীই বলেছেন, তারা উপার্জনের উপায় খুঁজতে সহযোগিতা চান। তবে কীভাবে কী করতে হবে তা জানেন না তারা। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারীরা যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন সেগুলোকে শনাক্ত করা দরকার। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণসহ কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
দেশে শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটেছে। শ্রমবাজার ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। পুরুষের তুলনায় আনুষ্ঠানিক খাতে এখনো নারীর অংশগ্রহণ সেভাবে বাড়ছে না। কিন্তু কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান বাড়ছে। তবে এ খাতের নারীরা শ্রমের মূল্য পান না। চাষাবাদ থেকে শুরু করে ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনকাজেও তারা অংশ নিচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ ও পুরুষের মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তারা মালিকানায় পিছিয়ে রয়েছেন। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি না থাকায় চারটি ক্ষেত্রে তারা প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা; দ্বিতীয়ত, খাসজমি লিজ না পাওয়া; তৃতীয়ত, সরকারি প্রণোদনা এবং চতুর্থত, যথাযথ মজুরি না পাওয়া। দেশের জিডিপিতে বর্তমানে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর গৃহস্থালি ও অবৈতনিক কৃষিকাজের আনুমানিক মূল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা। এ হিসাবে জিডিপিতে নারীর অবদান হওয়ার কথা ৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করা হয় না। তৈরি পোশাক খাত, ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন শিল্প খাতেও নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য বেড়েছে। গত এক বছরে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারী-পুরুষের বৈষম্য আরো প্রকট হয়েছে। এ চিত্র বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা সূচকে উঠে এসেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ সালের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের চেয়ে ৪০ ধাপ পিছিয়ে গিয়ে ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ৯৯তম স্থানে ঠেকেছে। যদিও ২০২৩ সালের সূচকে ১৪৬টি দেশের মধ্যে ১২ ধাপ এগিয়ে ৫৯তম অবস্থানে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ, ২০২২ সালে ছিল ৭১ নম্বরে। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে এবং সুযোগ সৃষ্টিতে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতেও বেড়েছে বৈষম্য।
শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এর কারণ স্বল্প মজুরি ও কাজের নিরাপত্তাহীনতা। অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের আয়বৈষম্য, বৈষম্যমূলক আচরণ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক খাত বা মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থায় আয় ও আয়ের নিরাপত্তা তুলনামূলক বেশি। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। দেশে সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদেও নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। এসব ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সব খাতেই নারীদের জন্য নিরাপদ, সুষ্ঠু ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলো হলো নারীরা যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন সেগুলোকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিয়ে ভালো উদাহরণ তৈরি করা; প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নারীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা; প্রতিষ্ঠানগুলোয় নারীর জন্য জেন্ডারবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা, নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া।
শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে ও নারীর উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে মনোযোগ দেয়া দরকার। নারী-পুরুষের যে আয়বৈষম্য বিদ্যমান তা দূর করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চত করা অপরিহার্য। কর্মক্ষেত্রে কোনো নারী হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে বাল্যবিবাহসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরী। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীদের সাবলীল ও সক্ষম করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণের পথ সুগম করতে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে যে আয়বৈষম্য রয়েছে তা দূরীকরণে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।










