বর্তমানের দ্রুত বিকাশমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যেকোনো শিল্পের টিকে থাকার প্রধান যোগ্যতা হলো শিল্পটির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার যোগ্যতা অর্জন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে টিকে থাকার মতো সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য থাকা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পোশাক খাতে একটি সুগঠিত এক্সিট পলিসি বা ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার নীতির প্রয়োজনীয়তা প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। এ রকম একটি নীতি শুধু যে সংগ্রামরত শিল্পগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করে তা নয়; বরং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে, কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করে, শিল্প খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। বাংলাদেশে উপযুক্ত এক্সিট পলিসি না থাকার দরুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে আর্থিক সংকটের ঝুঁকিতে পড়ছে, ফলে অর্থনীতি ক্ষতি ও স্থবিরতার স্থায়ী চক্রে পড়ছে।

এক্সিট পলিসি কী: এক্সিট পলিসি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা যেন কোনো উদ্যোক্তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকটে নিঃস্ব হওয়ার উপক্রম হলে সহজভাবে ব্যবসা থেকে প্রস্থান করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এ ব্যবস্থা উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য দক্ষতার সঙ্গে সম্পদ ব্যবহার/পুনর্নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। একই সঙ্গে এক্সিট প্রক্রিয়া ব্যবসা নির্বিঘ্নভাবে স্থানান্তর করার পাশাপাশি, কর্মী এবং ঋণদাতাসহ স্টেকহোল্ডারদের ওপর নেতিবাচক প্রভাবগুলো কমিয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি সুগঠিত এক্সিট পলিসি প্রণয়ন করে পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবেলা করা যেতে পারে। আর্থিক বাধ্যবাধকতা নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে ঝুঁকি কমানো এবং শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা, সর্বোপরি শিল্পের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখা—প্রতিটি ক্ষেত্রে এক্সিট পলিসি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এ রকম তাৎপর্য থাকা সত্ত্বেও পোশাক খাতের জন্য এ পর্যন্ত কোনো এক্সিট পলিসি প্রণয়ন করা হয়নি এবং এ নীতির অভাব পোশাক খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে।

এক্সিট পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন

এক্সিট পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো অন্তরায় রয়েছে। অন্যতম অন্তরায় হলো আমাদের সুনির্দিষ্ট এক্সিট পলিসি নেই, সেটা পলিসি আকারে প্রণয়ন করতে হবে। আর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার, সর্বোপরি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।

শিল্প কখনো কখনো বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে প্রকৃত বিরূপ আর্থিক অবস্থায় পড়ে ক্রমাগতভাবে লোকসানে পরিচালিত হতেই পারে। এ রকম একটি ক্ষেত্রে এক্সিট পলিসি থাকলে উদ্যোক্তা ব্যবসা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারারও (মাইন্ড-সেট) একটা ইস্যু আছে।

সাধারণভাবে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসাগুলোকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তারা স্ব-উদ্যোগে যেকোনোভাবেই হোক, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে/চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। অধিকাংশ উদ্যোক্তার মধ্যে এমন প্রবণতা কাজ করে যে যখন তারা দেখেন তাদের প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে ধ্বংসের প্রান্তে চলে যাচ্ছে, তখন ডুবে যাওয়ার আগে শেষ খড়খুটো ধরে বেঁচে থাকার আশায় আবেগতাড়িত হয়ে তারা ক্ষতিতে নিপতিত হওয়া ব্যবসায়ে আরো বিনিয়োগ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং এ প্রবণতা সমস্যাকে আরো জটিলতর করে তোলে। ফলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের ওপর অযাচিত চাপ, দেউলিয়া হওয়ার মতো বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একটি সহজ সুগঠিত এক্সিট পলিসি ব্যবসা থেকে সরে আসার জন্য প্রক্রিয়াগত এবং মর্যাদাপূর্ণ পথ প্রদান করে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি কমাতে ও আবেগগত বিপর্যয় প্রশমনে সাহায্য করতে পারে।

দুটো বাস্তব অভিজ্ঞতা: পোশাক খাতের অনেক উদ্যোক্তা এক্সিট পলিসি না থাকার দরুন ব্যবসার দুর্বিপাকে পড়ে নিঃস্ব হয়ে বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ৪০ বছরের একটি স্বনামধন্য পোশাক কারখানার মালিককে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে—ক্রেতা নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করার কারণে কীভাবে চোখের সামনে তিলে তিলে গড়ে ওঠা পারিবারিক ব্যবসার পতন ঘটেছে। কারখানা পরিচালনায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ক্রেতার দিক থেকে সুরক্ষা না থাকা এবং ঝুঁকি প্রশমন নীতির অভাবে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এর পরের ঘটনাটি ছিল আরো দুঃখজনক, নীতি না থাকার দরুন জীবন দিয়ে মূল্য পরিশোধ: মাত্রাতিরিক্ত আর্থিক চাপ, মানসিক চাপ সইতে না পেরে ওই পরিবারের দুই সদস্য আত্মহত্যা করে ব্যবসায় ব্যর্থতার মাশুল দেন। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশে শিল্প-কারখানার মালিকরা যে প্রক্রিয়াগতভাবে দুর্দশাগ্রস্ততার সম্মুখীন হয়েছেন, তারই প্রতিফলন।

একটি এক্সিট পলিসি থাকলে তা পরিবারটিকে, এমনকি এ রকম আরো অনেককে সংকট মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে পারত। এক্সিট পলিসি আর্থিক বাধ্যবাধকতা মোকাবেলা, শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা থেকে সরে আসার জন্য পথ বাতলে দিয়ে বিয়োগান্তক পরিণতিগুলো রোধ করতে পারত।

শিল্পে সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিত করা: এক্সিট পলিসির বাস্তবায়ন শুধু সংগ্রামরত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য করার জন্য নয়; বরং শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে এবং অভিযোজিত শিল্পে পরিণত হতে উৎসাহিত করারও বিষয়। এটি ব্যবসায় থেকে প্রস্থান করার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি প্রবর্তন, সম্পদকে দক্ষতার সঙ্গে পুনরায় বরাদ্দ এবং নতুন, উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসার জন্য পথ তৈরি করে দেয়। এ অভিযোজনযোগ্যতা পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে খাতটি কিনা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বাজারে টিকে থাকা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে চলেছে।

উপরন্তু একটি এক্সিট পলিসি শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করে, ব্যবসা বন্ধের সময় তাদের অধিকারগুলোর সুরক্ষা প্রদান করে। পোশাক শিল্প যা লাখো মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে, তাকে সাসটেইনেবিলিটির দিকে এগিয়ে নিতে একটি সহজ ও সুগঠিত এক্সিট পলিসি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন অপরিহার্য পদক্ষেপ।

পোশাক শিল্পে এক্সিট পলিসি প্রণয়ন সময়ের দাবি মাত্র: তৈরি পোশাক খাতের যেসব উদ্যোক্তা প্রতিকূলতার জন্য টিকতে পারছেন না, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের জন্য নিরাপদ ‘এক্সিট পলিসি’ প্রণয়নের দাবি জোরেশোরে উঠেছে—এ দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। ব্যবসায়ী নেতা, নীতিনির্ধারক এবং শিল্প স্টেকহোল্ডারদের অবশ্যই একত্র হয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে শিল্পের জন্য এ ধরনের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।

অন্যান্য দেশে যে ধরনের এক্সিট পলিসি আছে, আমাদের এখানেও একই রকমের একটি এক্সিট পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে তা শুধু সংগ্রামরত ব্যবসাগুলোকে নিরাপত্তাই প্রদান করবে না; বরং শিল্পের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার মতো সহ্যশক্তিসম্পন্ন শিল্প গড়ে তোলার জন্য পথ প্রশস্ত করে দেবে। পোশাক খাতকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সহযোগিতা করা এবং শিল্পে সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিত করার জন্য এ মুহূর্তে এক্সিট পলিসি প্রণয়নের দাবিকে অগ্রাধিকার দেয়ার সময় এসেছে।

অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে শিল্পের স্বাস্থ্যমান ভালো রাখার জন্য একটি সুগঠিত এক্সিট পলিসির বাস্তবায়ন এ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক খাত কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্প খাত, শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা, সর্বোপরি, অর্থনীতির অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্য পদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনই।

মো. মহিউদ্দিন রুবেল: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক