যে কারণে একটি স্থিতিশীল, সুষ্ঠু পরিবেশে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পরীক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। তবে বৃষ্টি ও বন্যার মতো দুর্যোগ প্রতিরোধ করে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া যে সম্ভব নয় এটা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে যেন পরীক্ষার্থীদের পড়তে না হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষে একটি কাজ করা সম্ভব। সরকার স্থানীয় মৌসুম বিচেনায় রেখে পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারে। দুঃখজনকভাবে দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময়সূচিতে এ ধরনের বিবেচনার কোনো প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এবারো এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালে টানা ভারি বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগের বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে কিছু পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীর জলাবদ্ধতা মাড়িয়ে, নৌকায় চেপে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের নজির পাওয়া গেছে। পরীক্ষার ভোগান্তি ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ আন্দোলন পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ জুন থেকে ১৩ জুলাই। অর্থাৎ আগামীতেও বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই পরীক্ষায় বসতে হবে শিক্ষার্থীদের। এতে সে সময়ও অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের পড়ার আশঙ্কা রয়েছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত দেশের মৌসুম পরিস্থিতি মাথায় রেখে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করা।
ষড়ঋতুর দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। স্থানীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে অনেক ঋতুর বৈচিত্র্য ম্রিয়মাণ হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের কালবৈশাখী, বর্ষাকালের অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগগুলো নিয়মিত ঘটনা। আবার সাম্প্রতি বছরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে এসব দুর্যোগ নতুন করে বিভিন্ন অঞ্চলে হানা দিচ্ছে। সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে, জুন, জুলাই ও আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব দুর্যোগ বেশি ঘটে। সুতরাং এমন সময়ে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে তাতে ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টি অনুমেয়। এর পরও স্থানীয় মৌসুম উপেক্ষা করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়াটা অবিবেচনাপ্রসূত।
এটা সত্য যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণ এবং এইচএসসির সময়ও এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিরোধিতা করা হয়। ওই সময় তাদের বক্তব্য ছিল, আগামী বছরেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাবে না, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
করোনাকাল, শিক্ষাবর্ষের জট, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিলম্বিত এসএসসি পরীক্ষা ও কলেজে ভর্তি এসব বিবেচনায় অভিভাবকদের উদ্বেগ যথাযথ। সব মিলিয়ে শিক্ষা ক্যালেন্ডার কয়েক বছর ধরে ভারসাম্য হারিয়েছে। ফলে পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্গঠনে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই বর্ষাকালে পরীক্ষা নেয়াটাকে যৌক্তিক করে তোলে না। কেননা এটা নতুন করে শিক্ষার্থীদের বিপাকের মধ্যে ফেলছে। সুতরাং এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণায়লকে আরো ভাবতে হবে এবং অভিভাবকদেরও আন্তরিক হতে হবে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল কিংবা উত্তরাঞ্চলে বর্ষাকালে বন্যা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নগর জলাবদ্ধতার প্রবণতা বাড়ছে। অর্থাৎ যে সময়টিকে পরীক্ষার জন্য বেছে নেয়া হচ্ছে, সেটিই ক্রমে সবচেয়ে অনিশ্চিত সময়ে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যদি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়, তবে পরীক্ষার সময় নির্ধারণেও জলবায়ু ঝুঁকিকে একটি মৌলিক বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
পরীক্ষা স্থগিত করা এক্ষেত্রে কোনো সমাধান নয়। শেষ মুহূর্তে স্থগিতাদেশ জারি হলে শিক্ষার্থীরা আবার নতুন করে প্রস্তুতির চাপে পড়েন। আবার পরীক্ষা চালিয়ে নিলেও জলাবদ্ধতা, ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বহু শিক্ষার্থী অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। কোনো কোনো এলাকায় পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে, আবার কোথাও ভেজা পোশাকেই পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। এটি শুধু দুর্ভোগ নয়; এটি পরীক্ষার সমতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নও।
এ কারণে এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষা দুর্যোগপ্রবণ মৌসুমের বাইরে আনা যায়। এটি এক বছরে সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করা উচিত। প্রয়োজনে কয়েক বছর ধরে সেশন সামঞ্জস্য করে নতুন ক্যালেন্ডারে স্থিতিশীল হওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা, বিকল্প পরীক্ষা কেন্দ্র, জরুরি পরিবহন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্পষ্ট নীতিমালা এবং আবহাওয়া পূর্বাভাসের সঙ্গে সমন্বিত পরীক্ষা ব্যবস্থাপনাও গড়ে তুলতে হবে।









