আমরা প্রায়ই বলি, তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের প্রতিযোগী সক্ষমতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি নীতি–সহায়তা ও তার কার্যকর বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। সদ্য প্রকাশিত রফতানি তথ্য দেখলে কথার সঙ্গে কাজের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রতিযোগী হিসেবে সাধারণত চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের কথা বলা হয়। কিন্তু একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—এ দেশগুলোর কোনোটিই আমাদের মতো এত একমুখীভাবে তৈরি পোশাক রফতানিনির্ভর নয়। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মোট রফতানির মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অংশ যথাক্রমে প্রায় ৪ দশমিক ৩, ৭ দশমিক ৬, ৩৬ দশমিক ৭, ২ দশমিক ২, ২ দশমিক ৩ ও ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে এ হার ন্যূনতম ৮০ শতাংশ—অনেক সময় এরও বেশি। অর্থাৎ একক একটি শিল্পের ওপর আমাদের নির্ভরতার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
বাংলাদেশ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখার মতো বৈচিত্র্যময় ও বৃহৎ শিল্পভিত্তি এখনো গড়ে ওঠেনি। বাস্তবে তৈরি পোশাক (আরএমজি) ছাড়া এমন আর কোনো শক্তিশালী খাত নেই, যা একদিকে আমাদের রফতানি আয়ের বড় অংশ বহন করছে। অন্যদিকে অনুন্নত ও আধা–দক্ষ বিশাল শ্রমশক্তির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। এ শিল্পকে কেবল তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে বড় ভুল হবে। পর্যটন, ব্যাংক, বীমা, লজিস্টিকস, বন্দর, ট্রান্সপোর্ট ও পশ্চাৎমুখী শিল্পসহ অসংখ্য খাত আরএমজিকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। শুধু কারখানার ভেতরের উৎপাদন দিয়ে এ খাতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব পরিমাপ করলে পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। নতুন শিল্পভিত্তি তৈরি না হলে এত বিপুল জনশক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এ বাস্তবতায় আরএমজি খাতকে শক্ত রাখার পাশাপাশি বিকল্প শিল্প খাত গড়ে তোলার কৌশল এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার শর্ত। একক একটি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ও সামাজিক—উভয় দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।
এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের আরো দক্ষ, উৎপাদনশীল ও প্রস্তুত থাকতে হবে। তা না হলে আজ যে ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মুখে খাতটি পড়ছে, ভবিষ্যতে তা আরো ঘন ঘন ও তীব্রভাবে ফিরে আসবে। আমাদের অধিকাংশ প্রতিযোগী দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যাংক সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম। আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি কম—কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে। পাশাপাশি ভিয়েতনাম বা অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের একজন শ্রমিক যে পরিমাণ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারেন, আমরা এখনো সেই পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারিনি। কোনো একপর্যায়ে এ খাত সংকুচিত হলে বা বড় ধাক্কা খেলে সেটি সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির এখনো নেই—নিকট ভবিষ্যতে নাও থাকতে পারে। তাই যতদিন না বিকল্প শক্তিশালী শিল্প খাত গড়ে ওঠে, তত দিন আরএমজিকে ঘিরে সর্বোচ্চ মনোযোগ ও সহায়তা অব্যাহত রাখা ছাড়া বাস্তবসম্মত বিকল্প খুব কম।
কীভাবে আমরা বেশি প্রতিযোগী হতে পারি?
শিল্পোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন: ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্পষ্ট শিল্পনীতির মাধ্যমে কারখানা আধুনিক করছে এবং নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ইনস্টিটিউটভিত্তিক প্রোগ্রামের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছে। দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া উৎপাদনশীলতা ও উচ্চমূল্যের পণ্য অর্জন সম্ভব নয়—এ বাস্তবতা তারা অনুধাবন করেছে। চীন ও ভারত প্রযুক্তি ও অটোমেশনের জন্য আলাদা তহবিল গড়ে তুলেছে। আমাদেরও প্রযুক্তি ও অটোমেশন উন্নয়ন–তহবিল প্রয়োজন, যাতে কারখানাগুলো সহজ শর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং ও গবেষণাভিত্তিক ব্যবসায় জোর না দিলে সামনে এগোনো কঠিন হবে। বিদ্যমান কারখানা ও শ্রমশক্তির মধ্যেই যদি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাহলে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে রফতানি বৃদ্ধি পাবে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও লজিস্টিকস—এ খাতগুলোয় আমরা এখনো অধিকাংশ প্রতিযোগীর তুলনায় পিছিয়ে। অবকাঠামো যত শক্তিশালী হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও তত টেকসই হবে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখে। নির্দিষ্ট সময়ে মান বজায় রেখে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যচুক্তি: বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও অবকাঠামো আধুনিকায়নের গতি বাড়ে। এর জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর সুবিধা, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পূর্বানুমেয় ও ধারাবাহিক নীতিমালা। একই সঙ্গে বড় বাজারগুলোর সঙ্গে সুপরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কছাড় ও কোটা–সুবিধা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগী সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভিয়েতনাম ধারাবাহিকভাবে এ কৌশল অনুসরণ করেছে; তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
গণ্ডির বাইরে চিন্তা ও ইনসেনটিভ–নীতি পুনর্বিবেচনা: আমরা প্রায়ই নগদ প্রণোদনার কথা বলি, কিন্তু সহায়তা মানে শুধু ক্যাশ নয়। বিশ্ববাজারে গার্মেন্টসের বড় অংশ দ্রুত ম্যান–মেড ফাইবার (এমএমএফ)-ভিত্তিক পণ্যে সরে যাচ্ছে, অথচ আমরা এখনো তুলনামূলকভাবে কটননির্ভর। আমাদের পশ্চাৎমুখী শিল্পের বড় অংশ কম মূল্যের কটন–পণ্যে আটকে আছে, যেখানে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে উচ্চমূল্য ও এমএমএফ-ভিত্তিক পণ্যের দিকে।
তাই ইনসেনটিভ–নীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে—এমএমএফ-ভিত্তিক পণ্য ও উচ্চ ভ্যালু–অ্যাডেড পণ্য কটনভিত্তিক অবকাঠামো আমাদের এখন যথেষ্ট শক্ত; সেখানে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝোঁক বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এমএমএফ-ভিত্তিক পশ্চাৎ শিল্প সম্প্রসারণ জরুরি। স্থানীয় ভ্যালু–অ্যাড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ যত বেশি হবে, সে ধরনের উৎপাদনে ইনসেনটিভ দিলে অর্থনীতি ও আরএমজি—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভবিষ্যতে এ রূপান্তর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নির্ধারক হবে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কূটনৈতিক সক্ষমতা। আগামী সরকারের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার—বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা, পূর্বানুমেয়তা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন—আরএমজি খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগী সক্ষমতা নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ ও বড় ক্রেতা বাজারগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ও সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা গেলে বিদেশী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাজার–অ্যাকসেস—এ তিন ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সঠিক নীতি–সহায়তা ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতি একসঙ্গে কাজ করলে তা বাংলাদেশের আরএমজি খাতের জন্য একটি সত্যিকারের ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠতে পারে।
মো. মহিউদ্দিন রুবেল: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লি.










