বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি সাফল্যের গল্প বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তবে এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল অতীতের অর্জনে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। বরং বিশ্ববাজারের বর্তমান ধারা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ক্রেতাদের বদলে যাওয়া চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়াই এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশ মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের পোশাক রফতানি বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে এবং শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ছাড়া বিকল্প নেই।

যদি আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি পণ্যের চিত্র বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে ট্রাউজার, শার্ট, টি-শার্ট, সোয়েটার ও জ্যাকেট—এ পাঁচ পণ্যই রফতানির সিংহভাগ দখল করে রেখেছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব পোশাকের বড় অংশই তৈরি হচ্ছে তুলাভিত্তিক সুতা ও কাপড় দিয়ে। পাশাপাশি রফতানি বাজারও মূলত ছয়টি গন্তব্যে সীমাবদ্ধ—যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া।

অথচ বৈশ্বিক পোশাক বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক পোশাক বাজারে তুলা থেকে তৈরি পোশাকের অংশ ৪০ শতাংশ, আর মানবসৃষ্ট বা কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার বা এমএমএফ) থেকে তৈরি পোশাকের অংশ ৩৯ শতাংশ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এমএমএফ পোশাকের রফতানি কিছুটা বেড়েছে। তবু এ বিশাল বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা এখনো মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি। যেখানে চীন একাই প্রায় ৪০ শতাংশ ও ভিয়েতনাম ১০ শতাংশ বাজার দখল করে রেখেছে। এ পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশ একটি বড় সম্ভাবনাময় সুযোগ হাতছাড়া করছে।

ভোক্তাদের পছন্দ ও চাহিদার পরিবর্তন হয়ে থাকে। বিশেষ করে কভিড-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক ভোক্তাদের পছন্দে বড় পরিবর্তন এসেছে। আরাম, দীর্ঘস্থায়িত্ব, সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের কারণে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জেন-জি প্রজন্মের কাছে কৃত্রিম তন্তু থেকে তৈরি পোশাক বর্তমানে বেশি গ্রহণযোগ্য। একসময় কৃত্রিম তন্তুর পোশাককে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখা হলেও আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নে আজ পলিয়েস্টার ও ভিসকস তুলার মতোই নরম ও আরামদায়ক হয়ে উঠেছে। ফলে ‘আরাম বনাম কৃত্রিম’ এ পুরনো বিতর্ক কার্যত গুরুত্ব হারিয়েছে।

এখানে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া জরুরি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত তুলার প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তুলা ও তুলাভিত্তিক কাপড় আমদানি করতে হয়। এমন প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম তন্তুর দিকে ঝুঁকলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করে তোলা যাবে।

পরিবেশের দিক থেকেও তুলার তুলনায় কৃত্রিম তন্তু অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাজনক। এক কেজি তুলা উৎপাদনে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজন হয় ৮-১০ হাজার লিটার পানি। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি তুলার শার্ট তৈরি করতেই প্রায় ২ হাজার ৭০০ লিটার পানি লাগে। বিশ্ব যখন পানির সংকট ও পরিবেশ সুরক্ষার দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, তখন তুলনামূলক কম পানি ব্যবহারের কারণে কৃত্রিম তন্তু বৈশ্বিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতিকাঠামো এখনো কৃত্রিম তন্তুর অনুকূলে নয়। তুলা আমদানিতে যেখানে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে, সেখানে কৃত্রিম তন্তু আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হয়। এ বৈষম্য দ্রুত দূর না করলে বৈশ্বিক এমএমএফ বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই কৃত্রিম তন্তুর ওপর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলা। বর্তমানে এমএমএফ খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। সিনথেটিক ফাইবার উৎপাদন অত্যন্ত জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়া এ খাতে টেকসই বিনিয়োগ সম্ভব নয়। নতুন কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানায় আলাদা গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এখানে বিদেশী বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কনীতির কারণে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী বিকল্প উৎপাদন গন্তব্য খুঁজছেন। বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিতে তুলনামূলক কম শুল্ক সুবিধা থাকায় দেশটি হতে পারে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি অভিজ্ঞ চীনা এমএমএফ উৎপাদকদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এগিয়ে আসেন, তবে শুধু পুঁজি নয়—প্রযুক্তি স্থানান্তর, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা উন্নয়নও সম্ভব হবে।

সরকার এখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে। শিল্প কূটনীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশী পোশাক ও টেক্সটাইল উদ্যোক্তাদের নিয়ে চীনে বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠানো, আবার চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো এবং পারস্পরিক সংলাপ আয়োজনের মাধ্যমে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা ‘এমএমএফ বিনিয়োগ সহায়তা সেল’ গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এক জায়গা থেকেই জমি, ইউটিলিটি সংযোগ, অনুমোদন ও প্রশাসনিক সহায়তা পেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে যে বাংলাদেশ কৃত্রিম তন্তু খাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প অতীতে বহু সংকট মোকাবেলা করে আজকের শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। সময় এসেছে আবারো একটি সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেয়ার। কৃত্রিম তন্তুর বিশাল সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। বরং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং রফতানি নিরাপত্তার একটি টেকসই পথ।

আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক

বিজিএমইএ