বাংলাদেশের অর্থনীতির আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে টেলিযোগাযোগ খাত। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ, আর এক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত টেলিযোগাযোগ খাত। দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা অর্জনে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে এ খাত কোটি মানুষকে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে সংযুক্ত করছে, বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। তবে টেলিযোগাযোগ খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা উন্মোচনে প্রয়োজন ভবিষ্যৎমুখী নীতিমালা ও বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার।

গত এক দশকে টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় (এআরপিইউ) ৫৬ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ১.৩ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে এ খাতের টেকসই বিকাশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও টেলিকম অপারেটররা দেশের ডিজিটাল অগ্রগতিতে সক্রিয়ভাবে অবদান রেখে চলেছে। নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন, গ্রামীণ পর্যায়ে মোবাইল সংযোগ প্রদান ও পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এখন আর বিকল্প নয়—ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে ও উদ্ভাবন আনতে এ বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাত দেশজুড়ে ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে আরো বড় ভূমিকা গ্রহণে প্রস্তুত।

ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে বিস্তৃত পরিসরে ভূমিকা রাখলেও কঠোর কর কাঠামোর মধ্য থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় টেলিকম অপারেটরদের, যা সামগ্রিকভাবে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয়ের সুযোগকে সংকীর্ণ করে তুলেছে। দেশের জিডিপিতে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রত্যক্ষ অবদান ১ শতাংশ হলেও দেশের মোট কর রাজস্বে এ খাতের অবদান প্রায় ৫ শতাংশ, এ অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। কিন্তু টেলিযোগাযোগ খাতের বর্তমান কর কাঠামো এ খাতের প্রতি বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্যকেই তুলে ধরে।

মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের (এমএনও) মোট আয়ের ওপর ২ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর আরোপ করা হয়েছে, যা অনেক খাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি। উদাহরণ হিসেবে, তামাক খাতের কথা বলা যায়। এ খাতে ন্যূনতম টার্নওভার করহার ১ শতাংশ এবং বার্ষিক আয় ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ০.৬ শতাংশ।

জিএসএমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য খাতভিত্তিক করের হার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। মোবাইল ব্যবহারের ওপর কার্যকর ভ্যাট ১৮ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ২০ শতাংশ ও সারচার্জ ১ শতাংশ—সব মিলিয়ে মোট করের বোঝা দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশ। এছাড়া টেলিকম অপারেটরগুলোর ওপরে রয়েছে করপোরেট করের চাপ—তালিকাভুক্ত হলে ৪০ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত না হলে ৪৫ শতাংশ। এ করহার প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলংকা ও ভারতের চেয়েও বেশি।

সাম্প্রতিক বাজেটে সিমকার্ডের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে এবং ই-সিম কর ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও এর অনেক নেতিবাচক দিক রয়েছে। এক্ষেত্রে শুরুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের ওপর। তারা টেলিযোগাযোগ সেবা গ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখেন; ফলে তুলনামূলক অনুন্নত এলাকায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ধারা ব্যাহত হয়। একইভাবে আইওটি সিমের ওপর উচ্চ কর ডিজিটাল অবকাঠামো আধুনিকায়নের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

টেলিযোগাযোগ খাতের বর্তমান কর কাঠামো গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং সর্বজনীন ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে দেশের অগ্রগতি মন্থর করে দিচ্ছে। এ খাতে দীর্ঘমেয়াদে যারা বিনিয়োগ করতে চান, কর কাঠামো নিয়ে শঙ্কায় বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে তারাও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ছেন।

এছাড়া বাংলাদেশের তরঙ্গ ব্যয় বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ এবং লাইসেন্সিং পদ্ধতিও জটিল বিধায় অপারেটরদের প্রশাসনিক ব্যয়েরও বৃদ্ধি ঘটেছে। অবকাঠামোর মালিকানা ও শেয়ারিংয়ে বিধি-নিষেধের কারণে দক্ষ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার মোবাইল টাওয়ার থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ২২ হাজার টাওয়ার স্বতন্ত্র টাওয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যমান নীতিমালার সীমাবদ্ধতার কারণে টেলিকম অপারেটরদের সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে, অবকাঠামো শেয়ারিংয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

জিএসএমএর ‘এনাবলিং মোবাইল নেটওয়ার্ক ইনভেস্টমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে টেলিযোগাযোগ খাতে অতিরিক্ত ও জটিল নীতিমালা এ খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা। পাশাপাশি কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা, নিরীক্ষা কার্যক্রম ও জরিমানার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতার কারণে অপারেটররা ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

একটি ভারসাম্য ও স্বচ্ছতাপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ও কাঠামো ছাড়া ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এ চ্যালেঞ্জগুলোর প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। দ্রুতই সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ কমবে; এর ফলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হবে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ এর আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় উন্নত ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণে কার্যকর সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে টেলিযোগাযোগ খাতে কর কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর ও সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে এবং সরকারি রাজস্ব আয়ের ধারাও বজায় থাকবে। এক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রথম ধাপ হিসেবে সরকার করহার কমিয়ে তা আঞ্চলিক ও জাতীয় খাতভিত্তিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে। একইভাবে সম্পূরক শুল্ক ও সিম-কর পুনর্বিবেচনা করা, লাইসেন্সিং ও তরঙ্গ বরাদ্দ প্রক্রিয়া সহজ করা এবং টাওয়ার শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা—এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজন, নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সহযোগিতামূলক উদ্যোগে গ্রহণেও পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে রাজস্ব চাহিদা ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব হবে, যা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

সরকারের উচিত টেলিযোগাযোগ খাতকে কৌশলগত সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নীতিমালার যথাযথ ও দূরদর্শী সংস্কার একদিকে যেমন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। টেলিযোগাযোগ খাতে কার্যকর সংস্কারে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে, তত দ্রুত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজেকে এ অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাবে। এ খাতের সম্ভাবনা অসীম; সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সময়োপযোগী নীতিমালাই টেলিযোগাযোগ খাতের এ সম্ভাবনা উন্মোচনের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হ্রাসকৃত করহার ও সুসংহত ও সহজ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে অপারেটরদের ১৮টি ভিন্ন লাইসেন্সের বোঝা বহন করতে হয়, যা দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করে। করের চাপ হ্রাস ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো একীভূত করে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যা বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে এবং বাংলাদেশকে আকর্ষণীয় ডিজিটাল বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করবে। এতে মোবাইল অপারেটররা ডিজিটাল ফাইন্যান্স, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিনোদন ও আইওটির মতো খাতে সেবা বিস্তারের সুযোগ পাবে, যা নতুন বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচন করবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ, মেধাবী ও সম্ভাবনাময়, আর এর ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে। তাই সরকারের উচিত দ্রুতই সঠিক ও সময়োপযোগী নীতিমালা গ্রহণ করা, যা সামগ্রিকভাবে দেশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করবে।

ইওহান বুসে: প্রধান নির্বাহী, বাংলালিংক