দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেসব তথ্য বিগত সরকারের আমলে জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়েছিল তার বেশির ভাগ ছিল অতিরঞ্জিত। সেই সময় জিডিপি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক নিয়ে তৈরি পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রভাবিত করা হয়েছিল। সেসব পরিসংখ্যান প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ওপর। ওই সরকার পতনের পর বিভিন্ন সূচকের প্রকৃত পরিস্থিতি যেমন উন্মোচন হতে শুরু করে, সেই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হয় যে ব্যাপক মাত্রায় বিবিএসের রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে বিবিএসের প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি তাদের প্রকাশিত পরিসংখ্যান নিয়ে জনমনে সংশয় ও অবিশ্বাসের বিষয়টি বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন (বিআইডিএস) পরিচালিত এক জরিপে উঠে আসে। ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যবহারকারী বিবিএসের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সামষ্টিক অর্থনীতির সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির দিকে মনোযোগ দেবে। এর ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবিএসের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেবে। বিশেষ করে যখন এ সরকারের দায়িত্ব নেয়ার সময় অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের অর্থনীতির সংস্কার। জনগণ কেবল বিগত সরকারের অপরাধগুলোই জানতে চান না, তারা চান অর্থনীতির বাস্তব চিত্র দেখতে। তাছাড়া যে ক্রান্তিকালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, সঠিক পরিসংখ্যান তাদের দায়িত্ব পরিচালনা সহজ করতে সবচেয়ে বেশি সহায়ক হতে পারত। কিন্তু সরকারের মধ্যে সেই প্রতিশ্রুতি পরিপালনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতির বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পরিসংখ্যান মেলে না বলে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসার পরও সরকারের এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকাটা হতাশাব্যঞ্জকই বটে।
- অসংগতিপূর্ণ পরিসংখ্যান সামষ্টিক অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ বা নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম বাধা। যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয় সেটি সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন বাজেট ও বহুপক্ষীয় ঋণ গ্রহণের কাঠামোকেও সেভাবে প্রভাবিত করে। এতে বেশির ভাগ সময় নীতি বাস্তবতা বিবর্জিত হয়। অর্থনীতির ক্ষত গভীর হতে থাকে, যার ভার একটা সময় এসে বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে। একদিকে বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকে, উন্নয়ন বাজেটের আকার ছোট হয়ে আসে, মূল্যস্ফীতি জেঁকে বসে, আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়। এসবই দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য, বিগত সরকারের শাসনামলের বানোয়াট পরিসংখ্যান এর পেছনে বিশেষভাবে দায়ী। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কেন এখনো নির্ভুল জাতীয় পরিসংখ্যান তৈরির উদ্যোগে পিছিয়ে আছে সেটিও উদ্বেগের বিষয়। বিশেষত জিডিপির সঠিক আকার কত সেটি না জানা গেলে অর্থনৈতিক সংস্কার কতটা কার্যকর হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
- অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির অনুপাতের সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়ে থাকে। গত দেড় দশকে যেসব সরকারি পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ ছিল তার মধ্যে জিডিপির পরিসংখ্যানও ছিল। দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা বাস্তবতার সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য খুঁজে পাননি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার; সরকারের এ তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতির আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। এক্ষেত্রে দেশের প্রকৃত জিডিপির পরিমাণ কত সেটি নির্ধারণে গত আট মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে জানাচ্ছে বণিক বার্তার প্রতিবেদন। অথচ একটি দেশের ঋণের নিরাপদ সীমা কত হবে, রফতানি আয় পর্যাপ্ত কিনা, ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ হচ্ছে কিনা এসব কিছু পরিমাপ করা হয়ে থাকে জিডিপির অনুপাতে। ফলে জিডিপির তথ্য অতিরঞ্জিত হলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব নির্দেশকও ভুল তথ্য দেবে।
- এদিকে বিগত সরকার ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখাতে জিডিপি বাড়িয়ে দেখিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রফতানি আয়ের অসংগতিপূর্ণ তথ্যের কারণে প্রতি বছরই ব্যালান্স অব পেমেন্টে (বিওপি) ট্রেড ক্রেডিটে বড় অংকের ঘাটতি দেখা যেত। রফতানির অর্থ প্রত্যাবাসিত না হওয়ার কারণে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে বিগত সরকারের সময়ে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয় স্পষ্ট করার চাপ দেয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে দেখা যায়, হিসাবায়ন পদ্ধতির ত্রুটির কারণে বছরের পর বছর ধরে রফতানির আয় বেশি দেখানো হয়েছে। এ ত্রুটি সংশোধন করার পর দেখা যায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানি বেশি দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। এভাবে রফতানি আয় বাড়িয়ে দেখানোর মাধ্যমে জিডিপির আকার, প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ও বেশি দেখানো হয়েছে, যা বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাবের দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়। বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুসারে জিডিপির আকার ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার। চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপির আকার কমেছে ৪৫ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। সাময়িক হিসাব অনুসারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও চূড়ান্ত হিসাবে সেটি ৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার কারণ হিসেবে বিবিএস বলছে রফতানি আয়ের সংশোধিত হিসাবের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প উৎপাদনের নিম্নগতির প্রভাবে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।
- আবার সম্প্রতি জিডিপির অনুপাতে কর-রাজস্ব আহরণ বাড়াতে আইএমএফের পক্ষ থেকে সরকারকে চাপ দেয়া হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, সরকারের হিসাবে প্রতি বছরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি হলে সে অনুপাতে কর-জিডিপি অনুপাতও বাড়ার কথা। কিন্তু উল্টো সেটি কমছে। বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন কর-জিডিপির দেশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতিরঞ্জিত জিডিপির পরিসংখ্যান সংশোধন করা হলে এর আকার কমে আসবে। তখন কর-জিডিপির অনুপাত বেড়ে যাবে। তবে আকার কমে গেলে সেক্ষেত্রে জিডিপির অনুপাতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
- এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের পরিসংখ্যান যাচাই-বাছাই ও প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এজন্য বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে এবং সংস্থাটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমমুক্ত রাখা আবশ্যক। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্ফীত করে দেখানো হয়েছে। যে কারণে এর ওপর ভিত্তি করে যা-ই করা হোক না কেন, তাতে অর্থনীতির পরিস্থিতির সত্যিকার মূল্যায়ন সম্ভব নয়। নীতি প্রণয়ন বা অন্য যেকোনো পদক্ষেপ—সব ক্ষেত্রে তথ্য, পরিসংখ্যান হলো মূল ভিত্তি। তাই সঠিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নীতি-কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার যদি অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে চায়, তবে জিডিপিসহ সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত পরিসংখ্যান প্রণয়নের বিকল্প নেই।










