বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রাণবিজ্ঞান (বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস বা লাইফ সায়েন্সস) একাডেমিয়ার সর্বশেষ সংস্করণ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি। সর্বশেষ বলে ভাববেন না যে দু-তিন বছর ধরে খোলা বিভাগ এটি। দেশের প্রথম বায়োটেকনোলজি বিভাগ (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়) এরই মধ্যে পাড়ি দিয়েছে তিন দশক এবং অন্তত ছয়টি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) বায়োটেকনোলজি বিভাগগুলোর বয়সও প্রায় দুই যুগ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষদভিত্তিক বিভাগগুলোর মধ্যে বায়োটেকনোলজি বিভাগ সব সময়ই থাকে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়া প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। বর্তমানে প্রায় ৩১টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। লাইফ সায়েন্সের আর কোনো সাবজেক্ট এতগুলো পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা গণনায় লাইফ সায়েন্সের বিভাগটি সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘ছোট ভাই’ তকমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বায়োটেকনোলজি।

১৯৮৮ সালে ইউরোপিয়ান ফেডারেশন অব বায়োটেকনোলজি বিষয়টির যে সংজ্ঞায়ন করে তাতে বলা হয়, ‘জীবপ্রযুক্তি হলো ভৌতবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিজ্ঞানের মিথস্ক্রিয়ায় কোনো প্রাণ বা অঙ্গাণু কিংবা আণুবীক্ষণিক কোষকে কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণ সাধনের প্রচেষ্টা। এ প্রযুক্তিতে বিজ্ঞানের অনেকগুলো শাখা জড়িত থাকার কারণে একে মাল্টি ডিসিপ্লিনারি সায়েন্স বলা হয়। কিন্তু এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি সায়েন্সের দোহাই দিয়ে বায়োটেকনোলজির প্রায় অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রগুলো বায়োটেকনোলজি ভিন্ন অন্য ডিসিপ্লিনের দখলে। দেশে অন্তত প্রায় দশের অধিক সরকারি কৃষি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে বায়োটেকনোলজি নামে গবেষণাগার থাকলেও সেখানে বায়োটেকনোলজির গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির আবেদন করার সুযোগ নেই। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল হতে এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, দেশে কৃষিসংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। অথচ এরপর প্রায় প্রতিটি কৃষিসংশ্লিষ্ট গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কোনোটিতেই বায়োটেকনোলজির নাম উল্লেখ করা হয়নি। কি এক বিচিত্র দেশ সেলুকাস! রিসার্চ ডিভিশনের নাম বায়োটেকনোলজি, কিন্তু বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটরা চাকরিতে আবেদন করতে পারেন না। এর থেকে বড় বৈষম্য কী হতে পারে?

এরপর আসে স্বাস্থ্য খাত। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বায়োটেকনোলজিস্টদের রয়েছে কাজ করার অপার সম্ভাবনা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, স্বাস্থ্য খাতে বায়োটেকনোলজির দুয়ার এখনো খোলেনি। করোনা মহামারী খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। বিপর্যস্ত বিশ্বে সবাই যখন ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত তখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগগুলো নিজেদের ল্যাব খুলে দেয় করোনা টেস্টের জন্য। সরকারি পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং ইনস্টিটিউটে আরটি পিসিআরের মাধ্যমে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে বায়োটেকনোলজিস্টদের অবদান ছিল অগ্রগণ্য। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ আরটি পিসিআর টেকনোলজি শেখাতে বায়োটেক গ্র্যাজুয়েট এবং বিশেষজ্ঞরা নিঃস্বার্থভাবে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা সত্যি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পরিতাপের বিষয়, করোনা মহামারী চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব জায়গা থেকে বায়োটেক গ্র্যাজুয়েটদের কাজ করার সুযোগ কমে গিয়ে নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোটায়। স্বাস্থ্য খাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে আসা বায়োটেক গ্র্যাজুয়েটদের কাজ করার তেমন কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বিধিমালা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে বায়োটেকনোলজিস্টদের জন্য কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে পৃথিবী যেখানে সব সেক্টরে বায়োটেকনোলজিস্টদের কাজ করার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে সেখানে আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাত এখনো তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখার সুযোগ দিচ্ছে না। গতানুগতিকভাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দিয়েই চলছে স্বাস্থ্য খাত। অথচ প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান তাদের জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় কাজের উপযোগী করে তোলে। একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শুধু সীমিত সংখ্যক কিছু যন্ত্রপাতি চালনা করে রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসকদের সহায়তা প্রদান করতে পারেন। অন্যদিকে একজন চৌকস বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট রোগ শনাক্তকরণসহ গবেষণায়ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন এবং এর অজস্র নজির বাংলাদেশে রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআর,বিসহ অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানেই বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটরা সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাদের গবেষণার স্বীকৃতি রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তথাপি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে তাদের কোনো অবদান রাখার সুযোগ এখনো হয়ে উঠছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় সেন্টার ফর মেডিকেল বায়োটেকনোলজি থাকলেও সেখানে কোনো বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের সংস্থান হয়নি। সন্দেহাতীতভাবে এ আচরণ বৈষম্যমূলক। আধুনিক রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহারসহ গণস্বাস্থ্য গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েই চলেছে। এর পরও কি এ দেশে বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের স্বাস্থ্য খাতে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে না?

দেশের বায়োটেকনোলজি গবেষণার জন্য ২০০১ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি (এনআইবি) যাত্রা শুরু করে। প্রত্যাশিতভাবেই এনআইবি এ দেশে বায়োটেকনোলজির বাতিঘর হয়ে ওঠার কথা ছিল যদিও বাস্তবে সেটি হয়ে ওঠেনি। গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও বায়োটেকনোলজির প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে এনআইবি এরই মধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে এনআইবিতে বায়োটেকনোলজিস্টদের কাজের সুযোগ নিয়েও গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে আছে ক্ষোভ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সব রিসার্চ ডিভিশনের নামে বায়োটেকনোলজি থাকলেও বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা মাত্র দুই-পঞ্চমাংশের মতো। এ যেন নিজের ঘরেই পরবাসের অবস্থা।

এবার একাডেমিয়ায় আসা যাক। বাংলাদেশে এত বিপুল পরিমাণ মেধাবী বায়োটেকনোলজিস্ট তৈরি হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি এমনকি কৃষি, ভেটেরিনারি ইত্যাদি ডিসিপ্লিন থেকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে মেধাবী বায়োটেক গ্র্যাজুয়েটদের অন্যান্য ডিসিপ্লিনে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় না। একটা সময় যখন এ বিভাগগুলো তৈরি হয়েছিল তখন অন্যান্য ডিসিপ্লিন থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যৌক্তিক হলেও এখন এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ জনশক্তি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি অবিবেচনার পর্যায়ে চলে গেছে। বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের মাঝে এ নিয়ে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। শিক্ষকতা এক মহান পেশা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাধারণত মেধাবী শিক্ষার্থীদেরই শিক্ষকতা ও গবেষণায় আগ্রহী হতে দেখা যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ দেশে বায়োটেকনোলজি বিষয় নিয়ে পড়তে ও ক্যারিয়ার গড়তে মেধাবীরা নিরুৎসাহিত হবে।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। বছরের পর বছর মেধাবী শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে। উচ্চতর গবেষণা ও শিক্ষা সম্পন্ন করে শত শত বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজিস্টদের বৃহত্তম সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটস (বিএবিজি) সব সময় এ বিষয়ে সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে চলেছে এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত গণ-অভ্যুত্থানে গঠিত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমরা বলতে চাই, বায়োটেকনোলজিস্টদের প্রতি বৈষম্য নিরসনে তারা যেন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এটি সহস্র মেধাবী বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটদের প্রাণের দাবি। সব গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে বায়োটেকনোলজিস্টদের প্রতি বৈষম্য দূর করাসহ কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।

মো. মেহেদী হাসান সোহাগ: সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটস (বিএবিজি)

ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম: প্রধান নির্বাহী, বায়োটেড ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটস (বিএবিজি)