সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দালালদের দৌরাত্ম্য, নানা ধরনের হয়রানি-ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রতার মতো অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ পরিস্থিতি থেকে জনগণকে স্বস্তি দিতে গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ‘এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবা’ নামে উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, অনলাইন জিডি ও ভূমি সেবাসহ নানা সরকারি সেবা নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে রাজধানী ঢাকার ছয় এলাকায় নাগরিক সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। উদ্দেশ্য বিচারে উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এখনো কাঙ্ক্ষিত উদ্যমে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়নি।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল ৪৫০টির বেশি সেবা দেয়ার কথা থাকলেও গত সাড়ে সাত মাসে চার থেকে পাঁচটি সেবার ফরম পূরণ ছাড়া আর কোনো সেবাই দিতে পারেননি ওই ছয় কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা। এমনকি ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে নিজেদের মোবাইল ডাটা শেয়ার করে কাজ চালাচ্ছেন তারা। উদ্যোক্তাদের অনেকেই এরই মধ্যে হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের ভাষ্য, তারা শুধু অনলাইনে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি সেবার ফরম পূরণ করে দিচ্ছেন, যা মানুষ নিজে নিজেই বা দোকান থেকেই করিয়ে নিতে পারে। তারা শুধু দোকানের ভূমিকা পালন করছেন। মানুষ এখনো দালালের মাধ্যমে বেশি টাকা দিয়েই সেবা নিচ্ছেন।
এ পরিস্থিতি বেশ কয়েকটি বিষয়কে স্পষ্ট করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত না হওয়া ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে সরকারের এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবার উদ্যোগটি এখনো কার্যত আলোর মুখ দেখেনি। তবে এটি মূলত উপরিভাগের একটি সমস্যা।
উদ্যোগটির ভিত্তি মূলত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল নাগরিক সেবা দেয়া। এ উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের আগে তথা নাগরিক সেবা কেন্দ্র চালুর আগে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় আনা। কিন্তু সেটি এখনো করা যায়নি। ন্যাশনাল ‘এপিআই কানেকটিভিটি হাব’ তৈরির কথা জানা গেলেও সেটি কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু তার আগেই সরকার উদ্যোক্তাদের বাছাই করে প্রশিক্ষণ ও সনদ দিয়েছে। সেবা কেন্দ্র চালু করেছে। কিন্তু কেন্দ্র চালুর আগে প্রয়োজন ছিল একটি ইন্টার-অপারেবল প্লাটফর্ম তৈরি করা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার বিভিন্ন সেবা নাগরিক সেবা কেন্দ্র থেকে পাওয়া সম্ভব হবে। অর্থাৎ জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ভূমি, জন্মনিবন্ধন, পুলিশ, বিআরটিএ—সব সেবাদাতা সংস্থাকে একটি ইন্টার-অপারেবল প্লাটফর্মে আনা প্রয়োজন।
উদ্যোগটি উদ্বোধনের সময় ন্যাশনাল ইন্টার-অপারেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক, ন্যাশনাল সার্ভিস বাস এবং ডাটা গভর্ন্যান্স অথরিটির মতো ধারণাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নাগরিক সেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করলে তা সরাসরি ট্র্যাকিং নম্বরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছে যাবে, আর নাগরিককে কোনো অফিসে দৌঁড়াতে হবে না। কিন্তু বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে নাগরিক সেবা কেন্দ্র চালুর আগে এগুলো কার্যকর করা প্রয়োজন ছিল। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য মতে, সরকারের অন্যান্য পোর্টালের সঙ্গে নাগরিক সেবাকে যুক্তই করা যায়নি। ফলে আবেদন করে সেবাপ্রার্থীকে সশরীরে গিয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েও উদ্যোগটি সফল করা যাবে বলে প্রতীয়মান হয় না।
এর পরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শক্তিশালী ইন্টারনেট সংযোগ ও সমন্বয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া দরকার। নয়তো যে কাজটুকু শুরু হয়েছে, সেটিও থমকে যাবে। এসব ঘাটতির কারণে এর আগেও এ ধরনের উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়তে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) কথা স্মরণে আসে। ইউডিসি ঘিরেও জনমনে প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু সমন্বয়হীনতা, নজরদারির অভাব ও রাজনৈতিক বিবেচনায় উদ্যোক্তা নিয়োগের অভিযোগে সেই উদ্যোগ সফল হয়ে ওঠেনি।
বর্তমান উদ্যোগটির আরেকটি দুর্বল দিক হলো জবাবদিহির অভাব। প্রকল্প শুরু হওয়ার সাড়ে সাত মাস পরও যদি ইন্টারনেট সংযোগের মতো মৌলিক বিষয় নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেই দায় কার ওপর বর্তাবে তার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একে অন্যের দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছে। এ ধরনের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থাকলে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন ও টেকসই হওয়ার কথা নয়।
এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবা উদ্যোগটি সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিতে পদক্ষেপ দরকার। বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে বিদ্যমান ছয়টি কেন্দ্রে অনতিবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় পোর্টাল ইন্টিগ্রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত ও প্রয়োজনীয় চুক্তি করাও জরুরি। পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। এছাড়া ডাটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের পথে হাঁটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শুধু ইন্টারনেট সংযোগ দিলেই হবে না; ডাটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। নাগরিক সেবা কেন্দ্রে মানুষের জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্টসহ সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহৃত হবে। এসব তথ্য সুরক্ষার জন্য কার্যকর ডাটা গভর্ন্যান্স আইন ও তার বাস্তব প্রয়োগ অপরিহার্য। এছাড়া উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো এ উদ্যোগ টেকসই হবে না।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে এক ঠিকানায় সব নাগরিক সেবা ধারণাটি সময়োপযোগী। কিন্তু সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো থাকলে তা কোনোভাবেই আশানুরূপ ফল দেবে না। সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সেই প্রত্যাশা রয়েছে।










