বিশ্বব্যাপী প্রতিভা আকর্ষণের প্রতিযোগিতা এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসন ব্যবস্থা ক্রমে কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলছে, অন্যদিকে চীন নতুন করে কে-১ ভিসার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের জন্য দরজা উন্মুক্ত করছে। এ বিপরীতধর্মী পদক্ষেপ শুধু ভিসানীতির প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক কৌশল, জাতীয় অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের দিক থেকে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের পেশাজীবীদের জন্য এর প্রভাব যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
আমেরিকার এইচ-১বি ভিসা: সুযোগ থেকে শঙ্কা
দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসা ছিল স্বপ্নের দরজা। হাজারো প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও আইটি বিশেষজ্ঞ—বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া থেকে—সিলিকন ভ্যালি বা অন্য প্রযুক্তি নগরীতে কাজের সুযোগ পেয়েছেন এ ভিসার মাধ্যমে। গুগল, মাইক্রোসফটসহ বহু আমেরিকান প্রযুক্তি জায়ান্টকে গড়ে তুলেছেন সেইসব অভিবাসী যারা একসময় এইচ-১বি নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। তবে শুরু থেকেই প্রোগ্রামটি বিতর্কিত। মার্কিন কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলা এবং ভিসাধারীদের শোষণমূলক পরিস্থিতির অভিযোগ প্রায়ই উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। নতুন ফি, কাগজপত্রের ঝামেলা এবং কঠোর নিয়ম-কানুনে প্রমাণিত হচ্ছে যে বিদেশী শ্রমশক্তিকে আর আগের মতো সহজে স্বাগত জানাচ্ছে না আমেরিকা। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে—এটি দেশীয় কর্মীদের সুরক্ষার জন্য, কিন্তু বাস্তবে এর ফলে নিয়োগকর্তা ও আবেদনকারীদের কাছে প্রোগ্রামটি ক্রমেই অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। অন্যদিকে মার্কিন অর্থনীতি এখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি বা উন্নত উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে আন্তর্জাতিক প্রতিভার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। নীতি ও বাস্তব চাহিদার এ বৈপরীত্য ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
চীনের কে-১ ভিসা: কৌশলগত দরজা খোলা
ট্রাম্পীয় আমেরিকার অভিবাসনবিরোধীর বিপরীতে চীন ভিন্ন পথে হাঁটছে। এটা কাকতালীয় নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কড়াকড়ির পর পরই সদ্য চালু হওয়া কে-১ ভিসা বিদেশী পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তাদের সহজে প্রবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি থাকার সুযোগ দিচ্ছে। বার্তাটি পরিষ্কার: বৈশ্বিক প্রতিভাকে হুমকি নয়, বরং সম্পদ হিসেবে দেখছে বেইজিং। এটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কারই নয় বরং একটি কৌশলগত ঘোষণা। যখন পশ্চিমা দেশগুলো অভিবাসনকে সীমিত করছে, চীন নিজেকে একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিচর্চা, উৎকর্ষ ও নেতৃত্বের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করছে। গবেষণা, অবকাঠামো ও উদীয়মান শিল্পে বিশাল বিনিয়োগের পাশাপাশি এ ভিসা আন্তর্জাতিক মেধাকে টেনে আনার এক আকর্ষণীয় প্যাকেজ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সবুজ প্রযুক্তি কিংবা মহাকাশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে বৈশ্বিক মেধা অপরিহার্য। তাই কে-১ ভিসা শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং চীনের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অংশ।
দুই ভিন্ন দর্শন ও কৌশল
এ দুই পদক্ষেপের পেছনে দুই বিপরীত দর্শন কাজ করছে। আমেরিকার অভিবাসন নীতি ক্রমেই ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপে প্রভাবিত হচ্ছে, যেখানে অভিবাসন একটি বিভাজনমূলক ইস্যু। দেশীয় কর্মসংস্থান সুরক্ষার নামে যে নীতি নেয়া হচ্ছে, তা বাস্তবে বিদেশী প্রতিভার প্রবাহ সীমিত করছে। অন্যদিকে চীন প্রতিভাকে তার উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে। শিল্পায়নে নিজস্ব শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করার পর এখন তারা উপলব্ধি করছে যে উচ্চমূল্যের উদ্ভাবনের জন্য আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। কে-১ ভিসা তাই আপস নয়, বরং হিসাবি পদক্ষেপ।
একদিকে আমেরিকা তার ঐতিহ্যবাহী ‘প্রতিভার কেন্দ্র’ অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে চীন নতুন করে সে শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসছে।
বৈশ্বিক প্রতিভার সামনে নতুন হিসাব
বিশ্বব্যাপী পেশাজীবীদের জন্য পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। আগে যে ভারতীয় প্রকৌশলী বা বাংলাদেশী ডাটা বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম পছন্দ মনে করতেন, এখন তাকে নতুনভাবে ভাবতে হচ্ছে। উচ্চ ফি, জটিলতা ও অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রকে কম আকর্ষণীয় করছে। একই সময়ে চীন তাদের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো উচ্চ বেতন, প্রতিষ্ঠিত উদ্ভাবনী পরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ দেয়। অন্যদিকে চীন দিচ্ছে দ্রুত সুযোগ, উদীয়মান শিল্পে প্রবেশ ও আন্তর্জাতিকীকরণের প্রতিশ্রুতি। তরুণ প্রজন্ম যারা বেশি নমনীয় ও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তাদের কাছে চীনের প্রস্তাব আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর বা উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে, যাতে তারা এক ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে আসে। ফলে প্রতিভা প্রতিযোগিতা এখন বহু মেরুকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য কম নয়। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান দক্ষ জনশক্তি রয়েছে। এতদিন তাদের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষত এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে। সেখান থেকে তারা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি আরো কঠিন হয়ে ওঠে তাহলে অনেকেই চীন বা অন্য গন্তব্যে মনোযোগ দিতে পারে। এতে যেমন সুযোগ আছে, তেমনি ঝুঁকিও আছে। বাংলাদেশী প্রতিভা যদি চীনের উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেমে যুক্ত হয়, তবে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো গভীর করতে পারে এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুফল দেশেও আনতে পারে। তবে এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। একই সঙ্গে সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা বাইরে চলে গেলে দেশীয় অর্থনীতির উদ্ভাবনী সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
বাংলাদেশের করণীয়
চীনের সদয় ভিসানীতি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে বাংলাদেশকে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হতে হবে এবং শিক্ষাগত সমন্বয় বাড়াতে হবে। গবেষণা, যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম এবং একাডেমিক বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা চীনে সহজে একীভূত হতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, চীনা ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চীনা ভাষা ম্যান্ডারিনে দক্ষতা অর্জন করলে বাংলাদেশী তরুণরা চীনে কাজের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি ও বাজারে ভালোভাবে খাপ খাওয়াতে পারবে। সরকারি পর্যায়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট বা ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা জরুরি। বেসরকারি খাতও এক্ষেত্রে অংশ নিতে পারে।
বাংলাদেশের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত প্রতিভা প্রেরণকে একমুখী ‘ব্রেইন ড্রেইন’ না দেখে সেটিকে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর করা। অর্থাৎ যারা বিদেশে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, তাদের দেশে ফিরে আসতে বা দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে উৎসাহিত করতে হবে।
আমেরিকা বনাম চীন: প্রতিভার আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উন্মুক্ততা, স্বাধীনতা ও পুঁজিবাদী উদ্যোক্তা মনোভাব অভিবাসীদের জন্য এক ধরনের স্বপ্ন তৈরি করে। সেখানে সৃজনশীলতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগকে যেভাবে মূল্য দেয়া হয়, তা এখনো অনেকের কাছে অনন্য। তাছাড়া অভিবাসন থেকে নাগরিকত্ব প্রাপ্তি তুলনামূলকভাবে সহজ ও বৈধ পথ আমেরিকামুখীদের জন্য একটি অন্যতম আকর্ষণ। এ কারণেই সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিভা আকর্ষণে একটি বিশেষ অবস্থানে থাকে।
চীনের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ রাজনৈতিকভাবে সীমিত স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামো প্রতিভাদের কাছে সবসময় আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারে না। চীনের তাই শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ দিলেই হবে না, বরং প্রতিভাদের জন্য কাজের স্বাধীনতা, গবেষণার স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় মুক্তচিন্তা, উদ্যোক্তাদের জন্য আরো উন্মুক্ত বাজার এবং বৈশ্বিক সংযোগে আস্থা তৈরি করার মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে পারে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
আজকের অভিবাসন নীতি আর কেবল শ্রমবাজারের প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার অংশ। যে দেশ প্রতিভা আকর্ষণ করতে পারবে, সেই দেশই উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা ও প্রভাবের দিক থেকে এগিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপে কৌশলগত প্রয়োজন উপেক্ষা করে, তবে তা তার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকে দুর্বল করবে। অন্যদিকে চীন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেও প্রতিভা-স্বাগত নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে অনেক পেশাজীবীর জন্য বাস্তববাদী প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে: কোথায় তারা ভালো ক্যারিয়ার গড়তে, অবদান রাখতে এবং বিকশিত হতে পারবেন?
সবশেষে আমেরিকার এইচ-১বি ভিসার কড়াকড়ি আর চীনের কে-১ ভিসার স্বাগত নীতি কেবল প্রশাসনিক খবর নয়। এগুলো ভবিষ্যতের কাজ, উদ্ভাবন ও ক্ষমতার দিকনির্দেশক। আমেরিকার সংকোচনমূলক নীতি এক প্রকার পশ্চাদপসরণ, আর চীনের নতুন উদ্যোগ এক প্রকার অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের পেশাজীবীদের জন্য এতে যেমন অনিশ্চয়তা আছে, তেমনি সুযোগও আছে। বৈশ্বিক প্রতিভার মানচিত্র বদলে যাচ্ছে, যেখানে বহু কেন্দ্র একসঙ্গে গড়ে উঠছে। এখন প্রয়োজন কৌশলগত চিন্তা, যাতে ব্যক্তি ও দেশ উভয়ই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
এটা নিশ্চিত যে প্রতিভার প্রতিযোগিতা এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যে দেশ এগিয়ে যাবে, তারাই শুধু অর্থনীতির নয়, একবিংশ শতাব্দীর গতিপথ নির্ধারণ করবে।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি









