সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের দক্ষ, দায়িত্বশীল ও জনমুখী করে তোলা, যাতে তারা রাষ্ট্রের নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মকর্তারা নিজেদের কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক পদ্ধতি ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এতে প্রশাসনের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আচরণ ও মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যাতে তারা জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখেন ও দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কর্মকর্তাদের মধ্যে নেতৃত্বগুণ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীরা সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও মানোন্নয়ন ঘটিয়ে নাগরিকের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। গত এক দশকে সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ বাস্তবে সরকারি পরিষেবায় প্রশিক্ষণের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এ বিপুল ব্যয়ের যথাযথ ফলাফল কোথাও দৃশ্যমান নয়। নাগরিক সেবা যেমন পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), ভূমি অফিস বা স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান উন্নত হয়নি। বরং প্রশিক্ষণ ঘিরে নানা অনিয়ম, ভুয়া স্বাক্ষর, অর্থ লোপাট, বিদেশ সফরের নামে অপচয় ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠছে। সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঘিরে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, সেগুলো যথাযথ তদন্ত করে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার করা উচিত।

সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষকের (সিএজি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবে পরিচালিত হয়নি। কিন্তু প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ও ভাতা প্রদর্শন করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়। এটি প্রমাণ করে যে প্রশিক্ষণকে কার্যকর দক্ষতা উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে অনেক ক্ষেত্রে কেবল আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রশিক্ষণ খাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে। এ ধরনের ঘটনা নির্দেশ করে, প্রশিক্ষণ খাতে সরকারি তদারকি ও জবাবদিহির অভাব কতটা গভীর। প্রশিক্ষণ এখন অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য পরিচালিত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান। ফলে প্রশিক্ষণ জনসেবার মান বৃদ্ধিতে কোনো বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারছে না।

বিদেশে প্রশিক্ষণের নামেও অনিয়ম-দুর্নীতি সামনে আসছে। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ জন জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবকে রিফ্রেশার কোর্সে বিদেশে পাঠানোর জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে অনেকেরই অবসরের সময় ঘনিয়ে এসেছিল। এ ধরনের প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়া কিছুই নয়। পরে সমালোচনার মুখে নয়জন সচিবের বিদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে। অবসরের প্রাক্কালে প্রশিক্ষণ অনুমোদন দেয়াকে প্রশাসনিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখা যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে ও সরকারি কর্মচারীদের নৈতিক অবক্ষয় স্পষ্ট। প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়নের অভাবে এসব অনিয়ম ধরা পড়ছে না।

সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিপুল ব্যয় হয় প্রশিক্ষণে। কিন্তু এত ব্যয়ের পরও সরকারি পরিষেবায় এর কোনো প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর মূল কারণ একাধিক। প্রথমত, অনেক প্রশিক্ষণ কেবল কাগুজে বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীরা কখনো তার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন না, আবার অনেক প্রশিক্ষণ শুধু ভাতা বা সম্মানী পাওয়ার জন্য করা হয়। ফলে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের বদলির কারণে প্রশিক্ষণের সুফল কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কর্মচারীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণের কিছুদিন পরই অন্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগে বদলি হয়ে যান। ফলে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞানসংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োগের সুযোগ পান না। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা প্রশিক্ষণকে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করছে। তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণের ফলাফল মূল্যায়নের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। প্রশিক্ষণের আগে বা পরে দক্ষতা যাচাই বা কর্মদক্ষতার পরিমাপ করা হয় না। ফলে প্রশিক্ষণ শেষ হলেও প্রশাসনিক পরিষেবা উন্নয়নে তার প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায় না। স্বাস্থ্যসেবা, ভূমি, পুলিশ বা বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সেবার ক্ষেত্রে জনসাধারণের অসন্তোষই প্রমাণ করছে, প্রশিক্ষণ কার্যত কোনো ইতিবাচক ফল দিচ্ছে না। চতুর্থত, বিদেশে প্রশিক্ষণ অনিয়ম ও অপচয় বেশি। অবসরের প্রাক্কালে প্রশিক্ষণ নেয়া, ভাতা উত্তোলন বা কাগুজে উপস্থিতি দেখানো হয়। ফলে প্রশিক্ষণের বাস্তবতার প্রতিফলনকে কমিয়ে দেয়। প্রশিক্ষণ যদি কর্মস্থলে কার্যকরভাবে প্রয়োগযোগ্য না হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

সরকারি সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। কিন্তু তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা সুবিধা অর্জনের মাধ্যম না হয়ে বাস্তব কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হয়। এজন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে হতে হবে পারফরম্যান্সভিত্তিক। প্রশিক্ষণের আগে ও পরে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একই দপ্তরে নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সেটি প্রয়োগ করতে পারেন। বিদেশে প্রশিক্ষণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করা উচিত। যেসব কর্মকর্তা অবসরের দ্বারপ্রান্তে, কিংবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ নেই—তাদের এ ধরনের প্রশিক্ষণের অনুমতি দেয়া উচিত নয়। প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফর যেন রাষ্ট্রীয় অর্থে বিলাসযাত্রায় পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরিবর্তে বিদেশী প্রশিক্ষককে দেশে এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এখন অনলাইনেও করা সম্ভব। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারও আমাদের করতে হবে। প্রশিক্ষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা আর্থিক সুবিধার মাধ্যম নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠুক।