প্রতি বছর ২৫ জুন পালিত হয় বিশ্ব নাবিক দিবস। সারা বিশ্বের সমুদ্রপথে কাজ করা নাবিকদের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের অধিকার ও অবদানের স্বীকৃতি দিতেই দিনটি উদযাপন করা হয়। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রচেষ্টায় নাবিকদের শ্রম অধিকারকে সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনতে ২০০৬ সালে গৃহীত হয় মেরিটাইম লেবার কনভেনশন (এমএলসি)। এ কনভেনশনকে অনেকেই ‘Seafarers’ Bill of Rights’ হিসেবে অভিহিত করে।
এমএলসি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নকারী দেশগুলোয় নাবিকদের জীবনমান ও নিরাপত্তা ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো এ গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা ও গাফিলতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা এ দেশের হাজারো মার্চেন্ট মেরিনারদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক অগ্রগতি: অধিকার নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
বিশ্বব্যাপী নাবিকদের জন্য শ্রম অধিকার ও জীবনমান নিশ্চিত করতে এমএলসি, আন্তর্জাতিক চুক্তিটি নাবিকদের জন্য একটি ন্যূনতম জীবন ও কর্মপরিবেশের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এর লক্ষ্য হলো তাদের মানবিক ও পেশাগত মর্যাদা সংরক্ষণ। প্রায় ৭০টি পূর্ববর্তী আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডকে একত্র করে এ কনভেনশন গঠন হয়েছে।
এ কনভেনশন অনুযায়ী, একজন নাবিকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সময়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদনের সুযোগ এবং সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জাহাজের পতাকা রাষ্ট্র এবং যে বন্দরগুলোয় জাহাজ ভেড়ে, উভয়েরই নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে এ কনভেনশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। ফলে এটি কেবল একটি শ্রম আইন নয়, বরং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
এ কনভেনশন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও প্রয়োগযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য গঠন হয় Special Tripartite Committee (STC)। এটি এমএলসির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা, যেখানে সদস্য দেশগুলোর সরকার, জাহাজ মালিক এবং নাবিকদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে। এ কমিটির মূল দায়িত্ব হলো কনভেনশনের ধারা ও উপধারাগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করা, প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা এবং বাস্তবায়নকারী দেশগুলোর পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা।
এসটিসির সর্বশেষ অর্থাৎ চতুর্থ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ২০২২ সালে, যেখানে এমএলসিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীগুলো আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে ২০২২ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয় এবং তা কার্যকর হবে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে। সংশোধনীগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, যুদ্ধপ্রবণ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিধান, স্বচ্ছ অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং বন্দরে পৌঁছানোর পর প্রাপ্ত সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন।
এ সংশোধনীগুলো প্রমাণ করে যে এমএলসি একটি জীবন্ত চুক্তি, যা সময় ও বাস্তবতার পরিবর্তনে নিজেকে হালনাগাদ করে চলেছে। এসটিসির অবদান এ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নাবিকদের, মালিকদের এবং সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর সহযোগিতার মঞ্চ তৈরি করেছে। এক কথায়, এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রশ্রম ব্যবস্থায় একটি ভারসাম্য ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করছে।
এমএলসির বাস্তবায়ন কেবল নাবিকদের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমই নয়, বরং বৈশ্বিক সমুদ্রপথে একটি ন্যায্য ও মানবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির চাবিকাঠি। প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা, যাতে তারা নিশ্চিত করে যে নাবিকরা যেন পর্যাপ্ত বিশ্রাম, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন ও সম্মানজনক জীবনের সুযোগ পান।
বিশ্বের অনেক দেশ এ কনভেনশনকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে এরই মধ্যে নিজেদের নাবিকবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনো অপর্যাপ্ত।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: উৎসব আছে, বাস্তবায়ন নেই
বাংলাদেশেও প্রতি বছর বিশ্ব নাবিক দিবস কিছু সীমিত আলোচনা সভা ও গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। তবে এ দিবস ঘিরে যে মূল প্রতিশ্রুতি—নাবিকদের অধিকার বাস্তবায়ন ও সংরক্ষণ, তা রয়ে গেছে কেবল কাগজে-কলমে। এখনো বাংলাদেশে এমএলসি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর তদারকি, মনিটরিং বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এসটিসি গঠন করেনি, যেখানে সরকারের পাশাপাশি নাবিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা। এ কমিটির অনুপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নাবিকদের অধিকার নির্ধারণ, সমস্যা সমাধান এবং নীতি প্রণয়নে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
ভেনিজুয়েলায় বন্দি নাবিক: নীরবতা কি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা?
বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ মার্চেন্ট নাবিক বর্তমানে ভেনিজুয়েলার কারাগারে বন্দি আছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পেছনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিচারের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি।
এখানে প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশ কি তার নাগরিক নাবিকদের অধিকার রক্ষায় যথাযথ কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে? নাকি আন্তর্জাতিক নাবিক অধিকার নিয়ে কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা ও সেমিনারেই সীমাবদ্ধ আমাদের অবস্থান?
এ ঘটনা একটি জ্বলন্ত প্রমাণ যে আন্তর্জাতিক শ্রম কাঠামোর বাস্তবায়ন না থাকলে বাংলাদেশের নাবিকরা বিদেশে অথবা স্বদেশে অবিচারের শিকার হবেন এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হবেন।
কেন জরুরি এসটিসি
এমএলসি বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি হলো একটি কার্যকর এসটিসি। এ কমিটির মাধ্যমে—
নাবিকদের সমস্যা ও চাহিদা সরাসরি নীতিনির্ধারণে স্থান পাবে
মালিক ও সরকার পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় হবে
আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের মানদণ্ডে পৌঁছতে বাংলাদেশ সক্ষম হবে
কমিটি ছাড়া এককভাবে সরকার বা মালিক পক্ষের সিদ্ধান্ত কেবল অকার্যকরই নয়, বরং তা আন্তর্জাতিকভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবেও দেখা হয়।
আলোচনা নয়, বাস্তবায়ন হোক নাবিক দিবসের মূল স্লোগান। বিশ্ব নাবিক দিবস আজ আর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন হয়ে থাকার সময় নয়—এটি হওয়া উচিত নাবিকদের বাস্তব অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। প্রতিবারের মতো এবারো আমরা দিবসটি উদযাপন করছি কিছু আলোচনা, সেমিনার এবং গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কিন্তু কাজের জায়গায় সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অনুপস্থিত। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মার্চেন্ট মেরিনারদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রক্ষা এবং দেশের ভাবমূর্তি সুদৃঢ় করতে যে ভূমিকা পালন করছেন, তা প্রতিদিনই বাড়ছে। এ অবদানের বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য—নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার।
এ অবস্থায় এমএলসি ২০০৬-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখন সময়ের চরম দাবি। শুধু এমএলসি অনুসমর্থন করে বসে থাকলেই হবে না, তা বাস্তবিক কার্যকর করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং ত্রিপক্ষীয় অংশগ্রহণ জরুরি। এ কারণেই আমরা জোর দিয়ে বলছি, অবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করে গঠন করতে হবে একটি STC, যেখানে অংশগ্রহণ থাকবে:
সরকারের (নৌ-মন্ত্রণালয়ের) দায়িত্বশীল প্রতিনিধি
জাহাজ মালিক পক্ষের (BOGSOA) প্রতিনিধি
এবং নাবিক সংগঠনের নির্বাচিত কমিটির অভিজ্ঞ নেতৃত্ব
এ কমিটির নেতৃত্বে থাকা উচিত নাবিক সংগঠনের সর্বশেষ দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচিত কমিটির প্রধানকে। কারণ একজন অভিজ্ঞ নাবিক নেতা জানেন মাঠের বাস্তবতা, বোঝেন সমস্যার গভীরতা এবং কর্মীদের আস্থার জায়গাটিও তিনিই ধারণ করেন। মালিক ও সরকারের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা এবং সমঝোতায় তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
এছাড়া নাবিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা ও নাবিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে তারা বাস্তবভিত্তিক তথ্য, দাবি ও সমস্যাগুলো কমিটির সামনে তুলে ধরতে পারবে অত্যন্ত কার্যকরভাবে। এ অভিজ্ঞতা কেবল নীতিনির্ধারণ নয়, বরং এমএলসি বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, প্রতি বছর বিশ্ব নাবিক দিবস ঘিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অধিকার নিয়ে যত আলোচনা হয়, মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। ভেনিজুয়েলায় বন্দি বাংলাদেশের এক মেরিনার আজ সুবিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছেন, অথচ রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ আশানুরূপ নয়। এটি আমাদের ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। শুধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসমর্থন করলেই আন্তর্জাতিক দায়িত্ব শেষ হয় না—বাস্তবায়নের ইচ্ছাশক্তি ও কাঠামোগত প্রস্তুতি থাকতে হয়।
আমরা তাই এ লেখার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে আহ্বান জানাই—বিশ্ব নাবিক দিবসকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তব প্লাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করুন। এসটিসি গঠন করে দেশের নাবিকদের জন্য একটি সুরক্ষিত, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায্য পেশাগত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন। না হলে আগামী বছরও দিবসটি পালন করা হবে আলোচনার মাধ্যমে, কিন্তু নাবিকদের অধিকার রয়ে যাবে কাগজে-কলমেই—বাস্তবে নয়।
ড. রেজাউল করিম চৌধুরী: ক্যাপ্টেন, মেরিটাইম পরামর্শদাতা, আইনজীবী, ফ্যাকাল্টি ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া তেরেংগানু
কাজী মো. আবু সাইদ: মেরিন চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও মেরিটাইম পলিসি গবেষক










