মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাড়ছে, যা মানবদেহে ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বাড়াতে, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রত্যাশায় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন খামারিরা। ফলে মাছ ও মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে অ্যান্টিবায়োটিক। নীতি সংলাপে দাবি করা হয়েছে, দেশের পোলট্রি খাতের ৯০ শতাংশের বেশি খামারে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এছাড়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাছ ও মুরগির মাংসের নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণের (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স-এএমআর) ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে যেসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা, সেগুলোরই ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ছে। এতে সাধারণ রোগেও কার্যকর চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি মানবদেহে রোগবালাই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে ও মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। একদিকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে সংকটে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় অ্যান্টিবায়োটিকের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে অ্যান্টিবায়োটিকের বিপণন ও ব্যবহারে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

গত সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের মৌলিক নীতিমালা: বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে দাবি করা হয়, ‘‌দেশের খাদ্যে ভারী ধাতু, নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও ওজনবর্ধক স্টেরয়েডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় বলা হয়েছে, এএমআর মোকাবেলা করা না গেলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে ৪ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে।’

অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যই হুমকি নয়; এটি পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নিবিড় মৎস্য চাষের বর্জ্য, অতিরিক্ত রাসায়নিক ও ওষুধের অবশিষ্টাংশ জলাশয়ের পানিকে বিষাক্ত করে তোলে। এতে শুধু মাছ নয়, জলজ জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, দেশে মৎস্য খাত থেকে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্যাস নির্গত হয়, যা পরিবেশগত চাপ বাড়ায়। প্রাণিসম্পদ খাত থেকে নির্গত ছয়-আট মিলিয়ন টন গ্রিনহাউজ গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে আরো তীব্র করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর।

মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০-এর ১৪(১) ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে মৎস্য ও পশুখাদ্যে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড বা কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ আইনগতভাবে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু বাস্তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অধিকাংশ খামারি এ নিয়ম অমান্য করে নির্বিচারে এসব রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত ওজন বাড়ানো ও উৎপাদন খরচ কমানোর আশায় তারা আইন ভঙ্গ করে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড মেশানো খাদ্য পোলট্রি মুরগি, প্রাণী ও মাছকে খাইয়ে থাকেন। এতে একদিকে খামারের উৎপাদন বাড়লেও অন্যদিকে মানুষের খাদ্যচক্রে বিপজ্জনক রাসায়নিক প্রবেশ করছে। এসব ক্ষতিকর উপাদান মাছ ও প্রাণিজ খাদ্যে অবশিষ্ট থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়াচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জলাশয় দূষিত হয়ে বাস্তুসংস্থানও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শীর্ষ স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে অন্যতম একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। ২০১৯ সালে বিশ্বে ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যায় এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে। আর ৪৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যায় এর পরোক্ষ প্রভাবে। আশঙ্কা রয়েছে, এএমআর যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং প্রতিহত না করা যায় তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী এক কোটি মানুষ মারা যাবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক অভিঘাত পড়বে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্কলিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বাড়ার ফলে ২০৫০ সালে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার।

অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। কার্যকারিতা হারাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে (এএমআর) বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এটি এখন দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানাবোঝার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর ২০২৪ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত ৯৬ হাজার ৪৭৭ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে। দেশের পাঁচটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের শরীরে ৭১ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় পাঁচটি জীবাণুর ক্ষেত্রে ৭১টি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি অ্যান্টিবায়োটিকের সংবেদনশীলতা ৮০ শতাংশের ওপরে। একটির সংবেদনশীলতা ৬০-৮০ শতাংশের মধ্যে। বাকিগুলোর সংবেদনশীলতা ৬০ শতাংশের নিচে। আইইডিসিআর এ সময়ে যত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করেছে, তার মধ্যে ৭ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী অণুজীব প্যান-ড্রাগ-রেজিট্যান্স (পিডিআর) পাওয়া গেছে। প্যান ড্রাগ হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট রোগের জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক। আইসিইউ রোগীদের ক্ষেত্রে পিডিআরের উপস্থিতি ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো ওষুধ কাজ করছে না।

জিনগতভাবে অনেক সময় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার রেজিস্ট্যান্স প্রক্রিয়াকে আশঙ্কাজনকভাবে ত্বরান্বিত করছে। সঠিক ডায়াগনসিস ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কিংবা নিয়ম না মেনে এ ওষুধ গ্রহণের ফলে এএমআর বেড়ে যাচ্ছে। কেননা মানুষের মলমূত্রের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক নির্গমন হয়, যা প্রথমে মাটিতে যায় এবং মাটি থেকে পরবর্তী সময়ে গাছপালা ও প্রাণিকুলে ছড়িয়ে পড়ে। আবার পানিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। গাছপালায় ব্যবহৃত পেস্টিসাইড বৃষ্টির পানিতে মিশে নদী-নালায় গিয়ে মেশে। ফলে জলজ প্রাণীতেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করে। আবার মৎস্য ও পোলট্রি খামারে যখন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয় সেই মাছ ও মাংস যখন মানুষ খায় তা পুনরায় মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। এভাবে চক্রাকারে এর বিচরণ হয়। ফলে অবস্থা দিন দিন বেগতিক হচ্ছে।

শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, কঠোরভাবে প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন হলে অ্যান্টিবায়োটিকসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক বিপণন ও ব্যবহারে অনেকাংশেই লাগাম টানা যাবে। ক্ষুদ্র খামার ও পুকুরভিত্তিক চাষীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকসহ রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে খামারিদের সচেতন করতে হবে। এতে তাদের অজ্ঞতা দূর হবে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহী হবে। একই সঙ্গে বাজার পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি ও ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার শুধু প্রাণী ও মৎস্য খাতেই সংকট নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে হলে অ্যান্টিবায়োটিকে যথেচ্ছ বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।