ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে হাতে সময় আছে এক মাসেরও কম। আর নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করার পর জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার জন্য নতুন সরকার হাতে সময় পাবে মাত্র তিন মাসের মতো। আর এ রকম একটি হিসাবকে সামনে রেখে জাতীয় বাজেট নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে, নির্বাচনে জিতে যারা সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই যে তাদের পরবর্তী অর্থবছরের জন্য ন্যূনতম ৮ লাখ কোটি টাকার একটি বাজেট ঘোষণা করতে হবে, সেটি কি তাদের চিন্তাভাবনায় আছে? (অঙ্কটি ৮ লাখ কোটি টাকা বলা এ কারণে যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার হচ্ছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এটি ৮ লাখ কোটি টাকার কম হওয়ার কথা নয়)। টেলিভিশনের টক শো কিংবা দৈনিক পত্রিকার সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের প্রশ্নটি করা হলে শ্রোতা-দর্শক ও পাঠকদের মুগ্ধ করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে তারা যে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেবেন, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবে কি সে প্রস্তুতি তাদের আছে?
আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীদের দৈনন্দিন কথাবার্তা ও আচার-আচরণ থেকে অন্তত সেটি একেবারেই প্রতীয়মান হচ্ছে না। তারা নির্বাচনের জোটসঙ্গী সমঝোতার ফয়সালাকরণ কিংবা নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রকাশ্যে বা গোপনে চাঁদা সংগ্রহ করা অথবা নির্বাচনে জিতলে কার জন্য কী তদবির করবেন সে বিষয়ে অঙ্গীকার পাকাপোক্তকরণ ইত্যাদি নিয়ে যতটা ব্যস্ত, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের ওপর পড়লে তা কীভাবে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পন্ন করবেন—সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা ও হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে ততটাই নির্লিপ্ত। বিষয়টি রাজনীতিকদের মনে কোনোরূপ গ্লানিবোধ তৈরি না করলেও দেশ ও দেশের জনগণের জন্য খুবই উৎকণ্ঠার। বিশেষত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষের জন্য, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে কৃষি ও শিল্প খাতের শ্রমজীবী মানুষ।
দেশে নতুন কোনো স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ না থাকায় উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি হার ক্রমাগতভাবেই নিম্নমুখী হয়ে পড়ছে, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার দুই-ই পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, রফতানি প্রবৃদ্ধির হার গত আগস্ট থেকে ৫ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কিছুতেই কমছে না, শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট বেড়েই চলেছে, রাজস্ব ঘাটতি হ্রাস পাবে এমন কোনো লক্ষণ পুরোপুরিই অনুপস্থিত। মোটকথা, দেশের অর্থনীতি এখন অধিকাংশ সূচক ও দৃষ্টিকোণ থেকেই নানামাত্রিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় আগামী নতুন সরকার দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে সামাল দেবে, সে এক গভীর দুশ্চিন্তার বিষয়, যে দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। কিন্তু সে বাজেট যারা প্রণয়ন করবেন, তাদের বোধ ও উপলব্ধিতে এ চিন্তা যে এখন পর্যন্ত কোনোভাবেই এতটুকু স্থান করে নিতে পারেনি, তা বোধকরি তাদের কট্টর সমর্থকরাও অস্বীকার করবেন না। তাহলে এ অবস্থা থেকে এ অতি সীমিত সময়ের মধ্যে বেরিয়ে আসার উপায় কি? আগামী সরকার কি তাহলে একটি দুর্বল, সমস্যাগ্রস্ত ও জনদুর্ভোগসম্পন্ন অর্থনীতি নিয়েই পথ চলবে?
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে অর্থনীতির এসব জরুরি প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবতে ও তাদের সেসব চিন্তাভাবনা নির্বাচনী ইশতাহারে তুলে ধরার ব্যাপারে পরামর্শ ও চাপ সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম এখন হয় মবের ভয়ে, না হয় সুবিধার লোভে দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে স্ব স্ব পছন্দের দলের পক্ষে তোষামোদে ব্যস্ত। এমতাবস্থায় বাজেটসহ রাষ্ট্রের জরুরি অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোয় রাজনৈতিক দলগুলো একদিকে যেমন গণমাধ্যমের গঠনমূলক চাপ ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দলগুলোও চাপহীন নিথর পরিবেশ পেয়ে নির্বাচনে ভোট টানার জন্য মানহীন ও মেধাবিহীন সব লোভনীয় কথাবার্তা জনসমক্ষে বলে যাচ্ছেন, যেসবের মধ্যে আবার অশ্লীল ভাষার গালিগালাজও রয়েছে। উল্লেখ্য, অশ্রাব্য গালিগালাজও এখন রাজনীতির ‘নান্দনিক’ ও ‘জনপ্রিয়’ ভাষা হয়ে উঠেছে। কে জানে, এ সুবাদে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি ওইসব অশালীন ভাষার মতোই নীচতা ও হীনতার নিম্নতম স্তরের দিকেই ধাবিত হচ্ছে কিনা।
অবশ্য এতকিছুর পরও জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ববিহীন প্রায় অকার্যকর এ রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ বোধ নিজেদের নিয়তই পীড়িত করে যে রাষ্ট্রের এসব জরুরি অর্থনৈতিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো যদি এভাবে নির্লিপ্ত থাকে ও তাতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তা সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকেই কষ্টময় করে তুলবে। অতএব বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে কতিপয় প্রস্তাব নিম্নে তুলে ধরা হলো। আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সদস্যরাও যদি বিষয়গুলোর দিকে ন্যূনতম মানবিক সহানুভূতি নিয়ে তাকান, তাহলে দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজের সাধারণ মানুষ উল্লিখিত অর্থনৈতিক কষ্টগুলো থেকে কিছুটা হলেও নিরাময় পাবেন বলে আশা করা যায়।
এক. কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে—এটি এ দেশে একটি জনপ্রিয় আলোচনা। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে এ আলোচনাকে বাস্তবে রূপদানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের নীতি-কাঠামো ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াতেই রয়েছে অসংখ্য গলদ, যার সঙ্গে সততা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন কলাকৌশল প্রয়োগের আগে বিরাজমান উল্লিখিত গলদগুলো আগে দূর করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ রাজস্ব বৃদ্ধির সহজ কৌশল হিসেবে যখন-তখন পরোক্ষ কর বাড়ানোর একটি সহজ কৌশল এ দেশে বহুদিন থেকেই চালু আছে। ফলে সম্পদের অনুপাত বিবেচনায় এ দেশের নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষ বাস্তবে উচ্চবিত্তের চেয়ে অনেক বেশি কর দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু হওয়া উচিত ছিল এর বিপরীতটি, অর্থাৎ রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাড়ানো দরকার প্রত্যক্ষ করের হার ও পরিধি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে ওয়াদা করুক যে তারা ক্ষমতায় গেলে এ চিন্তা বাস্তবায়ন করবে।
দুই. বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের নামে বিভিন্ন পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহার বা তা হ্রাসকরণের সস্তা কৌশল থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর ও শুল্ক কমিয়ে এ দেশে কখনো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেছে—এরূপ দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। বরং এতে করে রাষ্ট্রের রাজস্ব বিসর্জনের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাই শুধু লাভবান হন। আশা করব যে আসন্ন বাজেটের শুরুতেই শুধু নয়, বছরজুড়েই এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে এবং বছরের মাঝখানে গিয়ে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠী বিশেষের তদবিরে তা ভেঙে পড়বে না।
তিন. জনপ্রশাসন খাতের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়কে উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু রূঢ় সত্য হচ্ছে এই যে বাজেট প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটিই যেহেতু জনপ্রশাসনের সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং এ-সংক্রান্ত অধিকাংশ সিদ্ধান্ত যেহেতু তারাই নিয়ে থাকেন, ফলে এ খাতের কোনো ব্যয়ই কখনো বাড়ে ছাড়া কমে না। কিন্তু একটি জবাবদিহিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটি কখনই ঘটার কথা নয়। ভোটপ্রার্থী রাজনীতিকরা কি সাহস নিয়ে অঙ্গীকার করতে পারবেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে বাজেটে জনপ্রশাসনের ব্যয় কমিয়ে আনার লক্ষ্যে তারা দৃঢ়তার পরিচয় দিতে সক্ষম হবেন?
চার. বাজেটের আওতায় রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়কৃত অর্থের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয় তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাধীন ব্যয় বাড়াতে হবে। তবে এডিপির আওতাধীন প্রতিটি প্রকল্পকে বৃহত্তর জনঅগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাছাই করতে হবে এবং সে বাছাই প্রক্রিয়া হতে হবে পরিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে কি খোলামেলা অঙ্গীকার করতে রাজি হবে বা তা করতে পারবে?
পাঁচ. এডিপির আওতায় বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট ও মেগা আকৃতির প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কঠিন শর্তযুক্ত, স্বল্পমেয়াদি, সরবরাহ ঋণভিত্তিক (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট), অধিক পরামর্শকসংবলিত, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণযুক্ত, সর্বোপরি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। রাজনীতিকরা বিষয়টি বুঝেশুনে এ ব্যাপারে অঙ্গীকার করতে রাজি আছেন?
ছয়. ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা বৈদেশিক সাহায্যের আওতায় বাজেট সহায়তা নিয়ে বাজেটে সম্পদ সরবরাহ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন নেই। একইভাবে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে কিংবা কৃষি খাতে ভর্তুকি হ্রাস করেও ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা অপ্রয়োজনীয়। বরং ব্যয় হ্রাসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র হচ্ছে, সবল ও হৃষ্টপুষ্ট যেসব খাতে দীর্ঘদিন ধরে নগদ ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান প্রথা চালু আছে, অবিলম্বে সেগুলো প্রত্যাহার করা। কিন্তু রাজনীতিকরা এটি করার অঙ্গীকার করতে পাবেন বলে মনে হয় না। কারণ এ নগদ ভর্তুকি প্রদানকারীরাই হচ্ছেন রাজনীতিকদের নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর লক্ষ্যে অন্যতম চাঁদা প্রদানকারী, যার সঙ্গে কর-শুল্ক ফাঁকিদাতা, ব্যাংকের ঋণখেলাপি এবং মেগা প্রকল্পের ঠিকাদাররাও রয়েছেন।
বাজেট-সংক্রান্ত উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এবং আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে করা হলেও একইভাবে এগুলো অন্য বাজেট এবং অন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অপরাপর রাজনীতিদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থাকা সবসময়ের সব রাজনীতিক এবং একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকা অন্য সময়ের সব আমলা—এরূপ সবার বিবেচনার জন্যই এ প্রস্তাবগুলো পেশ করা হলো। এখন এগুলো মানা বা না মানা একান্তই তাদের নিজস্ব এখতিয়ারাধীন বিষয়। তবে মানলে তা থেকে দেশের মানুষ সাধারণ কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন—এই যা।
আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়










