পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, প্রযুক্তিকে গ্রহণ করা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কোনো সমাজ যদি পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে অনীহা দেখায় কিংবা শিল্পক্ষেত্র যদি নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে তবে উন্নয়নের গতি থেমে যায়। শিক্ষাই মানবসম্পদের ভিত্তি—অতএব, অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত হতে হবে।
২০২৫ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়ন ও পিটার হাউইট। তাদের গবেষণা দেখিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন উদ্ভাবন ও নবায়নের ওপর। নতুন ধারণা ও প্রতিষ্ঠানকে বিকশিত হতে দিতে হবে, এমনকি পুরনো কাঠামো ভেঙে ফেলতে হলেও। শুধু পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোতেই নির্ভর করলে নতুন চিন্তা ও প্রতিযোগিতা বিকশিত হতে পারে না। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ন্যায্য প্রতিযোগিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা—অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।
মোকির, আগিয়ন ও হাউইট দেখিয়েছেন, প্রতিটি শিল্প বিপ্লবের পেছনে ছিল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয়। তাদের ‘উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি’ তত্ত্ব বলছে—অর্থনীতি এগোয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নতুন পণ্য ও ধারণা উদ্ভাবনের মাধ্যমে পুরনোকে প্রতিস্থাপন করে। এ ধারাকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষা ব্যবস্থা স্থবির থাকা চলবে না। পাঠ্যক্রম, শিক্ষণ পদ্ধতি ও দক্ষতা উন্নয়নের কাঠামোকে সময়ের সঙ্গে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির জগতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। অতিরিক্ত সুরক্ষা সৃজনশীলতাকে রুদ্ধ করে, আবার উদ্ভাবকদের যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে নতুন কিছু করার আগ্রহও হারিয়ে যায়। উন্নয়ন তাই এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়—প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে, পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে এ পরিবর্তনের উপযোগী করে তুলতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে এ বাস্তবতা আরো গভীরভাবে প্রযোজ্য। এটি কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; বরং ফিজিক্যাল, ডিজিটাল ও জৈবজগতের এক অভূতপূর্ব একীকরণ। শিল্পক্ষেত্র আজ নির্ভর করছে অটোমেশন, রোবোটিকস, ডাটা অ্যানালিটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জৈবপ্রযুক্তির ওপর যা একসঙ্গে মিলে শিল্প, অর্থনীতি ও মানবজীবনের গতি বদলে দিচ্ছে। ফলে বিভিন্ন শাখার সীমারেখা মুছে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বহুমাত্রিক জ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র। কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি এমন এক ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থী তৈরি করছে, যেখানে কাজ ও দক্ষতা প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে?
এ যুগে মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা আর কার্যকর নয়। প্রয়োজন অভিযোজিত শেখার সংস্কৃতি। নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সহযোগিতা, দৃঢ়তা, নৈতিক মূল্যবোধ ও উদ্যোক্তা মানসিকতায়। কাজেই বাংলাদেশের জন্য এ যুগে শিক্ষাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে নতুন ধারণা ও সমাধান তৈরি করতে পারে। বহুমাত্রিক বা আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে সাফল্যের অন্যতম শর্ত।
নোবেলজয়ীদের এ তত্ত্ব বাংলাদেশের জন্য এক জরুরি বার্তা বহন করে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও ডিগ্রিকেন্দ্রিক মানসিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন এমন এক প্রজন্ম, যারা প্রশ্ন করতে জানে, অনুসন্ধান করে ও নতুন সমাধান তৈরি করে। এজন্য সাহসী শিক্ষা সংস্কার অপরিহার্য—পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে এবং শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে দৃঢ় সংযোগ স্থাপন করতে হবে। উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয় পুরনো পাঠ্যপদ্ধতি ও ভাবনার কাঠামোয়।
নোবেলজয়ীদের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো অগ্রগতি কোনো এককালীন অর্জন নয়; এটি একটানা নবায়নের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা শুধু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয় না বরং পরিবর্তনের পথও তৈরি করে। উদ্ভাবনকে কেবল নীতিমালায় নয়, শ্রেণীকক্ষ, গবেষণাগার ও শিল্পক্ষেত্রে প্রতিদিনের অনুশীলনে রূপ দিতে হবে। সরকার ডিজিটাল অবকাঠামো ও কারিগরি প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করছে—এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শিক্ষকের ও শিক্ষার্থীর চিন্তার ধরন না বদলালে এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না। একুশ শতকে বাংলাদেশের স্থিতি ও অগ্রগতি নির্ভর করবে, আমরা কতটা কার্যকরভাবে শিক্ষা সংস্কারকে উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারি তার ওপর। যেমন নোবেলজয়ীরা দেখিয়েছেন—ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা সাহস করে নিজেদের পুনর্নির্মাণ করতে জানেন।
এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়









