বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশেই ইসলামী ধারায় আর্থিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকারি সুকুক ইস্যু একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে এ দুই দেশের সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সম্পদের বিপরীতে তহবিল সংগ্রহ করে আসছে। যদিও উভয় দেশের সুকুক কাঠামো শরিয়াহ মূলনীতি অনসুরণ করে থাকে মর্মে দাবি করা হয়, তবে কাঠামোগত বাস্তবায়ন, গভর্ন্যান্স, দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার দিক থেকে পারস্পরিক বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, যা এ প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সুকুক প্রসঙ্গে তুলনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণ এশিয়ায় এ দুটি দেশ ইসলামী ফাইন্যান্সে অগ্রগণ্য হলেও বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক আগে। অথচ গভর্ন্যান্স ও শরিয়াহ মান্যতায় বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে এমনটাই বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বেস্ট প্র্যাকটিসেও বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ প্রবন্ধে সেই তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের সুকুক খাত আরো শক্তিশালী হয়ে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

প্রথমত, পাকিস্তানে সরকারি সুকুক ইস্যুর জন্য একটি স্বতন্ত্র নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান—Pakistan Domestic Sukuk Company Ltd. (PDSCL)—গঠিত হয়েছে, যা সরকারের পক্ষে সুকুক ইস্যু, সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (এসপিভি) হিসেবে মালিকানা গ্রহণ করে ইজারা কাঠামোয় তা সরকারের কাছে ভাড়া দেয়। স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হওয়ায় এটি নিরীক্ষাযোগ্য, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি AAOIFI ও IFSB-এর মতো আন্তর্জাতিক শরিয়াহ ও গভর্ন্যান্স সংস্থাগুলোর সুপারিশকৃত কাঠামোর সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে এখনো এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের Islamic Securities Section ইস্যু, ট্রাস্টি ও এসপিভির দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করে। অথচ এটি একটি প্রশাসনিক ইউনিট মাত্র, নিবন্ধিত সত্তা নয়। ফলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনে ঘাটতি দেখা যায়। IFSB-এর গাইডলাইনে এসপিভির স্বাতন্ত্র্য বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে, যা স্বতন্ত্র অডিটের আওতায় আসে। অতএব বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান—গভর্নমেন্ট ইসলামিক সিকিউরিটিজ ইসলামিক সিকিউরিটিজ কোম্পানি লিমিটেড—গঠন সময়ের দাবি। এটি ইস্যুয়ার, ট্রাস্টি ও এসপিভি—এ তিনটি দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে, যার ফলে সরকারের সুকুক ব্যবস্থাপনা শরিয়াহ, গভর্ন্যান্স এবং বাজারভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানে সরকারি সুকুক নিলাম পরিচালিত হয় পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের (PSX) মাধ্যমে, যেখানে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের নিলামে অংশগ্রহণের জন্য প্রি-রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। নিলামের আগে PSX সুকুকের টার্ম শিট ও প্রসপেক্টাস প্রকাশ করে, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা আগেই চুক্তিভিত্তিক, অর্থনৈতিক ও শরিয়াহ সম্পর্কিত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতা, সমতা ও প্রস্তুতিমূলক সক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী সিকিউরিটিজ সেকশন নিলামের আহ্বান জানায় এবং বিনিয়োগকারীদের সেই দিনই বিড করতে হয়, পূর্ব রেজি. প্রক্রিয়া নেই। যার ফলে পূর্বপ্রস্তুতির সুযোগ সীমিত থাকে এবং সঠিক বাজার প্রতিযোগিতাও বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া বাংলাদেশে সরকারি সুকুকের কোনো সেকেন্ডারি মার্কেট এখনো চালু হয়নি, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য তারল্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফান্ডিং ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। পাকিস্তানে PSX-এর মাধ্যমে সেকেন্ডারি মার্কেটে সুকুক ট্রেডিং সম্ভব, যা সরকারি সুকুককে একটি পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাজার গভীরতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ অনেক বাড়বে। সর্বোপরি স্বতন্ত্র এনটিটির মাধ্যমে সুকুক ইস্যু করা ও স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সরকারি সুকুক নিলাম ও ট্রেডিং সুবিধা চালু করা সময়ের দাবি।

তৃতীয়ত, পাকিস্তানে অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থার জন্য PDSCL একজন স্বতন্ত্র পেমেন্ট এজেন্ট নিয়োগ করে, যেটি সাধারণত এনসিসিপিএল (ন্যাশনাল ক্লিয়ারিং কোম্পানি অব পাকিস্তান লি.) হয়ে থাকে। এটি বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সরকারের কাছে সুকুক সম্পদের মূল্য পরিশোধ করে এবং পরবর্তী সময়ে ইজারা রেন্ট ও অন্যান্য আয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রিটার্ন বিতরণ করে। ফলে লেনদেনের প্রতিটি ধাপ স্পষ্টভাবে নিরীক্ষাযোগ্য ও যাচাইযোগ্য থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকই নিলাম আহ্বান, অর্থ সংগ্রহ এবং রিটার্ন বিতরণের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে, যা কার্যত একক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে এবং এতে ভুল, স্বার্থের সংঘাত ও জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে থার্ড পার্টি ভ্যালিডেশন ও ফাংশনাল সেগ্রিগেশন গভর্ন্যান্সের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ইসলামিক সুকুক পেমেন্ট ব্যুরো গঠন করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

চতুর্থত, পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কেবল Settlement Facilitator বা Government Account Handler হিসেবে সীমিত, যেখানে সুকুক ইস্যু, ট্রাস্টি ও শরিয়াহ মতামত প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আলাদা। ফলে স্বচ্ছতা ও ভূমিকার বিভাজন নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই সুকুক ইস্যু করে, কাঠামো প্রস্তুত করে, শরিয়াহ মতামত দেয় এবং ট্রাস্টি হিসেবেও কাজ করে। ফলে একই ছাদের নিচে সব দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়ায় স্বার্থের সংঘাত এবং দায়িত্বের পৃথক্‌করণের অভাবের সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রাস্টি ও শরিয়াহ বোর্ড উভয়ের চেয়ারম্যান একই ব্যক্তি (ডেপুটি গভর্নর) হওয়ায় স্বাধীন মতামতের সম্ভাবনা কম এবং গভর্ন্যান্সের মৌলিক নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটে। ফলে এখানে কর্তৃপক্ষের উচিত প্রত্যেক ভূমিকার জন্য পৃথক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বা কমিটি নির্ধারণ করা, যা আন্তর্জাতিক বেস্ট প্র্যাকটিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল সরকারের পক্ষে সেটেলম্যান্ট ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে থাকা বাঞ্ছনীয়।

পঞ্চমত, সুকুক সম্পদের নিরাপত্তা কাঠামোর দিক থেকেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। পাকিস্তানে সরকারি সুকুকে কোনো ধরনের আর্থিক গ্যারান্টি প্রদান করা হয় না। বরং ইজারা সুকুকে পারচেজ আন্ডারটেকিংয়ের মাধ্যমে সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় নির্ধারিত সময় বা নির্দিষ্ট শর্তে সম্পদ কিনে নেবে, তবে এতে কোনো মূলধন বা মুনাফা গ্যারান্টি নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের সুকুক অপারেশনাল গ্যারান্টির পাশাপাশি আর্থিক গ্যারান্টিও প্রদান করা হয়। যার মাধ্যমে সুকুক হোল্ডারদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর মুনাফা এবং মেয়াদ শেষে মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেয়া হয়। এ গ্যারান্টি বাংলাদেশ সরকারের ফাইন্যান্স ডিভিশনের ট্রেড অ্যান্ড ডেট ম্যানেজমেন্ট উইং থেকে আসে। যদিও এতে বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির কথা বলা হয়, তবে এ কাঠামো শরিয়াহভিত্তিক সুকুকের মৌলিক নীতির পরিপন্থী, কারণ এভাবে মূলধন গ্যারান্টির মাধ্যমে সুকুক কার্যত কনভেনশনাল বন্ডে রূপান্তরিত হয়, যা অ্যাওফি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। অতএব বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবযোগ্য হলো এ ধরনের আর্থিক গ্যারান্টি বাতিল করে পাকিস্তানের মতো শুধু পারচেজ আন্ডারটেকিংয়ের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এবং প্রয়োজনে সাধারণ বীমা করপোরেশনে সুকুক উইং চালু করে তাকাফুল নীতির আওতায় বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাসের পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

ষষ্ঠত, সুকুক ফাইন্যান্সিয়াল ও শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাঠামোতেও দুই দেশের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানে শরিয়াহ ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজরির দায়িত্ব নির্দিষ্ট কিছু ইসলামী ব্যাংকের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিচালিত হয়। ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বোর্ড শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি করে। আর তাদের সিকিউরিটিজ সেকশন মূলত সুকুকের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজরি করে থাকে। বাংলাদেশে সেই তুলনায় পৃথক স্বতন্ত্র শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একই ছাদের নিচে ইস্যুয়ার, শরিয়াহ অ্যাডভাইজর, ট্রাস্টি সবই অনুশীলন হচ্ছে। এতে কাঠামোগত স্বচ্ছতা এবং মতামতের বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, পরামর্শদাতা বোর্ডগুলোকে স্বাধীন ও বহুমাত্রিকভাবে গঠনের মাধ্যমে সুকুকের শরিয়াহ স্বাধীনতা এবং বাজারমুখিতা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের মতো স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যাতে সুকুক কাঠামো আরো পেশাদার ও বাস্তবসম্মত হয়।

সবশেষে, সুকুক সম্পদের মালিকানা ব্যবস্থাপনায় পাকিস্তান টাইটেল এজেন্সি এগ্রিমেন্ট সম্পাদনের মাধ্যমে মূল মালিকানা ও ব্যবহারকারীর আইনি অবস্থান সুস্পষ্ট করে। এতে নিবন্ধিত মালিকানা সরকারের। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের পক্ষে তা ধারণ করে একাধিক পক্ষ। বাংলাদেশে এ দিকটি অস্বচ্ছ। সুকুক সম্পদ কখন কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর হবে, তার আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়, যা গভর্ন্যান্স ও শরিয়াহভিত্তিক স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এ তুলনামূলক বিশ্লেষণে বোঝা যায় যে পাকিস্তান সরকার সুকুক কাঠামোর প্রতিটি পর্যায়ে যেমন স্বাতন্ত্র্য, স্বচ্ছতা ও গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা এখনো এককেন্দ্রিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের বড় সাফল্য হলো সরকারি সুকুক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করা এবং তা প্রতিনিয়ত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা। এ মুহূর্তে প্রয়োজন পাকিস্তানসহ অন্যান্য সফল দেশের অনুশীলন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে একটি নিরপেক্ষ, বিকেন্দ্রীকৃত এবং শরিয়াহসম্মত উন্নত গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতের সরকারি সুকুক প্রক্রিয়া দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও টেকসই হয় এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে আরো শক্তিশালী অবদান রাখতে পারে।

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ এবং ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম: চেয়ারম্যান, শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, সোশ্যাল ইসলামী বাংক পিএলসি ও পরিচালক আইএফএ কনসালটেন্সি লি.