দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে জনজীবন থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতিও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন এ বার্তাই দিচ্ছে। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টের আবহাওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানাচ্ছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ সময় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে এবং এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার মুখোমুখি মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ তীব্র তাপপ্রবাহে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন তীব্র তাপমাত্রা সহ্য করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। গত বছরের এপ্রিলে দেশের ইতিহাসে ৭৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহে ধুঁকেছিল মানুষ। এক মাসের তীব্র গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, এমনকি শতাধিক মানুষের মৃত্যুও ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, শ্রম ও শিল্প উৎপাদন। গরমে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য—এ দুইয়ের ক্ষতির ফলে গত বছর বাংলাদেশের মানুষের ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ২১ হাজার কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৪ ভাগ বলে উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তন আরো বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট। এর জন্য মূলত দায়ী মানুষ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড প্রকৃতি পরিবেশ নষ্ট করেছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য। সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রকৃতিকে আশ্রয় করেই সভ্যতার সূচনা ও বিকাশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। বিপরীতে পরিবেশের ক্ষতিও হয়েছে। জনগণের আবাসন সংস্থানসহ নানা চাহিদা পূরণে অধিগ্রহণ করা হয়েছে জলাভূমি, বনভূমি। সর্বত্র বেড়েছে প্রকৃতি-পরিবেশ দখল-দূষণের মাত্রা। ২০২৪ সালে বন অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত জাতীয় বন জরিপে দেখা গেছে, দেশে গত এক দশকে বনভূমি হ্রাস পেয়েছে ১ লাখ ১ হাজার হেক্টর, যা ঢাকা শহরের আয়তনের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। একই সময়ে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ৬৪ প্রজাতির গাছ। সারা দেশে বনাঞ্চলে যে পরিমাণ গাছ আছে, গ্রামাঞ্চলে গাছের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি। তবে গ্রামে গাছের ঘনত্ব কম। আর বন উজাড় বেশি হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলে। সেখানে একমুখী প্রজাতির ফসল চাষের প্রসার ও সড়ক সম্প্রসারণের কারণে বন উজাড় হচ্ছে।

জলাধার ও সবুজ পরিসর হ্রাসের দিক থেকে সবচেয়ে করুণ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। তিন দশক আগেও ঢাকার মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি এলাকায় জলাভূমি ছিল। কমতে কমতে বর্তমানে জলাভূমির পরিমাণ ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। অর্থাৎ তিন দশকে ঢাকায় জলাভূমি কমেছে ১৭ শতাংশ। আবার কোনো শহরের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হলে সেই শহরের মোট ভূমির ১৫ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদিত রাখতে হয়। ঢাকা শহরে সেটি আছে মাত্র ৯ শতাংশ। নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২৩ সালের ভিত্তিতে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এছাড়া এ বছরের জুলাইয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ‘প্রকৃতিবিহীন ঢাকা: প্রাকৃতিক অধিকারভিত্তিক টেকসই নগর ভাবনার পুনর্বিচার’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ৪৪ বছরে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ। ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হারিয়ে গেছে ঢাকার ৬০ শতাংশ জলাধার। অবশিষ্ট জলাধার আছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন কমতে কমতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমেছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ নগর-পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি আদর্শ শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০-১৫ শতাংশ জলাশয়-জলাধার থাকার কথা। দেশের অন্য শহরগুলোর চিত্রও অনেকটা একই রকম।

মোটকথা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজনের উদ্যোগ নেয়া। প্রশমনের জন্য পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে আনতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সবুজ কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করা সবচেয়ে জরুরি। কেননা এরই মধ্যে দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অভিযোজন উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী, বিশেষত বড় শহরগুলোয়, সবুজের মাত্রা ও জলাধারের পরিমাণ বাড়ানো আবশ্যক। তবে বিদ্যমান বন ও জলাধার সংরক্ষণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে তাপপ্রবাহকে রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। শহরে ছাদবাগান ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ভবন তৈরিতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে এমন নকশাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি এমন জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে। শিশু, প্রবীণ ও শ্রমজীবী মানুষ তীব্র গরমে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সর্বস্তরের জনগণের সুরক্ষায় দুর্যোগ পূর্বাভাস ও আগাম সতর্ক সংকেত ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করতে হবে। তাপপ্রবাহ কোন এলাকায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের যে চিত্র দাঁড়িয়েছে, তাতে প্রশমন ও অভিযোজন ব্যবস্থা সমান্তরালে এগিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। উভয় উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি ও যথাযথ পরিকল্পনা। অন্যথায় তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো জলবায়ুগত দুর্যোগ ক্রমেই স্থায়ী সংকটে রূপ নেবে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।