এখানে থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এখানে থাকা সত্যিই দারুণ। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস যেমন বলত—এটা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমেয়তার সময়। তাহলে চলুন, কয়েক মিনিটের মধ্যে এ বিশ্বের মূল চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু স্পষ্ট—আমরা অস্থিরতা ও ভারসাম্যহীনতার এক সময়ে পৌঁছাচ্ছি; নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার দিক থেকেও, অর্থনীতির দিক থেকেও। আমরা যে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, তা দেখুন। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদে ঝোঁক। আরো সহিংসতা—২০২৪ সালে ৬০টির বেশি যুদ্ধ; একেবারে রেকর্ড। যদিও আমি বুঝেছি, সেগুলোর কয়েকটি আবার ‘ঠিক’ করা হয়েছিল। আর সংঘাত এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে—হাইব্রিড, বিস্তৃত; নতুন নতুন ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে—মহাকাশ, ডিজিটাল তথ্য, সাইবার, বাণিজ্য ইত্যাদি।
আমরা যেন নিয়মহীন এক বিশ্বের দিকে সরে যাচ্ছি। যেখানে আন্তর্জাতিক আইন পদদলিত হয় এবং মনে হয় কেবল শক্তিশালীর আইনই গুরুত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ফিরে আসছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধ আগামী মাসে চতুর্থ বছরে ঢুকবে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলছে, আফ্রিকার নানা প্রান্তেও সংঘাত চলমান। এটা একই সঙ্গে এমন এক বিশ্ব, যেখানে কার্যকর সামষ্টিক শাসন নেই, আর যেখানে বহু দেশীয় সহযোগিতা ব্যবস্থা দুর্বল। কারণ কিছু শক্তি এটাকে বাধা দেয় অথবা মুখ ফিরিয়ে নেয়; আর নিয়মগুলো ক্ষয় হয়।
আমি বহু উদাহরণ দিতে পারি—আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কীভাবে দুর্বল করা হচ্ছে অথবা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো কীভাবে সেখান থেকে সরে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আমরা সেই কাঠামোই ভেঙে ফেলছি যার মাধ্যমে সংকট ও যৌথ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। সামষ্টিক শাসন না থাকলে সহযোগিতার জায়গা নেয় নির্দয় প্রতিযোগিতা। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কেমন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছি? তারা এমন সব বাণিজ্যচুক্তি করছে যা আমাদের রফতানি স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে, সর্বোচ্চ ছাড় দাবি করে, প্রকাশ্যেই ইউরোপকে দুর্বল ও অধীনস্থ করতে চায়। তার ওপর আরো নতুন নতুন শুল্কের অন্তহীন সঞ্চয়, যা মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য; আরো অগ্রহণযোগ্য যখন সেগুলো ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
চীনের দিক থেকেও প্রতিযোগিতা আছে—অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও বিকৃত নীতিমালা এমন হুমকি তৈরি করছে যে পুরো শিল্প ও বাণিজ্য খাতই ভেসে যেতে পারে। রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, নতুন সব হাতিয়ার বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করছে। এ সমস্যা ঠিক করার উত্তর হলো আরো সহযোগিতা। নতুন পন্থা গড়া। আর বিশেষ করে ইউরোপীয়দের জন্য আরো অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত অর্থনীতি নির্মাণ—আমার কাছে এটাই মূল উত্তর।
এ প্রেক্ষাপটে আমি দুটি পথ বাদ দিতে চাই। প্রথম পথ—নিষ্ক্রিয়ভাবে শক্তিশালীর আইন মেনে নেয়া, যা শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে অধীনতার দিকে ঠেলে দেবে এবং ব্লক রাজনীতিতে আটকে ফেলবে। এ ধরনের নতুন ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের কোনো মানে নেই। রাষ্ট্র, সরকারপ্রধান ও ব্যবসায়িক নেতারা যদি এতে আত্মতুষ্ট থাকেন তবে তা হবে বড় দায়।
দ্বিতীয় পথ—শুধু নৈতিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মন্তব্য করা। এতে আমরা প্রান্তিক হয়ে যাব, ক্ষমতাহীন হয়ে যাব। বিশ্বের নির্মমতার মুখে ফ্রান্স ও ইউরোপকে কার্যকর বহুপক্ষীয়তাকে রক্ষা করতে হবে, কারণ তা আমাদের স্বার্থে এবং তাদের স্বার্থেও যারা শক্তির শাসনের কাছে নত হতে চায় না।
আমার কাছে তাই দুটি উত্তর: একদিকে ইউরোপীয়দের জন্য আরো সার্বভৌমত্ব ও স্বায়ত্তশাসন; অন্যদিকে ফলপ্রসূ বহুপক্ষীয়তা, যা সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তব ফল দেবে। অবশ্যই ফ্রান্স ও ইউরোপ জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা, জাতিসংঘ ও তার সনদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। বহুপক্ষীয়তাকে ছেড়ে দেয়ার মতো সেকেলে ভাবনা এটা নয়। বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আমরা যা শিখেছি তা ভুলে না গিয়ে সহযোগিতায় অটল থাকার জন্যই। আর এ নীতির অংশ হিসেবেই আমরা গ্রিনল্যান্ডে একটি যৌথ মহড়া/অনুশীলনে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারো প্রতি হুমকি নয়, শুধু একটি মিত্র ও আরেকটি ইউরোপীয় দেশ ডেনমার্ককে সমর্থন।
এ নতুন বাস্তবতা ও এ নতুন পরিস্থিতির মুখে এ বছর ফ্রান্স জি৭-এর সভাপতিত্ব করছে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে—জি৭-কে আবার বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সোজাসাপ্টা সংলাপের ফোরাম হিসেবে ফিরিয়ে আনা এবং সম্মিলিত ও সহযোগিতামূলক সমাধান তৈরি করা। বাণিজ্যযুদ্ধ, সুরক্ষাবাদী উত্তেজনা, অতিরিক্ত উৎপাদনের দৌড়—এসব শুধু পরাজিতই তৈরি করবে। এ কারণেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবেলাকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বর্তমান ভারসাম্যহীনতা কয়েকটি মূল প্রবণতার ফল এবং আমাদের সবারই নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—আমেরিকার অতিভোগ, চীনের কম ভোগ ও অতিবিনিয়োগ এবং ইউরোপের কম বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতাহীনতা। এ ভারসাম্যহীনতা উন্নয়ন বৈষম্যেও প্রতিফলিত হয়। আমরা আর এমন সহায়তায় সন্তুষ্ট থাকতে পারি না যা না কার্যকর ফল দেয়, না দেশগুলোকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম করে।
জি৭-এর মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হলো দেখানো—বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর একটি যৌথ রোগনির্ণয়ে পৌঁছতে পারে এবং বাস্তব পদক্ষেপে অঙ্গীকার করতে পারে। সহযোগিতা মানে অন্যকে দোষারোপ নয়; সহযোগিতা মানে দায়িত্বের অংশ নেয়া এবং সমাধানে অবদান রাখা। তাই এই জি৭-এর লক্ষ্য হবে একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়া, যাতে এ ভারসাম্যহীনতার শিকড়গুলো সমাধান করা যায় এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতা ফেরানো যায়। আরেকটি লক্ষ্য হলো উদীয়মান দেশগুলো, ব্রিকস এবং জি২০-এর সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করা। কারণ এ বিশ্বের খণ্ডিত হয়ে পড়া কোনো যুক্তিযুক্ত পথ নয়।
এটা হলো বৈশ্বিক এজেন্ডা জি৭-এর এজেন্ডা। পাশাপাশি আমাদের ইউরোপীয় উত্তরও আছে। আমার কাছে ইউরোপের মৌলিক সমস্যা তিনটি বৃদ্ধির ঘাটতি, মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির ঘাটতি। এবং আরো সার্বভৌমত্ব, আরো দক্ষতা ও আরো প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের কৌশলের তিন স্তম্ভ হওয়া উচিত: সুরক্ষা, সরলীকরণ, বিনিয়োগ। কারণ রোগনির্ণয় পরিচিত—ইউরোপের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে। আর বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায়, বিশেষ করে চীনের পদ্ধতির মুখে, আমাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।
প্রথম স্তম্ভ সুরক্ষা। সুরক্ষা মানে সুরক্ষাবাদ নয়। আজকের ইউরোপীয়রা অতিরিক্ত সরল। এটি এক বিশাল বাজার, সবার জন্য খোলা, কিন্তু ‘সমান মাঠ’ আছে কিনা তা যাচাই করে না। চীনের বাজারে ইউরোপ যেভাবে ঢুকতে পারে না, ইউরোপের বাজারে চীনের প্রবেশ ততটা বাধাহীন এটা নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। ইউরোপই একমাত্র অঞ্চল, যে অন্যরা নিয়ম না মানলেও নিজের কোম্পানি ও নিজের বাজারকে যথেষ্ট সুরক্ষা দেয় না। তাই আমাদের আরো বাস্তববাদী হতে হবে। রাসায়নিক শিল্প থেকে শুরু করে গাড়ি খাতসহ নানা শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। কারণ নিয়ম না মানা ও অসম প্রতিযোগিতার কারণে এগুলো কার্যত ধ্বংস হচ্ছে। ইউরোপের কাছে এখন শক্তিশালী হাতিয়ার আছে, নিয়ম ভাঙলে আমাদের সেগুলো ব্যবহার করতে হবে। ‘অ্যান্টি-কোয়ার্শন মেকানিজম’ একটি শক্তিশালী উপকরণ; আজকের কঠিন পরিবেশে এটিকে প্রয়োগ করতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
আমাদের ‘ইউরোপীয় অগ্রাধিকার’ নীতিও এগিয়ে নিতে হবে। আপনার বাজারে উত্তর আমেরিকার অগ্রাধিকার আছে; ইউরোপে এখনো পূর্ণাঙ্গ ইউরোপীয় অগ্রাধিকার নেই। আমরা ধীরে ধীরে তা তৈরি করছি, সাম্প্রতিক নথি ও সিদ্ধান্তে তার প্রথম উদাহরণও আছে। এটি খুব ভালো। আমরা জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছি একটি উচ্চাভিলাষী ও সহজ কাঠামো দেয়ার জন্য।
এটাকে যুগান্তকারী প্রকল্প মনে করি। আমি ইউরোপীয় কমিশনের কাছে আশা করি, ২০২৬ সালের শুরুতেই তারা সর্বোচ্চ উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটি প্রস্তাব দেবে, যাতে বিভিন্ন খাতে ‘ইউরোপীয় অগ্রাধিকার’ বাস্তবায়িত হয়। এটি প্রয়োজন। আমদানির ক্ষেত্রেও পদক্ষেপ নিতে হবে। বাণিজ্য উত্তেজনা ও এশীয় অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে তার বাণিজ্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আরো শক্তিশালী করতে হবে। এর মধ্যে ‘মিরর মেজার’ অন্তর্ভুক্ত, যাতে আমাদের নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড কার্যকর করা যায়। বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের মান উন্নত করতে হবে। বিশেষ করে এমন প্রকল্পে, যার রফতানি সম্ভাবনা ও উচ্চ সংযোজন মূল্য আছে।
চীনের সঙ্গে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে এটি মূল। চীন স্বাগত, কিন্তু আমরা চাই ইউরোপে চীনের আরো প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে—যাতে আমাদের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে, প্রযুক্তি স্থানান্তর হয়; শুধু ইউরোপে রফতানি নয়—যে পণ্য কখনো একই মানদণ্ড মানে না বা অতিরিক্ত ভর্তুকিপ্রাপ্ত। এটা সুরক্ষাবাদ নয়; এটা সমান মাঠ ফিরিয়ে আনা, শিল্প রক্ষা করা। সেফগার্ড ধারা থেকে ইউরোপীয় অগ্রাধিকার, আরো এফডিআইয়ে প্রণোদনা এ কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকিমুক্ত করতে একটি স্থিতিস্থাপকতা কৌশল দরকার—কাঁচামাল, সেমিকন্ডাক্টর, চিপস ইত্যাদিতে এবং বাণিজ্য অংশীদার বৈচিত্র্যও বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয় স্তম্ভ সরলীকরণ। সরলীকরণ বলতে আমি শুরু করেছি সিএসআরডি, সিএস থ্রিডি এবং আরো অনেক খাতে অনেক কিছু করতে হবে। গত কয়েক সপ্তাহে আমরা অটোমোটিভ খাতে কিছু করেছি; রাসায়নিক, ডিজিটাল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাংকিং—সব খাতেই করতে হবে। এ সরলীকরণের মূল কথা হলো কখনো কখনো সাম্প্রতিক কিছু বিধিবিধান বাদ দেয়া, যখন সেগুলো ইউরোপকে বিশ্বের তুলনায় তালছাড়া করে দেয়। পাশাপাশি একক বাজারকে আরো গভীর করতে হবে। ৪৫০ মিলিয়ন ভোক্তার বাজারটি সব ইউরোপীয় কোম্পানির ঘরোয়া বাজার হওয়া উচিত। কিন্তু জটিলতা থাকায় এখনো তা পুরোপুরি হয় না।
এ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিগত নিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন শক্তির বিভিন্ন উৎস নিয়ে বৈষম্য করেছি—এটা ইউরোপের জন্যই ক্ষতিকর। কোম্পানিগুলোরও ভূমিকা আছে। আপনাদেরও কাজ করতে হবে কোথায় সরলীকরণ দরকার তা চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে হবে। আমার কাছে সরলীকরণ এজেন্ডা আর বিতর্কের বিষয় নয়—এটা বাস্তবায়ন, গতি ও পরিসরের বিষয়।
তৃতীয় স্তম্ভ বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন। আমাদের অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাথাপিছু জিডিপির পার্থক্যের ৬৫-৭০ শতাংশ ব্যাখ্যা করা যায় উদ্ভাবনের পার্থক্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র বেশি উদ্ভাবনী হয়েছে, কারণ সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বেশি ছিল। তাই আসন্ন মাসগুলোয় ইউরোপের যে বাজেট নিয়ে আলোচনা হবে, সেখানে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম, ক্লিনটেক, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা। আমাদের যৌথ বাজেটের আকার যথাযথ নয়; আরো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য হওয়া যায় এবং উদ্ভাবন ত্বরান্বিত হয়।
কিন্তু একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগও যথেষ্ট নেই। ইউরোপীয়দের সঞ্চয় আছে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ বন্ডে যায়, আর কখনো ইকুইটিতে গেলেও ইউরোপের বাইরে যায়। তাই শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ‘সিকিউরিটাইজেশন প্রোগ্রাম’। এটি প্রস্তুত, বাস্তবায়ন দ্রুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাপিটাল মার্কেট ইউনিয়ন আরো সংযুক্তি ও সরলীকরণের জন্য, যাতে একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে উঠে এবং আমাদের সঞ্চয় ইউরোপের ভেতরেই উদ্ভাবন ও ইকুইটিতে বিনিয়োগ হয়।
এ এজেন্ডাই আমার কাছে শীর্ষ অগ্রাধিকার—বৈশ্বিক ও ইউরোপীয় উভয়ই। আর এগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে আগামী মাসগুলোয়ই, কারণ সবকিছুই এখন দ্রুততার প্রশ্ন। ফ্রান্স এ এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। একই সঙ্গে ফ্রান্সের লক্ষ্য হলো আমাদের অর্থনৈতিক ফলাফল ও সামষ্টিক নীতিকে স্থিতিশীল করা এবং আমরা যে আকর্ষণীয় দেশ। গত ছয় বছর ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেশ ছিলাম—সে অবস্থান ধরে রাখা; কাঠামোগত সংস্কার ও আমাদের মূল সুবিধাগুলো শক্তিশালী করা।
এখানে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক, স্থিতিশীল, কম-কার্বন বিদ্যুৎ সরবরাহ আছে। গত বছর আমরা ৯৩ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ রফতানি করেছি নিম্ন-কার্বন—পারমাণবিক মডেলের ভিত্তিতে। আমাদের গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতা বিশ্বমানের এবং আমরা তা আরো উন্নত করব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জ্বালানি রূপান্তর—এসব খাতে আমাদের অন্যতম সক্রিয় ও প্রাণবন্ত পরিবেশ আছে। আজ আমার প্রতিনিধি দলে এসব খাতের বহু স্টার্টআপ, ইউনিকর্ন ও বড় কোম্পানিও আছে।
আর এর ওপর আরো আছে—আমি এখানেই থামছি। আমাদের উচ্চমানের অবকাঠামো, বড় বাজার, শক্তিশালী ক্রয়ক্ষমতা আছে এবং আমাদের এমন এক জায়গা আছে, যেখানে আইনের শাসন ও পূর্বানুমেয়তাই এখনো খেলার নিয়ম। আমার ধারণা, বাজারে এর প্রকৃত মূল্যায়ন অনেক কম। ইউরোপ কখনো ধীর এটা সত্য; সংস্কার দরকার এটাও সত্য। কিন্তু ইউরোপ পূর্বানুমেয়, বিশ্বস্ত এবং যেখানে নিয়ম মানে আইনের শাসন। আজ ও আগামীকালের জন্য এটি ভালো জায়গা।
তাই ২০২৬ সালে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা ঠিক করতে আরো সহযোগিতার মাধ্যমে এ বৈশ্বিক এজেন্ডা এগিয়ে নিতে এবং আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আরো শক্তিশালী ইউরোপ গড়তে, আরো স্বায়ত্তশাসিত ইউরোপ গড়তে—এ তিন স্তম্ভের ভিত্তিতে এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় আরো বিনিয়োগ ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। কারণ আমাদের আরো বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এ মহাদেশের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আমাদের আরো প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা দরকার। কিন্তু আমরা দাদাগিরির চেয়ে সম্মানকে পছন্দ করি। ষড়যন্ত্রবাদী চিন্তার চেয়ে বিজ্ঞানে বিশ্বাস করি। নির্মমতার চেয়ে আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দিই। ইউরোপে আপনাকে স্বাগতম এবং ফ্রান্সে তো আপনাকে আরো বেশি স্বাগতম।
ইমানুয়েল মাখোঁ: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট
[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বিশেষ ভাষণের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত রূপ]










