দেশের পুকুর, জলাশয়, নালা, ডোবা ও ধানের জমিতে নানা পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদনও বেড়েছে। তবে মাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পুকুর প্রস্তুতি, পরিবেশ জীবাণুমুক্তকরণ, মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন রাসায়নিক ওষুধের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ময়মনসিংহ, যশোর, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের প্রায় ৭৭ শতাংশ মাছচাষীই পুকুর বা ঘেরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন। মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও অধিক মুনাফা লাভের আশায় মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন বদ্ধ জলাশয়ের এসব চাষী, যা মাছ থেকে মানবদেহে এবং নদ-নদী ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে দেশের জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য। মাছচাষীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে মাছচাষীদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা সঠিক মাত্রায় ও পদ্ধতিতে ওষুধ ব্যবহার করে নিরাপদ ও টেকসই মাছচাষ নিশ্চিত করতে পারেন। এতে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক থাকার পাশাপাশি মানবস্বাস্থ্যও নিরাপদ থাকবে।
দেশে চাষের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে মাছের রোগ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা টেকসই ও লাভজনক মাছচাষে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এতে চাষীরা বিভিন্ন রোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। সেগুলো হলো ইপিজুটিক আলসারেটিভ সিনড্রোম (ইইউএস) বা ক্ষতরোগ, ছত্রাক রোগ, পাখনা ও লেজ পচন, পেটফোলা, সাদাদাগ, মিক্সোবোলিয়াসিস ও ট্রাইকোডিনিয়াসিস ইত্যাদি। এ রোগগুলোর চিকিৎসায় চাষীরা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করছেন, যার মধ্যে রয়েছে জীবাণুনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক। তবে অধিকাংশ চাষী সঠিক মাত্রা, প্রয়োগ পদ্ধতি এবং ওষুধের প্রভাব সম্পর্কে অবগত নন, যার ফলে অযথা ও অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ সম্পর্কে চাষীদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো উচিত, যাতে তারা নিরাপদ মাছচাষে এগিয়ে যেতে পারেন। তবে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিত। এতে মাছের স্বাস্থ্য উন্নত হবে, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে।
বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন শিক্ষিত যুবকরা। তারা এখন এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এর সঙ্গে পরিবারের নারী সদস্যরা সম্পৃক্ত হওয়ায় সমন্বিত প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশ আজ মাছ উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করেনি, দেশের চাহিদা মিটিয়ে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানিও করা হচ্ছে। এছাড়া মৎস্য খাত এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নানা রেকর্ড অর্জন করেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার-২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মিঠা পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ চীনকে পেছনে ফেলে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী চীনের মিঠা পানির মৎস্য উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টন এবং অবস্থান ছিল বিশ্বে দ্বিতীয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন টন এবং অবস্থান ছিল বিশ্বে তৃতীয়। গত দুই বছরে দেশে মিঠা পানির মৎস্য উৎপাদন ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৩২ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে চীনের উৎপাদন ১ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টন থেকে কমে ১ দশমিক ১৬ মিলিয়ন টন হয়েছে। ফলে দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ চীনকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে, যা এ দেশের জন্য একটি অভাবনীয় সাফল্য। এছাড়া বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সামুদ্রিক মাছ আহরণে ১৪তম হওয়া এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ ও এশিয়ায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪৯ দশমিক ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে বিশেষ করে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন, যা একক প্রজাতি হিসেবে মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। এছাড়া বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। ইলিশ জাতীয় জীবনের অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখছে। জিডিপিতে ইলিশের অবদান শতকরা ১ ভাগের বেশি। কর্মসংস্থানের হিসাবেও দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ সম্পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
শুধু মৎস্যসম্পদ উৎপাদনই নয়, পাশাপাশি দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও মৎস্য খাত অবদান রাখছে। বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ ১ কোটি ৯৫ লাখ বা ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। শুধু তাই নয়, দেশের জিডিপিতেও মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সব মিলিয়ে মৎস্য খাত দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন একটি উপাদান, যা ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস থেকে তৈরি করে অন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসকে ধ্বংস অথবা তার বংশবৃদ্ধি রোধের জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে প্রাণীকে অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা চিকিৎসার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাংস, দুধ, ডিম, মলমূত্র ইত্যাদিতে অ্যান্টিবায়োটিকের যে অংশ অবশিষ্ট থাকে, তা-ই হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ ও রেজিস্ট্যান্স বর্তমান যুগে এক মারাত্মক সমস্যা, যার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কেউই রক্ষা পাবে না। এর ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশকে করতে পারে মানুষের বসবাসের অযোগ্য, সৃষ্টি করতে পারে নানা জটিল রোগব্যাধি এবং মানুষ ও পশুপাখির চিকিৎসার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করতে পারে মারাত্মক জটিলতা। ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস বা তার বংশবৃদ্ধি রোধে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস অথবা কমে যাওয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। সব ওষুধই কার্যকারিতা হারায়; কিন্তু অন্যান্য ওষুধের কার্যকারিতা অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানো থেকে ভিন্ন। কারণ অন্যান্য ওষুধ কার্যকারিতা হারায়, যখন মানুষের শরীরে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয় তখন ওষুধটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর অর্থ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলোর মধ্যে পরিবর্তন হয়, জীবাণুগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার সামর্থ্য অর্জন করে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। সারা বিশ্বে, বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোয় খামারিরা কম সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার আশায় গবাদিপশু, মাছ ও মুরগিতে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে। আর এ যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মানুষের জন্য বয়ে আনছে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক খামারি গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অথবা ব্রয়লার উৎপাদনের জন্য। ফলে যেসব পশুপাখিকে স্বল্পমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, সেসব পশুপাখির শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু তৈরি হয় এবং তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে অন্যান্য জীবাণুও রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে জিন ট্রান্সফরমেশন এবং মিউটেশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে। এভাবে একটি মহামারী নীরবে ঘটে যাচ্ছে।
মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করাসহ মৎস্যচাষীদের সঠিক ডোজ ও ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। এসব সমস্যা সমাধানে, মাছচাষীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক ডোজ ও প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা জরুরি। এছাড়া সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত মাছচাষীদের জন্য সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা নিরাপদ উপায়ে মাছ চাষ করতে পারেন।










