কোয়ালিটি ফিডস পোলট্রি, পশুখাদ্য ও মাছের খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। পাশাপাশি আমাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পোনা ও একদিনের মুরগির বাচ্চা বাজারজাত করছি। এছাড়া আমাদের নিজেদের উৎপাদিত মাছ, মুরগি ও গবাদিপশু মিট প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করছি। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা এবং গভীরভাবে কাজ করায় আমরা বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করি।

খাদ্যের বাজার ও সরবরাহ নিয়ে সংক্ষেপে বলা দরকার। গত বছর মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুর জন্য ৬০ লাখ টন ফিড উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে পোলট্রির (ব্রয়লার ও লেয়ার) ৪০ লাখ টন ফিড উৎপাদন হয়। এরপর আছে মাছ ও পশুখাদ্য। এ খাতে সরাসরি প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত আছে। এ শিল্পের মূল খরচ হয় খাদ্যে। খামারিদের খাদ্যে খরচ হয় প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ। এজন্য খাদ্যের দামের এদিক-ওদিক হলেই উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়ে। আমরা যখন খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলি তখন পরিমাণের দিকটি দেখি। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য আছে কিনা। পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত সেটি হলো পুষ্টিনিরাপত্তা। পুষ্টিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ শিল্পে আমাদের ব্যাপক অবদান আছে এবং ভবিষ্যতেও আমাদের এ বিষয়ে যথেষ্ট কাজ আছে। পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য ফিড উৎপাদনের জন্য আমরা যে কাঁচামাল ব্যবহার করি, সেই কাঁচামাল যেন গুণগত মানসম্পন্ন হয়। এতে আমরা সঠিক পরিমাণে সঠিক মানের খাদ্য বাজারে সরবরাহ করতে পারি। গুণগত মানের আলাপ করলে আমাদের আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করেই ফিড উৎপাদন করতে হয়। দেশীয় কাঁচামাল পরিমাণমতো উৎপদান না হওয়াসহ নানা অসুবিধার কারণে আমাদের বাইরে থেকে তা আমদানি করতে হচ্ছে।

আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করলে আমাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন মেইজ, সিজিএম, ডিওআরবি, ফিড প্রিমিক্স, র‍্যাপসিড এক্সট্রাকসন ও পোলট্রি মিল এক্সট্রা। কর্ন, সিজিএম, ডিওআরবি ও ফিড প্রিমিক্সে—বেশির ভাগ আইটেমের ক্ষেত্রে জিরো ট্যারিফ আছে। কোনো আমদানি শুল্ক নেই। কিন্তু অন্যান্য একই পরিধির কাঁচামালের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এ কারণে আমাদের খরচ বেড়ে যায়। কিছু আইটেমের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দেয়া কতটুকু যৌক্তিক, সে বিষয়ে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমাধান চাই। আমদানীকৃত কাঁচামালের পাশাপাশি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও স্পেয়ার পার্টস আমদানি করে ফিড তৈরি করতে হয়। প্রথমবারের মতো ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আনি এবং ১ শতাংশে স্পেয়ার পার্টস আমদানি করতে পারি।

কিন্তু ভবিষ্যতে যখন একই ক্যাপিটাল মেশিনারিজের ক্ষেত্রে আমাদের স্পেয়ার পার্টস বাইরে থেকে আনতে হয়, তখন স্পেয়ার পার্টসের ওপর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন পরিমাণে ট্যারিফ আরোপ করা হয়। আমাদের আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের দেশে কাঁচামাল উৎপাদন করা গেলে খরচ কমে আসবে এবং সময় বাঁচবে। ডলারের অস্থিতিশীলতার কারণেও আমদানীকৃত কাঁচামালের খরচ বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা করে। এ বিষয়গুলো আমাদের হাতের বাইরে।

পুষ্টিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাঁচামাল যেন ফিডমিলে ব্যবহার না করা হয় এ ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সচেতন থাকা উচিত। কাঁচামালের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারকে নজর রাখতে হবে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এ খাতে গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারি সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।

খামারিরাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গত বছরের বন্যায় গবাদিপশু, মাছ ও পোলট্রি খামারিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করা কঠিন। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য এগ্রি (কৃষি) ইন্স্যুরেন্স পলিসি নেই। এগ্রি ইন্স্যুরেন্সের মাধ্যমে তাদের পুঁজি রক্ষা করা গেলে খামারিদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে। ভবিষ্যতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকবে। তাই এ বিষয়ে কাজ করা উচিত। খামারিরা এ শিল্পের মেরুদণ্ড। তাদের জন্য এগ্রি ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপ করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে খামারিদের প্রতি বছর যে পরিমাণ পুঁজির ক্ষতি হচ্ছে তা অকল্পনীয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ একবার হলেই এসব খামারি ধসে পড়ে যান এবং ঘুরে দাঁড়াতে তারা সক্ষম হন না।

যদি দেশজ সক্ষমতা অর্জন করতে চাই তাহলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। দেশীয় কাঁচামালের কারেন্ট আউটপুট ও গুণগত মানের ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি দরকার। এক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে দেশীয় কাঁচামালের গুণগত মানোন্নয়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে চাই। ভবিষ্যতে আমরা এটি পাব, সেই প্রত্যাশা। এর মাধ্যমে অটোমেশন, মেকানাইজেশন ও মডার্ন ফার্মিং টেকনিকস নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরএনডি) করলে আমরা অনেক সমস্যার সমাধান পেতে পারি। ভবিষ্যতে যদি আমরা সক্ষমতা অর্জন করতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই গবেষণা ও উন্নয়নে (আরএনডি) জোরালো নজর দিতে হবে এবং জোর দিয়ে কাজ করতে হবে।

এম সাফির রহমান: পরিচালক, গ্রুপ করপোরেট অ্যান্ড লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স, কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যের বাজার, সরবরাহ ও দেশজ সক্ষমতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]